মিয়ানমার-থাইল্যান্ড সম্পর্ক: শত্রুতা পেরিয়ে অর্থনৈতিক চাহিদার যুগ

মিয়ানমার-থাইল্যান্ড সম্পর্ক: শত্রুতা পেরিয়ে অর্থনৈতিক চাহিদার যুগ
থাইল্যান্ড ও মিয়ানমারের পতাকা: ছবি: বাসস
Advertisement
Advertisement

গত দুইশত বছরে থাইল্যান্ড ও মিয়ানমারের সম্পর্ক পুরোনো শত্রুতা কাটিয়ে পারস্পরিক নির্ভরতার এক নতুন পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। এই দীর্ঘ সময়ে উভয় দেশ ইউরোপীয়দের আগমন, ঔপনিবেশিক শাসন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং পরবর্তীকালের স্নায়ুযুদ্ধ প্রত্যক্ষ করেছে।

১৮২০ সালের আগে তৎকালীন থাইল্যান্ড, যার নাম ছিল সিয়াম এবং বার্মা অর্থাৎ মিয়ানমারের মধ্যে তীব্র আঞ্চলিক যুদ্ধ ও শত্রুতা ছিল। ১৭৬৭ সালে বার্মার রাজা সিয়ামের আয়ুধ্যা রাজপ্রাসাদ আক্রমণ করে পুড়িয়ে দেন, যা ছিল তাদের সামরিক ক্ষমতার এক বড় উদাহরণ।

তবে ১৯ শতকে ইউরোপীয় দেশগুলোর এলাকা দখল ও উপনিবেশ গড়ার হাওয়া বার্মায় এসে পৌঁছালে এই সামরিক যুদ্ধের চেহারা বদলে যায়। ১৮২৪ থেকে ১৮৮৫ সালের মধ্যে ব্রিটেন ও বার্মার মধ্যে তিনটি যুদ্ধ ঘটে, যা অ্যাংলো-বার্মিজ যুদ্ধ নামে পরিচিত। এই যুদ্ধের ফলে বার্মার রাজতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে। ১৮৮৫ সালে পুরো বার্মাকে ব্রিটিশ ভারতের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ফলে বিলুপ্ত হয় বার্মার রাজপ্রাসাদ ও রাজশাসন।

অন্যদিকে, থাই রাজারা কৌশলগত নিরপেক্ষতা বজায় রেখে ব্রিটিশদের অধীনে চলে যাওয়া ঠেকিয়ে নিজেদের স্বাধীনতা টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হন। এজন্য তারা কূটনৈতিক পথ বেছে নেন এবং ব্রিটিশদের কাছে কিছু এলাকার নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেন। বার্মায় যখন ব্রিটিশ শাসন চলছিল, তখন থাই রাজা তাদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে পশ্চিম সীমান্তে শান্তি বজায় রাখেন। এর ফলে দুই প্রতিবেশীর মধ্যে শত বছর ধরে চলা সীমান্ত দখল ও সামরিক লড়াই শেষ হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থাই রাজা জাপানের সঙ্গে হাত মিলিয়ে পূর্ব বার্মার শান ও কায়াহ (কায়াক) প্রদেশ নিজের দখলে নেন। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে ১৯৪৮ সালে স্বাধীন বার্মার জন্ম হলে থাইল্যান্ড আবার তাদের সঙ্গে নতুন করে কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলে এবং দখল করা বার্মার এলাকা থেকে নিজেদের সৈন্য ফিরিয়ে নেয়। ঐ যুদ্ধের সময় বার্মার ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের নেতারা থাই রাজার আশ্রয়ে ও সহযোগিতায় সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন।

১৯৫০ থেকে ১৯৮০-এর দশক পর্যন্ত চলা স্নায়ুযুদ্ধের সময় থাইল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলে, আর বার্মা বেছে নেয় জোটনিরপেক্ষ নীতি। বার্মার তৎকালীন নেতা উ নু ১৯৫৫ সালের বান্দুং সম্মেলনে এশিয়া ও আফ্রিকার সদ্য স্বাধীন দেশগুলোর নেতাদের মধ্যে বড় ভূমিকা রাখেন। ১৯৬২ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বার্মার ক্ষমতা দখল করেন সেনাপ্রধান নে উইন। তিনি কঠোর জোটনিরপেক্ষতা ও একলা চলো নীতি গ্রহণ করেন। তার প্রবর্তিত সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা বার্মার অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দেয়।

