বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস আলী রহস্যজনকভাবে নিখোঁজের ১৪ বছরের বেশি সময় পর জড়িত সন্দেহে বিমান বাহিনীর এক সাবেক উইং কমান্ডারকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।
হেফাজতে নেওয়া মো. সাইফুর রহমান ২০১২ সালে বিএনপি নেতা গুমের সময় তিনি ছিলেন স্কোয়াড্রন লিডার। সে সময় তিনি র্যাবের গোয়েন্দা বিভাগে কাজ করতেন। পরে তিনি উইং কমান্ডার হিসেবে অবসরে যান।
অবসরে যাওয়ার পর একটি বেসরকারি বিমান সংস্থায় পাইলট হিসেবে কাজ করেছিলেন সাইফুর। তিনি সেনাবাহিনীর সাবেক প্রধান জেনারেল এস এম শফিউদ্দিন আহমেদের জামাতা।
মঙ্গলবার তাকে আটক করে বিমান বাহিনীর হেফাজতে নেওয়া হয়েছে বলে টাইমস অব বাংলাদেশকে নিশ্চিত করেছে সশস্ত্র বাহিনীর সূত্র। তবে আন্তবাহিনী গণসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) এক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে পরে জানাব।’
গত ২১ জুন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সেনাবাহিনীর ওয়ারেন্ট অফিসার ইমরুল কায়েসের দেওয়া সাক্ষ্যে সাইফুর রহমানের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠে আসে। যেখানে র্যাবের সাবেক কর্মকর্তা মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের সম্পৃক্ততার অভিযোগও আনা হয়।
ইমরুল মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় সাক্ষ্য দিচ্ছিলেন। শতাধিক গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগের এই মামলার প্রধান আসামি জিয়াউল আহসান।
২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল রাতে ঢাকা থেকে নিখোঁজ হন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ইলিয়াস আলী। হোটেল শেরাটন থেকে বাসায় ফেরার পথে বনানীর দুই নম্বর সড়কে তাকে ও তার ড্রাইভারকে অপহরণ করার অভিযোগ উঠে। তবে সরকারি বাহিনী কখনো তাকে আটক করার অভিযোগ স্বীকার করেনি। আওয়ামী লীগ শাসনামলে সরকার এই বিষয়টি খতিয়ে দেখারও উদ্যোগ নেয়নি।
সাইফুর সে সময় র্যাব গোয়েন্দা শাখার প্রধান তৎকালীন পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিয়াউল আহসানের (পরে মেজর জেনারেল হন) অধীনে ছিলেন।
সেই অপহরণের পর ইলিয়াস আলী ও গাড়ি চালকের শেষ পরিণতি এখনো সবার অজানা। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নানা ধরনের খবরের একটিতে প্রচার করা হয়, র্যাব ইলিয়াস আলীকে তুলে নিয়ে হত্যার পর মরদেহ নদীতে ডুবিয়ে দিয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ইলিয়াস আলীর স্ত্রী সংসদ সদস্য তাহসিনা রুশদীর লুনা গুম কমিশনে অভিযোগ করেন। পরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলাটি পাঠানো হয়।
লুনা মঙ্গলবার রাতে টাইমস’কে বলেন, ‘এক যুগেরও বেশি সময় পরে হলেও রহস্য উদঘাটন ও ন্যায়বিচারের পথ তৈরি হয়েছে। ট্রাইব্যুনাল তদন্ত করছে। জড়িতরা চিহ্নিত হচ্ছে। একে একে সবাই ধরা পড়বে বলে আশা করছি।’
ওয়ারেন্ট অফিসার ইমরুল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেওয়া সাক্ষ্যে জানান, জিয়াউল আহসানের নেতৃত্বে সাদা পোশাকে র্যাবের একটি দল ইলিয়াস আলীকে আটকের জন্য মাইক্রোবাস নিয়ে মহাখালী ওভার ব্রিজে অপেক্ষা করছিল। র্যাবের সেই দলে তখনকার স্কোয়াড্রন লিডার সাইফুরও ছিলেন। তবে মহাখালী ওভার ব্রিজ থেকে ইলিয়াস আলীকে আটক করা যায়নি।
