বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে ধান ও অন্যান্য ফসল চাষ ছেড়ে আম চাষ শুরু করেছিলেন হাজার হাজার কৃষক। কিন্তু তারা এখন চরম অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছেন। গত এক দশকে আমের বাগানের আকার এবং মোট উৎপাদন কয়েক গুণ বাড়লেও বাজারের চাহিদা সেই অনুপাতে বাড়েনি।
চাহিদা ও জোগানের এই ভারসাম্যের অভাবের কারণে আমের দাম অনেক কমে গেছে। অন্যদিকে, উৎপাদন খরচ ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। এই পরিস্থিতি তৈরি করছে এ অঞ্চলের আমভিত্তিক অর্থনীতির হতাশাজনক ভবিষ্যৎ।
আমের বাজার এখনো মূলত দেশের ভেতরের ক্রেতাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। প্রতি বছর নানা প্রচারণামূলক উদ্যোগ নেওয়া হলেও রপ্তানির পরিমাণ খুবই সীমিত। এ ছাড়া এ অঞ্চলে কোনো আধুনিক হিমাগার বা আম সংরক্ষণ সুবিধা নেই।
আম উৎপাদনকারী অন্যান্য দেশের মতো এখানে জুস, পাল্প বা আচারের মতো পণ্য তৈরির শক্তিশালী প্রক্রিয়াকরণ শিল্প গড়ে ওঠেনি। এর ফলে অতিরিক্ত উৎপাদন প্রায়শই চাষিদের জন্য বড় ধরনের লোকসান নিয়ে আসে।
এক দশকের দ্রুত সম্প্রসারণ
আমের অর্থনীতি এ অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ মৌসুমি কর্মসংস্থানের উৎস। এটি বাগানের শ্রমিক, ঝুড়ি প্রস্তুতকারক, পরিবহন শ্রমিক, প্যাকেজিং কর্মী এবং পাইকারি বিক্রেতাদের জীবিকা নির্বাহে সাহায্য করে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য থেকে এই চাষ সম্প্রসারণের বিশাল পরিধি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
নওগাঁয় ২০১৫ সালে আম চাষের এলাকা ছিল ৬ হাজার ২৬৮ হেক্টর। এই চলতি মৌসুমে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩০ হাজার ৩১০ হেক্টরে। একই সময়ে রাজশাহীতে আম চাষের জমি ৮ হাজার ৯৮৬ হেক্টর থেকে বেড়ে ১৯ হাজার ৬২ হেক্টরে পৌঁছেছে।
দেশের প্রধান আমের রাজধানী হিসেবে পরিচিত চাঁপাইনবাবগঞ্জে ২০১৫ সালে ২৪ হাজার ২৬০ হেক্টর জমিতে আম চাষ হতো। প্রায় এক দশক পর বর্তমানে তা বেড়ে ৩৭ হাজার ৪৮৭ হেক্টরে দাঁড়িয়েছে। আম চাষ এখন নাটোর, রংপুর, গাইবান্ধা, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, পাবনা, সাতক্ষীরা এবং এমনকি শরীয়তপুরের পদ্মা অববাহিকাতেও ছড়িয়ে পড়েছে।
ক্রমবর্ধমান খরচ বনাম কমতে থাকা লাভ
চাষিরা জানান, একটি মাঝারি আকারের বাগান থেকে সাধারণত প্রতি বিঘায় ৪০ থেকে ৫০ মণ আম পাওয়া যায়।
তবে জমির ইজারা, সার, কীটনাশক, শ্রম এবং পরিবহনের খরচ অনেক বেড়ে গেছে। এর ফলে পাইকারি বাজারে (মোকাম) আম পৌঁছে দেওয়ার গড় খরচ এখন প্রতি কেজিতে ৩২ থেকে ৩৪ টাকা দাঁড়িয়েছে।
স্বভাবতই, প্রতি মণ আম দেড় হাজার টাকার কম দামে বিক্রি হলে চাষিদের লোকসান গুনতে হয়।
নওগাঁর সাপাহারে বর্তমানে হিমসাগর আম প্রতি মণ ৯০০ থেকে এক হাজার টাকা, নাগ ফজলি ১ হাজার ২০০ থেকে দেড় হাজার টাকা, গুটি আম ১ হাজার ২০০ টাকা, আম্রপালি ১ হাজার ৬০০ থেকে দুই হাজার টাকা এবং ল্যাংড়া আম এক হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
বদলগাছির আম চাষি এস এম মোস্তাকিম জানান, বর্তমান বাজার দরে খুব একটা লাভ হচ্ছে না। তবে তিনি আশা করছেন মৌসুমের শেষের দিকে আমের দাম কিছুটা বাড়তে পারে। সাপাহার উপজেলা আম আড়তদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ইমাম হোসেন জানান, উপকরণের উচ্চ মূল্য এবং পরিবহন খরচের কারণেই চাষিরা লাভ করতে পারছেন না।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাট বাজারে গুটি আম প্রতি মণ ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা, ল্যাংড়া ১ হাজার ৩০০ থেকে দুই হাজার টাকা এবং খিরসাপাত ১ হাজার ৩০০ থেকে আড়াই হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। শিবগঞ্জের আম চাষি মনিরুল ইসলাম আক্ষেপ করে বলেন যে বর্তমান বাজার মূল্য দিয়ে বাগানের পরিচর্যা খরচও উঠছে না।
কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) অধীনে আধুনিক প্রক্রিয়াকরণ ও বিপণন ব্যবস্থার উন্নয়নে জোর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
