বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক কালজয়ী নাম ‘তিতাস একটি নদীর নাম’। মুক্তির পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও ছবিটি আজও চলচ্চিত্রপ্রেমীদের মধ্যে সমান আগ্রহ নিয়ে আলোচিত হয়। এই ছবির নেপথ্যে ছিলেন এক তরুণ স্বপ্নবাজ প্রযোজক—হাবিবুর রহমান খান। ছবি বানানোর সময় তার বয়স ছিল মাত্র ২৭ বছর; আজ তিনি ৮২ বছরের অভিজ্ঞ এক ব্যক্তিত্ব। ১৯৭২ সালের ১৬ জুলাই শুরু হয়েছিল এই কালজয়ী চলচ্চিত্রের শুটিং। সেই দিনের স্মৃতি হাতড়ে হাবিবুর রহমান খান শোনালেন এক তরুণের জেদ, ভালোবাসা আর দুঃসাহসিকতার গল্প, যা শেষ পর্যন্ত বিশ্বচলচ্চিত্রের ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছে।
ঋত্বিক ঘটকের একটি চলচ্চিত্র প্রযোজনা করার স্বপ্নটি হাবিবুর রহমান খানের অনেক পুরনো। ১৯৬৩-৬৪ সালে স্কুল-কলেজে পড়ার সময় থেকেই তিনি ঋত্বিক ঘটকের প্রবল ভক্ত ছিলেন। ঋত্বিক ঘটক দেশভাগ কখনো মেনে নিতে পারেননি—এই আদর্শিক অবস্থান তরুণ হাবিবুর রহমান খানকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। সেই সময় তিনি ‘নিউক্লিয়াস’ নামের একটি গোপন সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন, বাংলাদেশ একদিন স্বাধীন হবেই। বন্ধুদের আড্ডায় তিনি বলতেন, দেশ স্বাধীন হলে ঋত্বিক ঘটককে এনে বাংলাদেশে ছবি বানাবেন। বন্ধুরা তখন এই কথা শুনে তাকে ঠাট্টা করে ‘পাগল’ বলে ডাকত।

মুক্তিযুদ্ধ শেষে দেশে ফিরেই হাবিবুর রহমান খান ঋত্বিক ঘটকের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ খুঁজতে থাকেন। যোগাযোগ হয় ১৯৭২ সালের মার্চ কিংবা এপ্রিলে, একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী সাংস্কৃতিক সংস্থার আয়োজনে এক অনুষ্ঠানকে ঘিরে। সেই অনুষ্ঠানে কোষাধ্যক্ষের দায়িত্বে ছিলেন হাবিবুর রহমান খান নিজে, আর অতিথি হিসেবে ঢাকায় এসেছিলেন সত্যজিৎ রায়। তার সঙ্গে আসা বরুণ বকসী নামের এক ব্যক্তি হাবিবুর রহমান খানকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, সত্যজিৎ রায়কে নিয়ে ছবি করার ইচ্ছা আছে কি না। জবাবে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ছবি করার ইচ্ছা আছে ঠিকই, তবে সত্যজিৎ রায় নন—ঋত্বিক ঘটককে পেলেই তিনি ছবি বানাবেন।
কিছুদিন পরই কলকাতা থেকে ফোন আসে, ঋত্বিক ঘটকের সঙ্গে দেখা করার আমন্ত্রণ নিয়ে। এয়ার ইন্ডিয়ার বিমানে মাত্র ১২০ টাকার টিকিট কেটে হাবিবুর রহমান খান ছুটে যান কলকাতায়। পার্ক সার্কাসের বেনিয়াপুকুর লেনের এক বাড়িতে প্রথম দেখা হয় দুজনের। তখন ঋত্বিক ঘটক কিছুটা অসুস্থ ছিলেন এবং সেখানেই তার চিকিৎসা চলছিল। কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো, সেই প্রথম সাক্ষাতের আগ পর্যন্ত হাবিবুর রহমান খান ঋত্বিক ঘটকের কোনো চলচ্চিত্রই দেখেননি।
