খুলনার একটি সৌরবিদ্যুৎ পার্ক, যা একসময় বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের অন্যতম অগ্রগামী প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত হতো, তা দীর্ঘ প্রায় ১৪ বছর ধরে বন্ধ হয়ে পড়ে আছে। পরিবেশবাদীরা জানিয়েছেন, মাত্র ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা খরচ করে মেরামত করলেই এই প্রকল্প থেকে আবারও বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। অথচ দীর্ঘদিন ধরে এটি অবহেলিত।
গত বুধবার খুলনা প্রেস ক্লাবে পরিবেশবাদী সংগঠন ‘নেইবারহুড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফোরাম’ (এনডিএফ-এফইডি) আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিষয়টি তুলে ধরা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের আহ্বায়ক আনোয়ারুল কাদির বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক সংঘাত ও ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বাংলাদেশের দুর্বলতাকে স্পষ্ট করে তুলেছে। এমন পরিস্থিতিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির মাধ্যমে স্বনির্ভরতা অর্জন করা দেশের জন্য অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
তিনি অভিযোগ করেন, ২০০৮ সালে সোনাডাঙ্গায় ৪ দশমিক ৩৩ একর জমির ওপর ২০ কিলোওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন এই সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নির্মাণ করা হয়েছিল। কিন্তু কারিগরি ত্রুটি, তার চুরি এবং কর্তৃপক্ষের চরম উদাসীনতার কারণে ২০১২ সাল থেকে এটি সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে।
এনডিএফ-এফইডি-এর মতে, ব্যাটারি এবং ইনভার্টারসহ কিছু যন্ত্রাংশ সামান্য মেরামত করলেই এই কেন্দ্রটি আবার সচল করা সম্ভব। আর এর জন্য আনুমানিক খরচ হবে মাত্র ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা।
সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির পক্ষ থেকে এই পার্কের টেকসই আধুনিকায়নের জন্য একটি কারিগরি ও আর্থিক প্রস্তাবনা পেশ করা হয়। প্রস্তাবনায় বলা হয়, পার্কের অব্যবহৃত ছাদ এবং এর ভেতরের পুকুরের ৩০ শতাংশ এলাকা ব্যবহার করে মোট ৩৩৫ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। এর মধ্যে ভবনের ছাদে সৌর প্যানেল বসিয়ে ৪৫ কিলোওয়াট এবং পুকুরের পানিতে ভাসমান সৌর প্যানেল স্থাপনের মাধ্যমে আরও ২৯০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যেতে পারে।
সংগঠনটির হিসাব অনুযায়ী, নতুন প্যানেল স্থাপন এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য প্রায় ১ কোটি ৫৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করলে, এখান থেকে প্রতি বছর আনুমানিক ৪৬ লাখ টাকার বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব।
তারা যুক্তি দেখান যে, বেসরকারি খাতের ‘ওপেক্স’ মডেলের অধীনে এই কেন্দ্রটি পরিচালনা করা হলে খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি) আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে তাদের বিনিয়োগের টাকা তুলে নিতে পারবে। এর পাশাপাশি প্রকল্পের বাকি ১৫ বছরের মেয়াদে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে বিদ্যুৎ সুবিধা ভোগ করতে পারবে।
এ ছাড়া, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং খুলনা সিটি করপোরেশনের আয়ের নতুন উৎস সৃষ্টির লক্ষ্যে পার্কের ভেতরে বর্তমানে বন্ধ থাকা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের সহায়তায় পুনরায় চালু করার প্রস্তাব দিয়েছে এনডিএফ-এফইডি।
সংগঠনটি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সফল সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের উদাহরণ টেনে কেসিসি কর্তৃপক্ষকে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানায়। একই সঙ্গে খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে (কেডিএ) নতুন ভবনগুলোতে সোলার প্যানেল স্থাপনে উৎসাহিত করার অনুরোধ করা হয়।
উল্লেখ্য, নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২০০৮ সালে সোনাডাঙ্গায় খুলনা সিটি কর্পোরেশনের মালিকানাধীন একটি পুকুর পাড়ে এই সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি স্থাপন করা হয়েছিল। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জার্মানির ব্রেমেন বিশ্ববিদ্যালয় এবং খুলনা সিটি করপোরেশনের যৌথ উদ্যোগে নির্মিত এই পার্কটি সে সময় দেশের প্রথম এবং বৃহত্তম সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিল।
কেসিসি সূত্র জানিয়েছে, খুলনার সন্তান এবং জার্মানির ব্রেমেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রয়াত অধ্যাপক বিভূতি রায়ের বিশেষ উদ্যোগে ১ কোটি ৫ লাখ টাকা অনুদানে ২০০৭ সালের ডিসেম্বরে এর নির্মাণ কাজ শুরু হয়। তবে ২০১২ সালে যন্ত্রপাতি বিকল হওয়া, চুরি এবং সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এখানে বিদ্যুৎ উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর কেন্দ্রটি পুনরায় সচল করার জন্য বেশ কয়েকবার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা আর আলোর মুখ দেখেনি।


