গাজায় ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত থাকায় যুদ্ধবিরতি নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় সময় বুধবার দুটি হামলায় অন্তত ১০ জন নিহত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের আলোচকরা ইসরায়েলকে গাজায় হামলা কমানোর আহ্বান জানানোর মাত্র দুই দিন পর এসব হামলা হলো।
স্থানীয় হাসপাতাল ও ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্ট জানিয়েছে, বুধবারের দুই হামলায় অন্তত ১০ জন নিহত হয়েছেন।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানায়, নুসেইরাত শরণার্থী শিবির এলাকায় একটি হামলায় হামাসের এক কমান্ডারকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর দক্ষিণ ইসরায়েলে হামাসের হামলায় ওই কমান্ডার অংশ নিয়েছিলেন বলে দাবি করেছে ইসরায়েল। ওই হামলায় প্রায় ১ হাজার ২০০ জন নিহত হন। নিহতদের বেশির ভাগই বেসামরিক নাগরিক। ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয়।
গাজা সিটির তুফাহ এলাকায় আরেক হামলায় একটি পুলিশ স্টেশনে থাকা হামাসের চার সদস্যকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। তারা ইসরায়েলি সেনাদের ওপর হামলার পরিকল্পনা করছিল বলে দাবি করেছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী।
হামাস পরিচালিত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, গাজা সিটির পুলিশ স্টেশনে হামলায় আট পুলিশ সদস্য ও ১৩ বছরের এক মেয়ে নিহত হয়েছে। নিহত পুলিশ সদস্যদের মধ্যে দুইজন নারী। নুসেইরাতে আরও একজন নিহত হন।
ইসরায়েলি বাহিনী আরও জানায়, মঙ্গলবারের একটি হামলায় হামাসের চার কমান্ডার ও অন্য সদস্যদের বৈঠক লক্ষ্যবস্তু করা হয়। নিহতদের মধ্যে মুহাম্মদ হামদি আহমেদ আল-মাসরি, মুহাম্মদ আত্তার ও মুহাম্মদ ফাতহি হুসেইন নাসের ছিলেন বলে জানিয়েছে ইসরায়েল। তাদের ইসরায়েলি সেনাদের ওপর হামলার জন্য দায়ী করা হয়েছে। সামেদ সামির হারব আবু হাবাল ৭ অক্টোবরের হামলার সময় ইসরায়েলি ভূখণ্ডে প্রবেশ করেছিলেন বলেও দাবি করা হয়েছে।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় গাজার একটি ব্যস্ত সমুদ্রতীরবর্তী ক্যাফেতে ইসরায়েলি হামলায় এক শিশুসহ সাত ফিলিস্তিনি নিহত হন বলে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।
বুধবার ভোরে দক্ষিণ গাজার যুদ্ধবিরতি রেখা অতিক্রম করে ইসরায়েলি সেনারা হামাসের এক পুলিশ কর্নেলকে আটক করেছে বলে দুই প্রত্যক্ষদর্শী ও হামাসের এক কর্মকর্তা জানান।
অন্তত ১৫ ইসরায়েলি সেনা খান ইউনিসের পশ্চিমে মাওয়াসি উপকূলীয় এলাকায় প্রবেশ করে বলে দুই বাসিন্দা ও হামাসের এক কর্মকর্তা জানান। সশস্ত্র ব্যক্তিদের সঙ্গে নিয়ে সেনারা খান ইউনিসে হামাস পরিচালিত ব্লু পুলিশের কর্নেল সাবরি আবদেল-আল্লাহর তাঁবুতে অভিযান চালায়। তারা নাশাত এজাত জারাব নামে আরেক বাসিন্দাকেও আটক করে। নিরাপত্তার কারণে সূত্রগুলো নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেন।
