প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার মন্ত্রিসভা বুধবার অসংখ্য প্রতিশ্রুতির মধ্য দিয়ে প্রথম কার্যদিবস শুরু করেছেন। মন্ত্রিসভা সদস্যদের কথা শুনলে মনে হতে পারে এক বদলে যাওয়া বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি, যা হবে শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ এবং যেখানে শাসনব্যবস্থা পরিচালিত হবে স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতার ভিত্তিতে। তবে এসব কথা বাস্তবে রূপ দেওয়া অনেক বেশি কঠিন কাজ।
মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের অঙ্গীকারগুলো রাষ্ট্রের প্রায় প্রতিটি নাজুক ক্ষেত্রকে স্পর্শ করেছে, যার মধ্যে রয়েছে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, দুর্নীতি দমন, দীর্ঘদিনের অনিয়মে জর্জরিত মন্ত্রণালয়গুলোকে ঢেলে সাজানো, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং নির্ভীক সাংবাদিকতার পরিবেশ নিশ্চিত করা। ক্ষমতা গ্রহণের উদ্দীপনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে মন্ত্রীরা রাজনৈতিক অস্থিরতায় দীর্ঘকাল পর্যুদস্ত এই দেশটির জন্য এক ব্যাপক ও বিস্তৃত রূপকল্প তুলে ধরেছেন।
এসব অঙ্গীকার বেশ চিত্তাকর্ষক। তবে প্রতিশ্রুতি এবং তা বাস্তবায়নের মধ্যকার ব্যবধান এখনও অনেক বড়। এ দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বেশ অন্ধকার। নির্বাচনী প্রচারণার সময় কিংবা দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনগুলোতে প্রায়ই এমন মহৎ ঘোষণা দেওয়া হয়, কিন্তু কাজের ক্ষেত্রে প্রায়ই তার প্রতিফলন ঘটে না। সুসময়ের এই মোহময় মুহূর্ত দ্রুতই স্বার্থের সংঘাত, দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক চাপের মুখে ম্লান হয়ে যায়, যা এমনকি দৃঢ় ইচ্ছাশক্তিকেও কঠোর পরীক্ষার মুখোমুখি করে।
বাংলাদেশ আগেও এমন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে। শেখ হাসিনা যখন ২০০৯ সালে বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় ফিরেছিলেন, তখন তার সরকার সুশাসন, আইনের শাসন, কর্মসংস্থান এবং দুর্নীতি নির্মূলের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। বাকস্বাধীনতা রক্ষা এবং স্বাধীন সাংবাদিকতা নিশ্চিত করাও ছিল সেই অঙ্গীকারের মূলে। অনেক নাগরিকের কাছে সেটি ছিল নতুন করে আশা জাগানিয়া একটি মুহূর্ত। শুরুর বছরগুলোতে অগ্রগতির কিছু চিহ্ন দেখা গেলেও সময়ের সাথে সাথে সেই প্রত্যাশাগুলো কেন্দ্রীভূত শাসন ব্যবস্থা, ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসা ভিন্নমত এবং দুর্নীতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অতল গহ্বরে হারিয়ে যায়।
প্রধান বিরোধী দলগুলোর বর্জন করা ২০১৪ সালের নির্বাচন গণতান্ত্রিক পশ্চাদপসরণ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছিল। এক দশক পরে, ব্যাপক সমালোচিত আরেকটি নির্বাচনের পর, ২০২৪ সালের এক গণঅভ্যুত্থানে শেষ পর্যন্ত সেই সরকারের পতন ঘটে।
ঠিক এই প্রেক্ষাপটেই নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করছে। পরিবর্তনের গণদাবির ওপর ভর করে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে তারেক রহমানের বিএনপি। ভোটারদের কাছে এই জনরায় কেবল নেতৃত্বের পরিবর্তন নয়, বরং রাজনৈতিক সংস্কৃতির আমূল পরিবর্তনের একটি সুযোগ।
তবুও রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর জনগণের আস্থা বারবার হোঁচট খেয়েছে। বছরের পর বছর ধরে নাগরিকরা একের পর এক সরকারের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করেছেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেসব প্রতিশ্রুতি ফিকে হতে বা পুরোপুরি ভুলে যেতে দেখেছেন। নতুন মন্ত্রীরা তাদের উদ্বোধনী ঘোষণার মাধ্যমে প্রত্যাশার পারদ অনেক উঁচুতে তুলেছেন। তবে শুধু কথামালা-ই যথেষ্ট হবে না। এসব প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে হলে প্রয়োজন হবে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং নিরবিচ্ছিন্ন জবাবদিহিতা।


