নতুন শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই শিক্ষার্থীদের হাতে পাঠ্যবই পৌঁছে দিতে নানামুখী চেষ্টা করছে সরকার। কিন্তু ধীরগতির কাজে ২০২৭ সালেও শিক্ষার্থীরা বছরের শুরুতে সব বই হাতে পাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
বাংলা মাধ্যমের পাঠ্যবই পরিমার্জনের কাজ বেশ এগিয়ে গেলেও ইংরেজি মাধ্যমের কাজ সবেমাত্র শুরু হয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে যে ৪টি একদম নতুন বই যুক্ত করার কথা, সেগুলোর লেখার কাজ এখনো শুরুই হয়নি।
বই ছাপানো, কেনাকাটা এবং বিতরণের জটিলতায় ২০২৫ ও ২০২৬ পরপর দুই বছরই কোটি কোটি শিক্ষার্থী সব বই ছাড়াই ক্লাস শুরু করতে বাধ্য হয়।
২০২৫ সালে প্রাথমিক স্তরের প্রায় ৯ কোটি ১৯ লাখ বইয়ের মধ্যে শুরুতে দেওয়া সম্ভব হয়েছিল মাত্র ৪ কোটি বই। অন্যদিকে মাধ্যমিকের প্রায় ৩১ কোটি বইয়ের বিপরীতে পৌঁছেছিল মাত্র ১ কোটি ৯০ লাখ।
২০২৬ সালে প্রাথমিকের শিক্ষার্থীরা সময়মতো বই পেলেও মাধ্যমিক ও ইবতেদায়ীর প্রায় ৫ কোটি ৮২ লাখ বই সময়মতো দেওয়া যায়নি। বইয়ের অভাবে সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণীর শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ে। কেনাকাটার সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হওয়া এবং মুদ্রণ বিলম্বকে এর জন্য দায়ী করে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)।
একটি বই চূড়ান্ত করে ছাপাখানায় কার্যাদেশ দেওয়ার আগে পরিমার্জনের বেশ কয়েকটি ধাপ পার হতে হয়। কার্যাদেশ পাওয়ার পর ছাপাখানাগুলো বই ছাপানোর জন্য দুই মাস সময় পায়। এর পর মান যাচাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ ধাপটি পার হলে তবেই বই বিতরণের ছাড়পত্র মেলে।
এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু নাছের টুকূ এ বিষয়ে বলেন, ‘প্রাক-প্রাথমিক ও ইবতেদায়ী স্তরের বই পরিমার্জন শেষে ছাপানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এক-দুই দিনের মধ্যেই ছাপার কাজ শুরু হবে। প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির বাংলা মাধ্যমের বই পরিমার্জনের কাজও প্রায় শেষ। এটি শিগগিরই সরকারি ক্রয় কমিটিতে যাবে।’
আগামী বছরের নতুন ৪টি বইয়ের প্রস্তুতিও চলছে বলে জানান তিনি।
এনসিটিবির প্রধান সম্পাদক এ কে এম শওকত আলী বলেন, ‘বাংলা মাধ্যমের সব বইয়ের মূল পরিমার্জন শেষ। এখন ছোট ছোট বিষয়গুলো শেষবারের মতো দেখা হচ্ছে। ইংরেজি মাধ্যমের কাজও চলছে। আশা করছি, সব কাজ নির্ধারিত সময়েই শেষ হবে।’
নতুন ৪ বইয়ের জন্য লেখকের অপেক্ষা
শিক্ষার্থীদের খেলাধুলা ও সংস্কৃতিতে আগ্রহী করতে চতুর্থ শ্রেণিতে ‘খেলাধুলা’ এবং ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ নামে নতুন দুটি বই যুক্ত করা হচ্ছে।
এ ছাড়া বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী, শিক্ষাব্যবস্থা আনন্দদায়ক করা এবং কারিগরি শিক্ষার প্রতি শ্রদ্ধা ও আগ্রহ বাড়াতে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ‘আনন্দদায়ক শিখন’ ও ‘কারিগরি শিক্ষা’ নামে আরও দুটি নতুন বই আসছে।
এনসিটিবি সূত্রে জানা গেছে, সম্ভাব্য লেখকদের একটি তালিকা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। মন্ত্রণালয় এটি অনুমোদন করলেই বই লেখার কাজ শুরু হবে।
এই ৪টি নতুন বই যুক্ত হলেও এগুলোর জন্য পৃথক কোনো শিক্ষাক্রম তৈরি করা হয়নি।
এনসিটিবির এক বিশেষজ্ঞ জানান, খেলাধুলা ও সংস্কৃতির কিছু বিষয় আগে থেকেই বইয়ে ছোট আকারে ছিল। এখন তা আলাদা বইয়ে বিস্তারিত থাকবে। তবে ‘আনন্দদায়ক শিখন’ বিষয়টি সম্পূর্ণ নতুন। বিদ্যমান শিক্ষাক্রমের ওপর ভিত্তি করেই এর একটি কাঠামো বানানো হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তা আরও জানান, এই নতুন বইগুলো শুরুতে সীমিত পরিসরে দেওয়া হতে পারে।