মার্কিন আলোচক ও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার সোমবার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেন। বৈঠকে তিনি গাজায় হামলা কমানোর আহ্বান জানান বলে বৈঠক সম্পর্কে জানেন এমন এক ব্যক্তি জানান। সাংবাদিকদের ব্রিফ করার অনুমতি না থাকায় তিনি নাম প্রকাশ করেননি।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী বুধবার জানায়, গাজা যুদ্ধে সেনাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে ১৫০টি ঘটনার পর্যালোচনা শেষ হয়েছে। ২০২৪ সালে পাঁচ বছরের এক মেয়ে ও তার পরিবারের সদস্যদের মৃত্যু এবং ২০২৫ সালে ১৫ ফিলিস্তিনি প্যারামেডিক নিহতের ঘটনায় ফৌজদারি তদন্ত শুরু হবে।
যুদ্ধবিরতির পরও ১ হাজার ২৭৩ ফিলিস্তিনি নিহত
গত অক্টোবর থেকে গাজায় যুদ্ধবিরতি চলছে। এতে দুই মিলিয়নের বেশি মানুষের ঘনবসতিপূর্ণ এই অঞ্চলে লড়াই অনেকটা কমেছে। তবে যুদ্ধবিরতি শুরুর পর ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ১ হাজার ২৭৩ জন নিহত হয়েছেন বলে গাজার স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
প্রায় তিন বছর ধরে চলা ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধে ৭৩ হাজার ৪০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। সম্প্রতি বিলুপ্ত হামাস পরিচালিত সরকারের অধীনে থাকা মন্ত্রণালয়টি নিহতদের বিস্তারিত তথ্য সংরক্ষণ করে। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা ও আন্তর্জাতিক সংগঠন এসব তথ্যকে সাধারণত নির্ভরযোগ্য মনে করে।
মন্ত্রণালয়টি নিহতদের বেসামরিক নাগরিক ও যোদ্ধা হিসেবে আলাদা করে না। তবে তাদের হিসাবে নিহতদের প্রায় অর্ধেক নারী ও শিশু।
যুদ্ধবিরতি আলোচনায় অগ্রগতি কম
যুদ্ধবিরতি আরও শক্তিশালী করতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও থমকে গেছে বলে মনে হচ্ছে। ট্রাম্পের প্রাথমিক যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবে গাজায় হামাসের শাসনের অবসান ও অঞ্চলটি পুনর্গঠনের পরিকল্পনা ছিল। যুদ্ধের কারণে গাজার বড় অংশ ধ্বংস হয়েছে।
গত বছরের শরৎ থেকে হামাসের নিরস্ত্রীকরণ ও গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার নিয়ে বড় বিরোধ চলছে। কোন পদক্ষেপ আগে হবে, তা নিয়েও মতবিরোধ রয়েছে।
চলতি মাসের শুরুতে ট্রাম্প বলেন, হামাস নিরস্ত্রীকরণে রাজি হয়েছে। তবে হামাস জানায়, ইসরায়েল হামলা বন্ধ করে গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার করলেই তারা নিরস্ত্রীকরণ শুরু করবে।
হামাস আরও জানায়, ভারী অস্ত্র ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টি পরে বিবেচনা করা হবে। এর সঙ্গে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার শর্ত থাকবে। ইসরায়েল সরকার এই শর্ত প্রত্যাখ্যান করেছে।
নেতানিয়াহুও এ ব্যবস্থা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেছেন, হামাস পুরোপুরি নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার করা হবে না।
বুধবারের হামলার পর হামাসের মুখপাত্র হাজেম কাসেম ট্রাম্প প্রতিষ্ঠিত যুদ্ধবিরতি তদারকি সংস্থা ‘বোর্ড অব পিস’-এর সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, যুদ্ধবিরতি মানতে ইসরায়েলের ওপর চাপ না দিয়ে সংস্থাটি গাজায় হামলা বাড়ানোর জন্য ইসরায়েলকে ‘আড়াল’ দিচ্ছে।


