বাঙালি চিত্রগ্রাহক ও ভারতবর্ষের প্রথম চলচ্চিত্র নির্মাতাদের অন্যতম হীরালাল সেন থেকে হিসাব করলে শতবর্ষ পার করেছে বাংলা চলচ্চিত্র। তবে ঢাকাই সিনেমার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ১৯৫৬ সালে। অর্থাৎ যাকে এখন আমরা ঢালিউড ইন্ডাস্ট্রি বলছি তার বয়সও প্রায় ৭০ বছর।
এ দীর্ঘ সময়েও এই ইন্ডাস্ট্রি বিশ্ব চলচ্চিত্রে আলাদা পরিচয় তৈরি করতে পারেনি। এমনকি আমাদের সিনে ইন্ডাস্ট্রি এখনও ঢাকাকেন্দ্রিক। অথচ পৃথিবীর বড় বড় ইন্ডাস্ট্রিগুলোর পাশাপাশি একই দেশে অনেকগুলো ছোট-বড় ইন্ডাস্ট্রি গড়ে উঠেছে। ভারতে শুধু বলিউড নয় তামিল-তেলেগু কিংবা কন্নড়, বাংলা ছবির আলাদা জগৎ তৈরি হয়েছে। দেশটিতে ১২টির বেশি ইন্ডাস্ট্রি থেকে প্রতি বছর ২০টির বেশি ভাষায় সিনেমা নির্মিত হয়।
তবে সম্প্রতি কিছু তরুণ নির্মাতা এই ঢাকাকেন্দ্রিকতাকে ভাঙার চেষ্টা করছেন। তারা পুরো সিনে ইন্ডাস্ট্রিকে বিকেন্দ্রিকরণ করতে চাইছেন। চেষ্টা করছেন শুধু শহুরে গল্প নয়, স্থানীয় গল্পও তুলে ধরতে। এক্ষেত্রে বলতে হয় মোহাম্মদ তাওকীর ইসলাম, কৌতুহলসহ বেশ কয়েকজন নবীন নির্মাতার কথা।
তাওকীর ওটিটির জন্য বানিয়েছিলেন ‘শাটিকাপ’ ও ‘সিনপাট’-এর মত আলোচিত ও জনপ্রিয় দুটি সিরিজ। যেখানে তিনি রাজশাহীর গল্প বলেছিলেন। যেটির শ্যুটিং কিংবা গল্পের ভাষা শুধু রাজশাহীর ছিলো না, শিল্পী-কলাকুশলীদের অধিকাংশ ছিলেন রাজশাহীর। এদুটিকে বলা যায় পুরোপুরি ‘লোকাল প্রোডাকশন’। তিনি এবার পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা নির্মাণ করছেন, নাম ‘দেলুপি’। যেটি নির্মিত হচ্ছে খুলনার পাইকগাছা উপজেলার দেলুটি ইউনিয়নের মানুষের গল্পে। যেখানেও শিল্পী থেকে শুরু করে অধিকাংশ কলাকুশলীরাই থাকবেন স্থানীয় পর্যায়ের।
সুকর্ন সাহেদ ধীমান কদিন আগে চরকির জন্য বানিয়েছিলেন ‘ফেউ’। যেটি সুন্দরবন অঞ্চলের একটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত হয়েছিল। সাজ্জাদ খান বাগেরহাটের গল্পে ও ভাষায় নির্মাণ করেছিলেন ‘সাহস’। রংপুরের গল্পে ও ভাষায় খন্দকার সুমন নির্মাণ করেছিলেন ‘সাঁতাও’। সম্প্রতি কৌতুহল নামের এক নির্মাতা নির্মাণ করেছেন ‘দুঃসাহস’। যেটিতেও উঠে আসছে বাগেরহাটের গল্প।
পাহাড় থেকে সমতলের সকল মানুষের গল্প বলার জন্য সিনেমার এ বিকেন্দ্রীকরণ জরুরি বলে মনে করেন অভিনেতা মোস্তাফিজুর নূর ইমরান। টাইম অব বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘এককেন্দ্রিক হওয়ায় আমরা শুধু একই টাইপের গল্প বারবার দেখতে পাচ্ছি। অথচ আমাদের প্রত্যেকেরই অনেক গল্প বলার আছে।’
‘আমাদের বৈচিত্রময় সংস্কৃতির বৈচিত্রময় গল্পগুলোকে যদি আমি ঢাকায় তৈরি করতে যাই, সেটা না হবে অথেন্টিক, না হবে মানসম্পন্ন। বিকেন্দ্রীকরণ প্রক্রিয়ার ভেতরে আমাদের ফেলো ফিল্ম মেকাররা আছেন, সেটা ইঙ্গিত করে ঢাকার যে উপাদানগুলো আছে—রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সেগুলো যদি সারাদেশে ছড়িয়ে দেওয়া যায় তাহলে সবকিছু সত্যিকার অর্থে ভালোর দিকে যাবে,’— বলেন ‘সাঁতাও’ নির্মাতা খন্দকার সুমন।
‘দেলুপি’ নির্মাতা তাওকীর টাইমস অব বাংলাদেশের সঙ্গে আলাপচারিতায় পুরো বিষয়টিকে ‘বিকেন্দ্রীকরণ’ বলতে নারাজ। তিনি বলেন, ‘এটাকে আমি বিকেন্দ্রিকরণ বলব না। এখন সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি হচ্ছে পুরো পৃথিবীজুড়ে। টেকনোলজি এমন জায়গায় গেছে আপনি যেকোনো জায়গা থেকেই সিনেমাটা বানিয়ে ফেলতে পারবেন। এই যে অপার সম্ভাবনা, এটাকেই আমরা কাজে লাগাচ্ছি। এ স্বাধীনতাটা আমরা উপভোগ করছি।’
পুরো বিষয়টি বিশ্ব দরবারে আমাদের সিনেমার আলাদা পরিচয় তৈরিতে সহায়তা করছে বলে মনে করেন চলচ্চিত্রের শিক্ষক ও নির্মাতা আরিফুর রহমান। তিনি টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমাদের দেশের নানা রুচির দর্শক আছে। এ সিনেমাগুলো নতুন দর্শক তৈরি করছে। আগামী ১০-১৫ বছরে যখন এ সিনেমার নির্মাতারা দাঁড়িয়ে যাবে তখন আমাদের দেশে কোনো সিনেমাতেই সিনেমা হল দর্শকশূন্য হবে না।’
‘এ সিনেমাগুলোতে যেহেতু স্থানীয় গল্প বলা হচ্ছে, তাই ওই অঞ্চলের মানুষ খুব সহজেই কানেক্ট করতে পারছেন। আর আমরা যখন স্থানীয় গল্প বলতে পারব, তখনই আমাদের সিনেমা বিশ্ব সিনেমায় স্থান করে নিতে পারবে,’—বলেন আরিফুর রহমান।


