ডেইলি স্টার ও প্রথম আলো কার্যালয়ে ভাঙচুর, আগুন ও লুটপাটের ঘটনায় স্তম্ভিত হয়ে আছেন প্রতিষ্ঠান দুটির কর্মীরা। পোড়া কাগজ, ছুড়ে ফেলা কম্পিউটার, ছাই হয়ে যাওয়া আসবাব, ভাঙা কাচ আর কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন ঘর কেবল অবকাঠামোগত ক্ষতির চিত্র নয়, এর সঙ্গে পুড়ে গেছে সাংবাদিকদের বহু বছরের পরিশ্রম, আর্কাইভ, তথ্যভাণ্ডার ও হাজারও স্মৃতি।
গুরুত্বপূর্ণ নথি, হার্ডড্রাইভ এবং পেশাগত উপকরণ ধ্বংস হয়ে যাওয়া মানে একটি সংবাদপ্রতিষ্ঠানের হাজারও ইতিহাসের সাক্ষী হওয়ার স্মৃতি মুছে যাওয়া। সংবাদমাধ্যমে হামলা মানেই সংবিধান স্বীকৃত মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর হামলা।
ঢাকার কারওয়ান বাজারে ডেইলি স্টার ও প্রথম আলো কার্যালয়ে সহিংস এ হামলার ঘটনা প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষতির পাশাপাশি দেশের গণতন্ত্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলেছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়, এই হামলা চলাকালে ভবন দুটির ভেতরে মানুষ আটকে পড়েছিলেন। আগুনের ধোঁয়া, মবের আতঙ্কে তারা সরাসরি মৃত্যু ঝুঁকিতে পড়েন। জীবন বাঁচাতে ডেইলি স্টার ভবনে আটকে পড়া অন্তত ৩০ জন সাংবাদিক ও কর্মীরা ছুটে যান ছাদে। উদ্ধার হওয়ার আগ পর্যন্ত চরম আতঙ্কে কাটানো ওই কয়েক ঘণ্টাকে ভয়াবহ অনুভূতি হিসেবে উল্লেখ করেছেন ডেইলি স্টারের কর্মীরা।
এমনকি আগুন নেভাতে আসা ফায়ার সার্ভিসের গাড়িও আটকে দেয় বিক্ষুব্ধরা। সেনাবাহিনী ও আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর উপস্থিতিতে দেশের প্রথম সারির সংবাদমাধ্যমে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও কর্মীদের প্রতি সহিংস আচরণ দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতির দুর্বল অবস্থা ও ভঙ্গুর চিত্রের প্রমাণ দিচ্ছে।

ভেতরে মানুষকে আটকে রেখে চালানো এ হামলাকে তাই ‘‘বেপরোয়া এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে মনে করছেন অনেকে, যার পরিণতি আরও ভয়াবহ হতে পারত।
এই হামলার পেছনের প্রেক্ষাপট রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে স্পর্শকাতর হলেও সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকের ওপর হামলার ঘটনায় নিন্দার ঝড় বইছে সুশীল সমাজে।
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদিকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে তার সমর্থক ও জুলাই অভ্যুত্থানের পক্ষের গোষ্ঠী। বৃহস্পতিবার রাতে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যুর খবর প্রকাশ পেতেই ‘ভারতীয় আধিপত্যবাদের প্রতিষ্ঠান’ ট্যাগ দিয়ে হামলা চালানো হয় সংবাদমাধ্যমসহ ছায়ানটের মতো সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে।
বিশ্বে রাজনৈতিকভাবে জনপ্রিয় কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর ঘটনার পর জনরোষ তৈরি হওয়া কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। তবে সেই রোষের বহিঃপ্রকাশ যদি সংবাদমাধ্যমের ওপর আঘাত হানে, তবে সেটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। সংবাদপত্র কোনো পক্ষের নয়- সংবাদপত্র তথ্যের বাহক, সমাজের দর্পণ।
ডেইলি স্টার, প্রথম আলোয় হামলার ঘটনায় আজ প্রশ্ন উঠছে- দেশে সাংবাদিকরা কতটা নিরাপদ? একটি জাতির সামনে সত্য তুলে ধরার, জাতির সত্য ঘটনা জানার অধিকার রক্ষাকারীরা যদি নিজেরাই নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, তাহলে গণতন্ত্রের ভিত্তি কীভাবে মজবুত থাকবে?

দ্য ডেইলি স্টারের সাংবাদিকদের চোখে যে শোক, আতঙ্ক ও অসহায়তা দেখা গেছে, তা শুধু তাদের ব্যক্তিগত কষ্ট নয়- এটি পুরো সাংবাদিক সমাজের অনুভূতি।
এদিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে জানানো হলেও, হামলায় জড়িত কেউ গ্রেপ্তার না হওয়াও হতাশাজনক বলে মনে করছে সাংবাদিক সমাজ।
এই ধরনের হামলার ক্ষেত্রে দ্রুত ও দৃশ্যমান বিচারিক পদক্ষেপ না নেওয়া হলে অপরাধীরা পরবর্তীতে আরও ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করতে সাহস ও উৎসাহ পাবে।
ডেইলি স্টার, প্রথম আলোর ধ্বংসাবশেষ মনে করিয়ে দেয় স্বাধীন সাংবাদিকতা কোনো নিশ্চয়তা নয়, এ স্বাধীনতা প্রতিনিয়ত রক্ষা করতে হয়, এ স্বাধীনতা রক্ষার চেষ্টায় পড়তে হয় জীবন শঙ্কায়।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু আগুন নেভানো নয়, বরং এর নেপথ্যে থাকা সহিংস মানসিকতা ও দায়ীদের চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া। একই সঙ্গে সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কার্যকর উদ্যোগও প্রয়োজন। দোষীদের যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করাই হবে এ সংকট থেকে উত্তরণের প্রথম ধাপ।