পরদিন কলকাতার জ্যোতি সিনেমা হলের মিনিয়েচার প্রেক্ষাগৃহে ঋত্বিক ঘটকের সঙ্গে ‘সুবর্ণরেখা’ দেখেন হাবিবুর রহমান খান। ছবিটি দেখে তিনি এতটাই অভিভূত হন যে হল থেকে বেরিয়ে সশ্রদ্ধ প্রণাম জানান ঋত্বিক ঘটককে। ঠিক তখনই ঋত্বিক ঘটক জানিয়ে দেন, তিনি ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ বানাবেন। অদ্বৈত মল্লবর্মণের এই উপন্যাসের কপিরাইট তখন ছিল একটি ট্রাস্টি বোর্ডের হাতে, যেখানে সত্যজিৎ রায়ও যুক্ত ছিলেন। সত্যজিৎ রায় নিজেও মত দিয়েছিলেন, ঋত্বিক ঘটক তিতাস নিয়ে ছবি করলে তা ভালো হবে। মাত্র পাঁচ হাজার টাকায় উপন্যাসের চলচ্চিত্রস্বত্ব কিনে নেন হাবিবুর রহমান খান।
১৯৭২ সালের মে মাসে ঢাকায় আসেন ঋত্বিক ঘটক। প্রযোজক হাবিবুর রহমান খান বিভিন্ন চরিত্রের জন্য সম্ভাব্য অভিনয়শিল্পীদের তার সামনে উপস্থিত করেন, আর ঋত্বিক ঘটক নিজে দেখেশুনে তাদের চূড়ান্ত করেন। এভাবেই ছবিতে জায়গা করে নেন কবরী, রোজী সামাদ, প্রবীর মিত্র, গোলাম মুস্তাফা, রওশন জামিল ও আবুল হায়াতের মতো শিল্পীরা। ছবিতে আরও অভিনয় করেন রানী সরকার ও সুফিয়া রুস্তম। চিত্রগ্রহণে ছিলেন বেবি ইসলাম, আর সম্পাদনার দায়িত্বে ছিলেন বশীর হোসেন।

১৯৭২ সালের ১৬ জুলাই শুরু হয় ‘তিতাস একটি নদীর নাম’-এর শুটিং। ছবিটির প্রামাণ্য আবহ ধরে রাখতে গ্রীষ্ম ও বর্ষা—দুই ঋতুর প্রকৃত রূপকেই ব্যবহার করা হয়েছিল, ফলে শুটিং শেষ করতে সময় লাগে প্রায় আট থেকে নয় মাস। প্রথম দিনের শুটিং হয় সাভারের বংশী নদীর তীরে, যেখানে অংশ নেন কবরী ও রোজী সামাদ। এরপর পুরো ইউনিট লঞ্চে করে রওনা দেয় তিতাস নদী এলাকার উদ্দেশে। তিতাসের গৌকর্ণঘাটে সেট বানিয়ে চলে মূল শুটিং। এ ছাড়া শুটিং হয় ঢাকার এফডিসি, আরিচাঘাট ও বোদার বাজারসহ আরও কয়েকটি জায়গায়।
শুটিং চলাকালে ঋত্বিক ঘটক পুরোপুরি সুস্থ ছিলেন না, যদিও তখন তিনি গুরুতর অসুস্থও ছিলেন না। কাজ প্রায় শেষ হয়ে আসার সময় তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন, আর তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বিশেষ হেলিকপ্টার পাঠিয়ে তাকে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যান। ছবির সম্পাদনা নিয়ে প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা প্রসঙ্গে হাবিবুর রহমান খান স্পষ্ট করে জানান, ছবির সিংহভাগ সম্পাদনা ঋত্বিক ঘটক নিজেই সম্পন্ন করেছিলেন। সুস্থ হয়ে ঢাকায় ফিরে তিনি সামান্য কিছু পরিবর্তন করেন মাত্র।
দীর্ঘ নির্মাণপর্ব শেষে ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ মুক্তি পায় ১৯৭৩ সালের ২৭ জুলাই। ঢাকার চারটি ও চট্টগ্রামের দুটিসহ মোট ছয়টি প্রেক্ষাগৃহে প্রথম প্রদর্শনী শুরু হয়। কিন্তু পরের সপ্তাহেই হল থেকে নামতে শুরু করে ছবিটি—বাণিজ্যিকভাবে তা দর্শকপ্রিয়তা পায়নি। ভারতে, বিশেষত কলকাতায় ছবিটি মুক্তি পায় আরও অনেক পরে, ১৯৯১ সালের ১১ মে।
