‘আমার ছেলেটা কিছুদিন আগে ছুটিতে দেশে এসে নিজের কবরস্থানে মাটি ফেলে গিয়েছিল। আজ সেখানে স্ত্রী আর একমাত্র ছোট্ট মেয়েটাকে নিয়ে মাটির নিচে ঘুমিয়ে গেল… আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছে!’
কথাগুলো বলছিলেন সন্তানহারা সিরাজুল ইসলাম। ইতালির রোমে হত্যাকাণ্ডের শিকার নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের একই পরিবারের তিন সদস্য–কামাল উদ্দিন বাবুল (৩৯), তার স্ত্রী (৩৮) এবং তাদের পাঁচ বছরের কন্যাসন্তান আরোয়া ইসলাম আরিশার বিদায়লগ্নে কাঁদেন গ্রামবাসী।
হত্যাকাণ্ডের ১ মাস ১৯ দিন পার হলেও প্রধান অভিযুক্ত শাহাদাত হোসেন এখনো অধরা। এরই মধ্যে রোম থেকে দেশে এসে পৌঁছেছে তিনজনের মরদেহ। শুক্রবার বাদ মাগরিব কোম্পানীগঞ্জের চরকাঁকড়া ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের শিশু নিকেতন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাদের দাফন সম্পন্ন হয়।
যে ঘটনায় বাবা-মা ও বোনকে একসঙ্গে হারিয়ে একা হয়ে পড়েছেন পরিবারের একমাত্র ছেলে অয়ন। রোমের জেমেলি পলিক্লিনিক হাসপাতালে দীর্ঘদিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে কিছুটা সুস্থ হয়ে শুক্রবার বিকালে দেশে পৌঁছায় সে। জীবনের সবচেয়ে বড় শোক বুকে চেপে উপস্থিত হন স্বজনদের জানাজা ও দাফনে। এর আগে, সকাল ৮টায় হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তিনজনের মরদেহ এসে পৌঁছায়।
স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত ২৬ জুন রাতে রোমের ক্যাসালোত্তি এলাকার ভিয়া মন্তিলিওর একটি অ্যাপার্টমেন্টে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয় বাবুল, তার স্ত্রী ও শিশু আরিশাকে। খবর পেয়ে পুলিশ তিনজনের ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করে এবং মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধার করে ছেলে অয়নকে। গত ১১ আগস্ট রোমের পিয়াজ্জা ওর্মেয়ায় নিহতদের প্রথম জানাজা শেষে মরদেহ দেশে পাঠানো হয়।
হত্যাকাণ্ডের পরদিন ২৭ জুন ইতালীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব মো. শাহাদাত হোসেনকে (৪০) প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে উল্লেখ করে তার ছবিসহ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। তবে ঘটনার দেড় মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো গ্রেপ্তার হননি তিনি।
নিহত বাবুলের চাচাতো ভাই ইউনুস বলেন, ‘পাঁচ বোনের একমাত্র ভাই ছিল বাবুল। দেশে এলে সবার খোঁজ নিতেন, সামাজিক কাজ করতেন। তাদের এভাবে চলে যাওয়া মেনে নিতে পারছি না। কিন্তু এতদিন পার হওয়ার পরও অভিযুক্ত ধরা না পড়া আমাদের আরও হতাশ করছে।’
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, হত্যাকাণ্ডের পেছনের মূল কারণ খুঁজতে কাজ করছে ইতালি পুলিশ। তবে ২০২৫ সালের ২ জুলাই চরকাঁকড়া ইউনিয়নে তাদের বাড়ির সামনে ‘লাল বাহিনী’ নামের এক ডাকাত দলের একটি উড়ো চিঠি পাওয়া গিয়েছিল। সেখানে টাকা ও স্বর্ণালংকার দাবি করা হয়। পরে না দিলে পরিবারের সন্তানদের হত্যা ও নারীদের ওপর নির্যাতনের হুমকি দেওয়া হয়। এ নিয়ে তখন বাবুলের বাবা কোম্পানীগঞ্জ থানা ও সেনা ক্যাম্পে লিখিত অভিযোগও করেছিলেন।