এ সময় থাইল্যান্ড নিজেদের নিরাপদ রাখতে সীমান্তে বাফার জোন বা মধ্যবর্তী এলাকা তৈরির নীতি নেয়। থাই সেনাবাহিনী সীমান্তঘেঁষা কারেনসহ বিভিন্ন সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে গোপনে সাহায্য ও সমর্থন দিতে থাকে। ফলে থাই ও বার্মা সেনাবাহিনীর মাঝের এই এলাকাটি এক ধরনের বাফার জোন হিসেবে কাজ করত। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল বার্মা থেকে কমিউনিস্টদের থাইল্যান্ডে ঢোকা আটকানো। এই সুযোগে সীমান্তে অবৈধ ব্যবসার জোয়ার আসে—থাইল্যান্ড থেকে কারখানার তৈরি পণ্য বার্মায় যেত, আর বার্মা থেকে কাঠ, দামি পাথর ও আফিমের মতো প্রাকৃতিক সম্পদ থাইল্যান্ডে পাচার হতো।

১৯৮৮ সালে আন্দোলন ও বিক্ষোভের মুখে নে উইন সরকারের পতন হলে বার্মায় নতুন সামরিক জান্তা ক্ষমতায় আসে। ঠিক একই সময়ে থাই প্রধানমন্ত্রী চাতিচাই চুনাভান তার দেশের পররাষ্ট্রনীতি বদলে দেন। তিনি যুদ্ধ থামিয়ে পুরো অঞ্চলকে বাণিজ্যের এলাকা হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন। থাইল্যান্ড মিয়ানমারের গ্যাস উত্তোলনে বড় অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ করে এবং মিয়ানমারের ইয়াদানা ক্ষেত্র থেকে গ্যাস এনে নিজেদের জ্বালানি সংকট মেটায়।

আরও পড়ুন

এই ব্যবসায়িক সুবিধার দরুন থাইল্যান্ড মিয়ানমারকে দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় জোট আসিয়ানে নেওয়ার জন্য শক্ত ভূমিকা পালন করে। ১৯৯৭ সালে আসিয়ানের সদস্য হয় মিয়ানমার। পশ্চিমা দেশগুলো যখন মিয়ানমারকে একঘরে করা ও নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার নীতি নিয়েছিল, তখন থাইল্যান্ড পাশে থেকে সহযোগিতার পথ বেছে নেয়। ২০১০ সালে সামরিক জান্তার সংবিধানের মাধ্যমে আধা-সামরিক ও আধা-গণতান্ত্রিক সরকার গঠিত হলে থাই সরকার তাতে সমর্থন জানায়।

২১ শতকে এসে দুই দেশের সম্পর্ক এতটাই গভীর হয়েছে যে, একে অপরের ওপর তারা পুরোপুরি নির্ভরশীল। তবে এই নতুন বাস্তবতা নিরাপত্তা ও মানবিক দিক থেকে নানা চ্যালেঞ্জও তৈরি করেছে। থাইল্যান্ডের নিজস্ব জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার বর্তমানে কম হওয়ায় মিয়ানমারের অভিবাসী শ্রমিকদের ওপর তাদের অর্থনীতি অনেকাংশে নির্ভর করে। নির্মাণ, কৃষি, কারখানা ও পর্যটনসহ নানা খাতে মিয়ানমারের লাখ লাখ নাগরিক ভালো বেতনের আশায় থাইল্যান্ডে কাজ করছেন।

অন্যদিকে, মিয়ানমারের ভেতরের গোলাগুলি ও সংঘাতের কারণে লক্ষাধিক মানুষ শরণার্থী হয়ে থাই সীমান্তে আশ্রয় নিয়েছেন। এটি সীমান্ত নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ সীমান্ত পেরিয়ে মানব পাচার, মাদক পাচার ও অনলাইন প্রতারণার চক্র বেড়ে গেছে, যা সামলাতে থাই প্রশাসনকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে মিয়ানমারে আবার সামরিক অভ্যুত্থান হলে থাইল্যান্ড অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পা ফেলে। একদিকে গ্যাস সরবরাহ ঠিক রাখতে তারা সেনা জান্তার সঙ্গে কাজ চালিয়ে যায়, অন্যদিকে সীমান্তে নতুন করে শরণার্থীদের ঢল সামলাতে অনানুষ্ঠানিকভাবে সাহায্য ও ত্রাণ পাঠায়।

২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে মিয়ানমারের জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং সামরিক পোশাক ছেড়ে বেসামরিক প্রেসিডেন্ট হন। এরপর দুই দেশের সম্পর্কে নতুন অধ্যায় শুরু হয়, যা সম্পর্ক স্বাভাবিক ও গভীর করার নীতির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। থাই প্রধানমন্ত্রী আনুতিন চার্নভিরাকুল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মিয়ানমারকে কোণঠাসা না করে আবার আলোচনায় ফিরিয়ে আনতে মূল ভূমিকা নেন। তারা একঘরে করার নীতির চেয়ে সীমান্ত নিরাপত্তা, ব্যবসা ও আলোচনাকে বেশি গুরুত্ব দেন।