তিনি টাইমস অব বাংলাদেশ’কে বলেন, উৎপাদনের বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে যদি সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াকরণ এবং রপ্তানি ব্যবস্থার উন্নতি করা না হয়, তবে আমের এই বিপুল সম্ভাবনার পূর্ণ ব্যবহার করা সম্ভব হবে না।
‘ঢালন’ এবং অতিরিক্ত করের বোঝা
দেশের বৃহত্তম আমের পাইকারি বাজার কানসাটে প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ কোটি টাকার লেনদেন হয়। জেলার এই মৌসুমী অর্থনীতির আকার সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকারও বেশি বলে ধারণা করা হয়। তা সত্ত্বেও চাষিরা ‘ঢালন’ পদ্ধতির কারণে শোষণের শিকার হচ্ছেন। এই নিয়মের কারণে চাষিদের প্রতি মণে অতিরিক্ত ওজনের আম দিতে হয়।
চাককীর্তি গ্রামের আবদুর রাজ্জাক ব্যাখ্যা করে বলেন, সাধারণত ৪০ কেজিতে এক মণ হলেও ক্রেতারা এখন অতিরিক্ত ১০ থেকে ১৪ কেজি বেশি আম দাবি করেন।
মো. নজরুল ইসলাম জানান, সেচ ও কীটনাশকের পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয়ের পর এভাবে অতিরিক্ত ফল বিনামূল্যে দিতে বাধ্য হওয়ায় আম চাষ টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
কানসাটের আম বিক্রেতা রিয়াদ ইসলাম জানান, এক মণের ওজন ধীরে ধীরে ৪৩ কেজি থেকে বেড়ে এখন প্রায় ৫৪ কেজেতে পৌঁছেছে। অন্যদিকে, ব্যবসায়ী মেহেরুল ইসলাম বলেন, পাইকারি বিক্রেতারা সারা দেশে একটি অভিন্ন ওজন নীতি চালু হলে তাকে স্বাগত জানাবেন।
নানা রকমের করের কারণে চাষিদের আর্থিক বোঝাও বেড়ে গেছে। ব্যবসায়ী রায়হান আলী জানান, প্রায়ই তিনবার ‘খাজনা’ বা কর আদায় করা হয়। প্রথমবার যখন চাষি বিক্রি করেন, দ্বিতীয়বার আড়তে এবং তৃতীয়বার কুরিয়ার সার্ভিস ব্যবহার করার সময় এই কর দিতে হয়।
যদিও শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাজহারুল ইসলাম জানিয়েছেন, ঢালন পদ্ধতি সরকারিভাবে বাতিল করা হয়েছে। তবে চাষিদের অভিযোগ, এই ধরনের আদেশ মাঠ পর্যায়ে খুব কমই বাস্তবায়ন হয়।
রপ্তানিতে স্থবিরতা ও শিল্পায়নের প্রয়োজনীয়তা
২০১৬ সালে ৩০৯ টন আম রপ্তানির মাধ্যমে শুরু হয়েছিল আমের বৈদেশিক অর্থনীতি। তবে এরপর থেকে রপ্তানির চিত্রটি বেশ ওঠানামার মধ্যে রয়েছে। ২০২২-২৩ অর্থ বছরে রপ্তানি ৩ হাজর ১০০ টনে পৌঁছালেও পরের বছর তা কমে ১ হাজার ৩২১ টনে নেমে আসে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে চীনে ৫ হাজার টন আম পাঠানোর লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও মাত্র ২ হাজর ১৯৪ টন আম রপ্তানি করা সম্ভব হয়েছে।
নওগাঁর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক হুমায়রা মণ্ডল জানান, ফ্রুট ব্যাগিং পদ্ধতি দিন দিন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। কারণ, এটি আমকে রপ্তানির জন্য আরও উপযোগী করে তোলে এবং এর ফলে ভালো দাম পাওয়া যায়।
পাকুড়িয়ার শফিকুল ইসলাম ছানা বলেন, কেবল আধুনিক প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র স্থাপন এবং রপ্তানি বৃদ্ধির মাধ্যমেই এই খাতকে সত্যিকার অর্থে লাভজনক করা সম্ভব।
নওগাঁ এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ উভয় জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা একমত যে, চাষিদের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে প্রক্রিয়াকরণ শিল্প এবং নতুন আন্তর্জাতিক বাজার তৈরি করা জরুরি।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্ভিদ সংগনিরোধ উইংয়ের রপ্তানি উপ-শাখার কর্মকর্তা মফিদুল ইসলাম বলেন, আশা করা হচ্ছে এ বছর মালয়েশিয়ার বাজারে বাংলাদেশের আম রপ্তানির একটি সুযোগ তৈরি হবে।
তিনি আরও বলেন, মালয়েশিয়ার একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফর করেছে। তারা আম উৎপাদন ও রপ্তানি প্রক্রিয়া পরিদর্শন করেছে এবং এই বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে।
রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্পের পরিচালক আরিফুল ইসলাম অবশ্য যোগ করেন, আম রপ্তানির ক্ষেত্রে বেশ কিছু বড় বাধা রয়েছে। এর মধ্যে বিমান পরিবহনের উচ্চ খরচ এবং পর্যাপ্ত কার্গো স্পেস বা বিমানের মালপত্রের জায়গার অভাব অন্যতম।
প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন রাজশাহীর আব্দুল আউয়াল।


