ভারতে প্রাণঘাতী নিপাহ ভাইরাসে দুজনের আক্রান্ত হওয়ার খবরে বিমানবন্দরে সতর্কতা জোরদার করেছে এশিয়ার বিভিন্ন দেশ। সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে বিমানবন্দরে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও নজরদারি বাড়িয়েছে থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, হংকং ও মালয়েশিয়া।
রয়টার্সের খবরে বলা হয়, আক্রান্ত দুজনই ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা এবং তারা নিজেরাই পেশায় স্বাস্থ্যকর্মী।
মূলত ফলখেকো বাদুড় ও শূকরের মতো প্রাণীর মাধ্যমে নিপাহ ভাইরাস ছড়ায়। প্রথমদিকে তীব্র জ্বর ও মস্তিষ্কে প্রদাহ সৃষ্টি করলেও ধীরে ধীরে তা আক্রান্ত ব্যক্তিকে কাবু করে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়। চিকিৎসকদের মতে এই ভাইরাসে আক্রান্তদের মৃত্যুহার ৪০ থেকে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, মানুষ থেকে মানুষে নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ সম্ভব, তবে এটি বেশ বিরল। সাধারণত দীর্ঘ সময় আক্রান্তের ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে থাকলেই কেবল সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের বরাতে রয়টার্স জানায়, গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে ওই দুই স্বাস্থ্যকর্মীর দেহে নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত হয়। তারা বর্তমানে স্থানীয় একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে জানিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের জেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা।
ভারতের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই দুইজনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে এমন ১৯৬ জনের খোঁজ পাওয়া গেছে। তাদের কারও মধ্যেই স্বাস্থ্য পরীক্ষায় নিপাহ ভাইরাসের উপসর্গ পাওয়া যায়নি।
মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, নিপাহ ভাইরাস নিয়ে বিভ্রান্তিকর ও ভুল তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। ভারত সরকারের বাড়তি নজরদারি ও দ্রুত পদক্ষেপের ফলে প্রাণঘাতী এই ভাইরাসের সংক্রমণ সময়মতো নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে।

এদিকে, ভারতে নিপাহ ভাইরাস সংক্রমণের খবরে দেশটির বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে আসা যাত্রীদের জন্য বিমানবন্দরে প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা শুরু করেছে সিঙ্গাপুর। পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রেখে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং শনাক্ত ভাইরাসের জিনোম তথ্য ভাগ করে নেওয়ার জন্য একটি বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্ম তৈরির উদ্যোগ চলছে।
হংকং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ভারতের যাত্রীদের জন্য গেটে গেটে তাপমাত্রা পরীক্ষাসহ স্বাস্থ্য পরীক্ষা জোরদার করা হয়েছে। থাইল্যান্ডেও নিপাহ সংক্রমিত এলাকা থেকে আসা বিমানের জন্য আলাদা পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং যাত্রীদের ইমিগ্রেশন শেষ হওয়ার আগে স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট ছাড়পত্র পূরণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
একইভাবে মালয়েশিয়াও আন্তর্জাতিক প্রবেশপথে, বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ দেশ থেকে আগত যাত্রীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা বাড়িয়েছে। চীনের রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত দেশটিতে নিপাহ সংক্রমণ ধরা পড়েনি, তবে বাইরে থেকে সংক্রমণ আসার ঝুঁকি রয়েছে।
ভারতের সঙ্গে ব্যস্ত সীমান্ত ভাগ করে নেওয়া নেপাল নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ ঝুঁকি থেকে ‘উচ্চ সতর্কতা’ জারি করেছে এবং সীমান্তে ভারত থেকে আসা যাত্রীদের স্ক্রিনিং কঠোর করেছে।
নিপাহ ভাইরাস ভারতে নতুন নয়। বিশেষ করে কেরালা রাজ্যে নিয়মিত নিপাহ সংক্রমণের বিচ্ছিন্ন খবর পাওয়া যায়। ২০১৮ সাল থেকে রাজ্যে নিয়াফ সংক্রমণে একাধিক মৃত্যুর খবরও রেকর্ড হয়েছে। তবে পশ্চিমবঙ্গে গত দুই দশকের মধ্যে এবারই প্রথম নিপাহ ভাইরাস শনাক্ত হলো। এর আগে ২০০৭ সালে রাজ্যে ভাইরাসের সংক্রমণে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছিল।
বাংলাদেশেও প্রায়ই বাদুরের খাওয়া ফল কিংবা খেজুর রস পান করায় নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত ও মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের ছোট পরিসরের প্রাদুর্ভাব বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই স্বাভাবিক ঘটনা। তবে সাধারণ মানুষের জন্য ঝুঁকি এখনো কম।
যুক্তরাজ্যের এসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের মলিকিউলার ভাইরোলজির প্রভাষক এফস্তাথিওস জিওতিস বলেন, ‘সতর্ক থাকা জরুরি হলেও এই মুহূর্তে বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সংকটের কোনো প্রমাণ নেই।’
অবশ্য নিপাহ ভাইরাস মোকাবিলায় এখনো বিশ্বে কোনো অনুমোদিত ভ্যাকসিন বা চিকিৎসা নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই ভাইরাসকে ‘অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত রোগজীবাণু’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। কাজেই চিকিৎসা না থাকায় ভাইরাসটি রূপান্তরিত হয়ে আরও সংক্রামক হয়ে ওঠার শঙ্কা জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।
কোয়ালিশন ফর এপিডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস ইনোভেশনসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে মোট ৭৫০টি নিপাহ সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। তাদের মধ্যে ৪১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।