ছবিটি তৈরির সময় নির্দিষ্ট কোনো বাজেট ঠিক করা হয়নি; সব খরচের হিসাব করা হয় নির্মাণ শেষ হওয়ার পর। মোট ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় আট লাখ চব্বিশ–পঁচিশ হাজার টাকা। সেই সময়ের হিসাবে এটি ছিল বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগ—তখন ঢাকার গুলশানে এক বিঘা জমি পাওয়া যেত মাত্র চল্লিশ হাজার টাকায়, আর বাংলাদেশে একটি সাধারণ ছবি তৈরি হতো এক থেকে সোয়া লাখ টাকায়। হাবিবুর রহমান খান এই অর্থের সংস্থান করেছিলেন তার বাবার কাছ থেকে, যদিও বাবার পূর্ণ সমর্থন সেভাবে ছিল না। তরুণ বয়সের জেদ আর চলচ্চিত্রের প্রতি নিখাদ ভালোবাসা থেকেই তিনি এই ঝুঁকি নেন। তবে মায়ের পূর্ণ সমর্থন ছিল তার পাশে, আর স্ত্রীরও সমর্থন ছাড়া উপায় ছিল না বলে তিনি হাসতে হাসতে স্মরণ করেন। হল থেকে দ্রুত নেমে যাওয়ায় বিনিয়োগের টাকা ফেরত আসেনি; ছবিটি রাশিয়াসহ কয়েকটি আন্তর্জাতিক উৎসবে আমন্ত্রণ পেলেও তাৎক্ষণিকভাবে বড় কোনো সাফল্য মেলেনি। কিন্তু হাবিবুর রহমান খানের ভাষায়, টাকার জন্য নয়—ঋত্বিক ঘটককে ভালোবেসেই তিনি ছবিটি বানিয়েছিলেন।

মুক্তির পর ঋত্বিক ঘটক নিজেই বলেছিলেন, তারা এমন একটি ছবি বানিয়েছেন যা সময়ের চেয়ে ২০ বছর এগিয়ে। আজ সেই কথাই প্রমাণিত সত্য। ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউটের এক জরিপেও ছবিটি বিশ্বসেরা চলচ্চিত্রের তালিকায় স্থান পেয়েছে। ২০১০ সালে বিশ্ববিখ্যাত পরিচালক মার্টিন স্করসেসির প্রতিষ্ঠিত ‘ওয়ার্ল্ড সিনেমা ফাউন্ডেশন’-এর উদ্যোগে ছবিটি নতুন করে পুনরুদ্ধার করা হয়। ইতালির চিনেতেকা দি বোলোনিয়া ও লিম্মাজিনে রিত্রোভাতা ল্যাবরেটরিতে এই পুনরুদ্ধারকাজ সম্পন্ন হয় ঋত্বিক মেমোরিয়াল ট্রাস্ট ও ভারতের ন্যাশনাল ফিল্ম আর্কাইভের সহযোগিতায়। পুনরুদ্ধারের পর একই বছর ছবিটি প্রদর্শিত হয় কান চলচ্চিত্র উৎসবের মর্যাদাপূর্ণ ‘কান ক্লাসিকস’ বিভাগে। এই স্বীকৃতি প্রযোজক হিসেবে হাবিবুর রহমান খানকে গর্বিত করে; তার কাছে এর চেয়ে বড় পুরস্কার আর কিছু হতে পারে না।
আজকের চলচ্চিত্র শিল্প নিয়ে হাবিবুর রহমান খান মনে করেন, এখন বিশ্বজুড়েই সিনেমার সংকট চলছে। তবে প্রযুক্তির পরিবর্তনের কারণে ওটিটি প্ল্যাটফর্ম ও টেলিভিশনের মাধ্যমে সিনেমা প্রেক্ষাগৃহের বাইরেও দর্শকের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে, যা তার কাছে ইতিবাচক দিক। তরুণ নির্মাতাদের উদ্দেশে তার পরামর্শ—সিনেমা নির্মাণকে আগে ‘নেশা’ বা ভালোবাসা হিসেবে নিতে হবে, তবেই তাতে প্রকৃত সাফল্য আসবে।
দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে চলচ্চিত্র শিল্পের সঙ্গে যুক্ত থাকা এই গুণী মানুষটি বর্তমানে ঢাকার গুলশানে অবসর জীবন কাটাচ্ছেন। কিন্তু ‘তিতাস’ নির্মাণের সেই দিনগুলোর স্মৃতি আজও তার মনে সমান উজ্জ্বল। ১৯৭২ সালের ১৬ জুলাই শুরু হওয়া যে যাত্রা একদিন ‘পাগলামি’ বলে উপহাসের পাত্র হয়েছিল, আজ তা-ই বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম গৌরবগাথা হয়ে বেঁচে আছে বিশ্বচলচ্চিত্রের ইতিহাসে।