পরদিন সাদা পোশাকের একটি দল বনানী থেকে ইলিয়াস আলী ও তার গাড়িচালককে তুলে নিয়ে যাওয়ার খবর প্রচার হয়।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা টাইমস’কে বলেন, ডিজিটাল প্রমাণ যাচাই করেই তারা জানতে পেরেছেন, ঘটনাটি র্যাবের গোয়েন্দা বিভাগ ঘটিয়েছিল। যারা এর সঙ্গে জড়িত ছিল, তাদের দায় নিশ্চিত হওয়ার বিষয়টি আদালতে প্রমাণ হিসেবে দেওয়া হবে।
এ ঘটনার সঙ্গে সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইয়ের কোনো সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত ডিজিটাল কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে অবশ্যই আমরা আরও তদন্ত করব। এক্সিকিউশন বডি হিসেবে যেহেতু আমরা র্যাবের গোয়েন্দাকে পেয়েছি, তাকে (সাইফুর) রিমান্ডে আনলে তখন হয়তো সবকিছু স্পষ্ট হবে।’
ইলিয়াস আলীকে গুম করার বিষয়ে ২০২২ সালেই একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করেছিল নেত্র নিউজ। এতে লেখা হয়, ইলিয়াস আলী গুম হওয়ার পর তদন্তে নামে র্যাব-১। তাদের প্রতিবেদনে গুমের সঙ্গে র্যাবে কর্মরত সামরিক বাহিনী থেকে ডেপুটেশনে আসা কয়েকজন কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতার কথা বলা হয়।
এই প্রতিবেদনের কপি র্যাব সদর দপ্তর, প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর (ডিজিএফআই) ও সামরিক গোয়েন্দা পরিদপ্তরের কাছে পাঠানো হয়।
প্রতিদেনে বলা হয়, ইলিয়াস আলীর অপহরণের ঘটনাটি সূক্ষ্মভাবে পর্যালোচনা করলে বোঝা যায় এটি সুপরিকল্পিত, যা র্যাবের গোয়েন্দা শাখা ঘটিয়েছে।
ইলিয়াস আলীকে অপহরণের সময় ঘটনাস্থলের আশেপাশে ছিলো এমন তিনটি সন্দেহজনক মোবাইল ফোন নম্বরের সূত্র ধরে র্যাব তদন্ত শুরু করে। তিনটি নম্বরের কল ডেটা রেকর্ড বিশ্লেষণ করে আরও পাঁচটি নম্বরের সন্ধান পাওয়া যায়। আটটি নম্বরই ছিল সিটিসেল-এর।
সিডিএমএ মোবাইল অপারেটর হিসেবে সিটিসেল-এর নম্বরে আড়িপাতার সক্ষমতা রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর ছিল না।
সিটিসেলের আটটি নম্বরই ভুয়া নাম-পরিচয় ব্যবহার করে উত্তরার দেশ টেলিকম নামে একটি দোকান থেকে কেনা হয়েছিল। মাত্র ৩ ঘণ্টা এই নম্বরগুলো সক্রিয় ছিল। আটটি নম্বরের ব্যবহারকারীরা শুধু নিজেদের মধ্যেই কথা বলেছেন। ১৭ এপ্রিল রাত ১১টার পর সবগুলো নম্বর চালু করা হয়, ১৮ এপ্রিল রাত ১ টার মধ্যেই সবগুলো নম্বর বন্ধ করে ফেলা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, অপহরণের অভিযানে কাজ করছিল তিনটি দল। একটি দল ইলিয়াস আলী ও তার গাড়িচালককে অপহরণের জন্য ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিল। এই দলের ব্যবহৃত চারটি নম্বর এয়ারপোর্ট ও জোয়ার সাহারা এলাকায় চালু করা হয়।
আরেকটি দল হোটেল রূপসী বাংলা (এখনকার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল) থেকে ইলিয়াস আলীকে অনুসরণ করে অপহরণকারী টিমকে ইলিয়াস আলীর গতিবিধি সম্পর্কে অবহিত করছিল।
তৃতীয় আরেকটি দল ডিজিএফআই সদর দপ্তরে অবস্থিত ন্যাশনাল মনিটরিং সেন্টার বা এনএমসি থেকে অপহরণকারী টিমকে সার্বক্ষণিক মোবাইল মনিটরিং সুবিধা দিচ্ছিল।
বিএনপির সিলেট বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ইলিয়াছ আলীকে গুমের পর ঘটনাটি সারা দেশে তোলপাড় সৃষ্টি করে। পুলিশ-র্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করেও ইলিয়াছ আলীর কোনো হদিস পাননি তার স্ত্রী লুনা। পরে তিনি ইলিয়াস আলীর সন্ধান চেয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গেও দেখা করেন।
শেখ হাসিনা তখন ইলিয়াস আলীকে খুঁজে দেওয়ার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দেওয়ার আশ্বাস দিলেও কার্যত সরকারের কোনো সংস্থাই আর সে কাজ করেনি।