এনসিটিবির সদস্য (প্রাথমিক শিক্ষাক্রম) মো. ইকবাল হায়দার বলেন, ‘প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির বাংলা বই পরিমার্জনের কাজও শেষ দিকে। আগামী ১০ আগস্টের মধ্যে এগুলো চূড়ান্ত করে জমা দেওয়া হবে।’
ইতিহাস ছাড়া খুব একটা পরিবর্তন নেই
২০২৬ শিক্ষাবর্ষের জন্য ২০২১ সালের শিক্ষাক্রমে কাটছাঁট করে বইয়ের বিষয়বস্তুতে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছিল এনসিটিবি। তাই ২০২৭ সালের বইয়ে খুব বেশি পরিবর্তন আসছে না। তবে রাজনৈতিক ইতিহাসের অংশগুলোতে কিছু বিষয় নতুন করে যোগ হচ্ছে।
এনসিটিবির সদস্য (শিক্ষাক্রম) মুহাম্মদ ফাতহুল কাদীর বলেন, ‘ইতিহাসের কিছু বিষয় ছাড়া আগামী বছরের বইয়ে খুব একটা রদবদল থাকবে না। কোনো রাজনৈতিক পক্ষপাত ছাড়া নিরপেক্ষভাবে বিষয়বস্তু সাজানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।’
তিনি জানান, ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ভূমিকা এবং ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনায় জিয়াউর রহমানের ভূমিকা ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়ে যুক্ত করা হচ্ছে।
এর পাশাপাশি জিয়াউর রহমানের ‘স্বাধীনতার ঘোষণা’ এবং নবম-দশম শ্রেণির বাংলা বইয়ে তার লেখা একটি প্রবন্ধ অন্তর্ভুক্ত থাকছে। চতুর্থ শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়েও জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়াকে নিয়ে একটি অধ্যায় থাকবে।
এনসিটিবি সূত্রে জানা গেছে, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য প্রাথমিকে ৮ কোটি ২১ লাখের বেশি এবং মাধ্যমিক, কারিগরি ও ইবতেদায়ীতে ২২ কোটি ৫ লাখের বেশি বই ছাপা হচ্ছে। প্রায় ৩১ কোটি বই ছাপাতে মোট বাজেট ধরা হয়েছে প্রায় এক হাজার ৯০০ কোটি টাকা।
এনসিটিবির কয়েকজন সাবেক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রাথমিকের বইগুলো যেহেতু চার-রঙা হয়, তাই মানের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে সময় প্রয়োজন হয়। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের বইয়ের ফর্মা বেশি, এখানে কাজও বেশি।
এ ছাড়া শুধু বই ছাঁপানো শেষ হওয়া মানেই কাজ শেষ করা না। বই বাঁধাই করা, কয়েকধাপে মান নিয়ন্ত্রণ ও বইগুলো স্কুল পর্যন্ত পাঠানোর অনেক ধাপ থাকে।
এরপরও সেপ্টেম্বরের মধ্যে সব বই প্রকাশের টেন্ডারপ্রক্রিয়া চূড়ান্ত করতে পারলে এবং এনসিটিবি কঠোরভাবে নিয়মিত কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করলে অন্তত বাংলা ভার্সনের অধিকাংশ বই জানুয়ারির প্রথমার্ধেই দেওয়া সম্ভব।
তবে ইংরেজি ভার্সনের বই এবং নতুন চারটি বইয়ের কাজ ভালোভাবে সম্পন্ন করতে গেলে আরেকটু সময় লাগতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা।
তবে এনসিটিবিতে কর্মরত একজন কর্মকর্তাও নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমরা নিরলস কাজ করছি। যে সময়ের মধ্যে যে কাজ শেষ করার কথা, অনেক কারণেই তা হচ্ছে না। প্রতিটা ধাপেই কিছুটা সময় বাড়ছে। হয়তো সব বই না গেলেও বছরের প্রথমদিন মূলবইগুলো স্কুলে পাঠানোর লক্ষ্য আছে। যদি কিছু বাকি থাকে সেগুলোও জানুয়ারির মধ্যেই পাঠানোর পরিকল্পনা আছে।’
মন্ত্রী যেহেতু এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা নির্ধারিত সেশনের মধ্যেই শেষ করার লক্ষ্য ঘোষণা করেছেন। তাই ডিসেম্বরের বার্ষিক পরীক্ষার পর জানুয়ারির আগেই শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই তুলে দেওয়ার ব্যাপারে সরকার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাই গতবারের তুলনায় বই বিতরণের সময় নিয়ে সমস্যা কম হবে বলে আশা করছি।