২০২১ সালে আসিয়ানের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছিল মিয়ানমার সরকার নিজেদের নাগরিকদের ওপর হামলা থামাবে। সম্প্রতি মিয়ানমার সংসদ তা মানতে অস্বীকার করলেও ২০২৬ সালের নির্বাচনের পর থাইল্যান্ডের ফুকেটে অনুষ্ঠিত আসিয়ান পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে মিয়ানমারের নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দিয়ে তাদের আবার আসিয়ান প্রক্রিয়ায় ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেয় থাইল্যান্ড।

গত ৬-৭ আগস্ট ২০২৬ সালে মিয়ানমারের নতুন প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইং থাইল্যান্ড সফরে গেলে তাকে সরকারিভাবে স্বাগত জানানো হয়। এর মাধ্যমে থাইল্যান্ড আসিয়ান জোটের দীর্ঘ প্রক্রিয়ার আশা ছেড়ে সরাসরি দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে সম্পর্ক গড়ে তোলার পথে হাঁটছে। এতে ঝুঁকি থাকলেও থাইল্যান্ডের নীতি হলো—সংঘাত চললেও দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা থামবে না। তারা আঞ্চলিক কূটনীতির চেয়ে নিজেদের আলোচনার মাধ্যমেই মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত কমানোর চেষ্টা করছে।

সম্প্রতি মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট তাদের দুই বড় প্রতিবেশী ভারত ও চীন সফর করেছেন। চীন তাদের জাতিসংঘ ও আসিয়ানে স্বাভাবিক ভূমিকায় ফেরাতে সমর্থনের কথা জানিয়েছে। আর ভারত তাদের সঙ্গে সড়ক, নিরাপত্তা ও বাণিজ্য বাড়াতে আগ্রহী। থাইল্যান্ডের নীতিকেও এই দুই বড় প্রতিবেশীর আচরণের সঙ্গেই তুলনা করা যায়। মূলত মিয়ানমারের সঙ্গে সহযোগিতার পরিবেশ বজায় রাখা, প্রতিবেশীর সম্পর্ক রাখা এবং জান্তার ক্ষমতাকে সমর্থন দেওয়া—এই বিষয়গুলোর ভেতরের সূক্ষ্ম তফাতটি মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ শান্তির ওপর ভিত্তি করেই পরীক্ষা করা যাবে।

৬-৭ আগস্টের সফরে ব্যাংককে দুই দেশের মধ্যে অনেকগুলো চুক্তি ও সমঝোতা সই হয়। এর মধ্যে রয়েছে থাইল্যান্ডে মিয়ানমারের শ্রমিক সরবরাহ ও কাজের অনুমতি দেওয়া, যৌথভাবে সীমান্ত নিরাপত্তা ও অপরাধ দমন, অর্থ পাচার, মানব পাচার ও মাদক পাচার প্রতিরোধ, কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার, সীমান্ত নদী দূষণ মুক্ত রাখা, ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগ সুরক্ষা দেওয়া, সীমান্ত বাণিজ্যে নিরাপত্তা বাড়ানো, ব্যাংকক ও ইয়াঙ্গুনের মধ্যে বাড়তি বিমান চালানো এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। দুই দেশ তাদের বাৎসরিক বাণিজ্য ১২ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।

তবে এই সফর চলাকালে ব্যাংককের রাস্তায় থাইল্যান্ডে বসবাসকারী ও আশ্রয় নেওয়া মিয়ানমারের নাগরিকরা বিক্ষোভ করেন। থাই পার্লামেন্টের এক সংসদ সদস্যও এই সফর নিয়ে ভিন্নমত জানান এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা মিয়ানমার প্রেসিডেন্টকে স্বাগত জানানোর কারণে থাই সরকারের কড়া সমালোচনা করে।

অতীতে থাইল্যান্ড ও মিয়ানমারের সম্পর্কে অনেক যুদ্ধ ও শত্রুতা ছিল, আবার সহযোগিতাও ছিল। তবে বর্তমানে ২৪০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তে শান্তি রাখা, নিজেদের কারখানায় শ্রমিকের জোগান দেওয়া এবং গ্যাসের প্রবাহ ঠিক রাখতে থাইল্যান্ড বাস্তবতার খাতিরেই মিয়ানমারের নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় শুরু করছে।

লেখক: বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad