বরফ সিন্ডিকেট: দুইশ টাকার বরফ ৬০০ টাকায় বিক্রি

বরফ সিন্ডিকেট: দুইশ টাকার বরফ ৬০০ টাকায় বিক্রি
ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

ইলিশের ভরা মৌসুমে চরম বিদ্যুৎ বিভ্রাটে পড়েছে দেশের ২য় সর্ববৃহৎ মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র বরগুনার পাথরঘাটার বিএফডিসি ঘাটের মৎস্যজীবীরা। তীব্র লোডশেডিংয়ে বরফ উৎপাদন ব্যহত হবার কারণে ইলিশ মৌসুমের শেষের দিকে মাছ সংরক্ষণ করতে পারছে না আড়ৎদার-পাইকাররা। এই সুযোগে মিল মালিকরা ২০০ টাকার বরফ বিক্রি করছেন ৬০০ টাকায়।

মৎস্যজীবীদের অভিযোগ, একদিকে নিম্নমানের বরফ অন্যদিকে তিনগুণ বেশি দামে সিন্ডিকেট করে বরফ বিক্রি করছে বরফ মিল মালিকরা।

তবে, মিল মালিকরা বলছেন, লোডশেডিংয়ের কারণে বরফ উৎপাদন ব্যহত হবার কারণে নিম্নমানের বরফ উৎপাদন করতে হচ্ছে, আর ভালো মানের বরফ উৎপাদনে খরচ বেশি তাই দামটাও বেশি।

দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মৎস্য অবতরন কেন্দ্র বরগুনার পাথরঘাটা। এ ঘাটকে কেন্দ্র করে ব্যবসার জন্য এখানে আসেন দেশের অন্তত ১৩টি জেলার মৎস্যজীবীরা। তাদের বরফের চাহিদা মেটাতে মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের চারপাশে গড়ে ওঠেছে ২২টি বরফ মিল। তবে, সম্প্রতি লোডশেডিংয়ের কারণে বেশিরভাগ বরফ মিল থেকে নিম্নমানের বরফ বিক্রির অভিযোগ জেলে ও মৎস্যজীবীদের।

এফ বি নাজমা এন্ড কোং ম্যানেজার মোহাম্মদ ভুট্টা অভিযোগ করে বলেন, ৪টি ট্রলারে বরফ নিয়ে সাগরে পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু বরফ দিয়েছে নিম্নমানের বরফ। ইলিশ মৌসুমের শেষ মুহূর্তে এসে অল্প কিছু ইলিশ উঠেছিল জালে। কিন্তু মাছ নিয়ে মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে আসতে আসতে বরফ গলে পানি হয়ে গেছে। পরে নামমাত্র মূল্যে মাছ বিক্রি করে দিয়েছি। চারটি ট্রলার সাগরে পাঠাতে যা খরচ হয়েছে তার অর্ধেকও উঠেনি।

তিনি আরও বলেন, ভালো মানের বরফ কিনতে গিয়ে দেখি ৬০০ টাকা বিক্রি হচ্ছে এক ক্যান বরফ। অথচ এই বরফের দাম ছিল সর্বোচ্চ ২০০ টাকা।

চাহিদা অনুযায়ী বরফ না পেয়ে মিলের আশেপাশের খাল ও নদীতে নোঙর করে আছে শত শত সমুদ্রগামী মাছ ধরা ট্রলার। জেলেরা বলছেন, বরফ সংকটে মিলের সাথে সাথে থমকে গেছে জেলে জীবনের চাকা।

এফ বি এন জাহান ট্রলারের জেলেরা জানান, গতকাল জ্বালানি রসদ নিয়ে বরফের জন্য মিলে যাচ্ছি। নিম্নমানের বরফের ক্যান ২৫০-৩০০ টাকায় বিক্রি করে কিন্তু ভালো মানের বরফ ৬০০টাকার নিচে কোনো মিল মালিকরা বিক্রি করতে রাজি নয়।

আরও পড়ুন

বিভিন্ন বরফ মিলে জেলেদের সাথে কথা বললে তারা অভিযোগ করে বলেন, লোডশেডিংয়ের অযুহাতে বরফ মিল মালিকরা সিন্ডিকেট করে তিনগুণ বেশি দামে বরফ বিক্রি করছে।

এদিকে আড়ৎদার পাইকাররা বলছেন, বরফ সংকটে ঢাকাসহ দেশের অন্তত ১০ জেলায় মাছ সরবরাহ বন্ধ হয়ে আছে।

মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের আড়ৎদার আরিয়ান ফিশিং কোম্পানির ম্যানেজার কামাল হোসেন বলেন, বরফ সংকটে নষ্ট হচ্ছে ইলিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। নিম্নমানের বরফ দিয়ে মাছ সংরক্ষণ করলে মাছের গুণগত মান নষ্ট হয়ে যায়। এতে ভোক্তাদের সাথেও প্রতারণা করা হয়। যার প্রভাব পড়বে ভবিষ্যৎ ব্যবসার ক্ষেত্রে। কিন্তু ভালো মানের বরফ বিক্রি হচ্ছে তিনগুণ দামে। আর এই দামের প্রভাব পড়ছে বাজারে।

মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের পাইকার শামিম রহমান আবির বলেন, ‘গত সপ্তাহে এক কেজির ইলিশের মণ বিক্রি করেছি এক লাখ ২০ হাজার টাকা। বরফ সংকটে এখন সেই ইলিশ বিক্রি করতে হচ্ছে ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা। অন্যদিকে ৬০০ টাকা ক্যানের বরফ কিনে কিছু মাছ বিক্রি করেছি তার দাম পড়েছে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা দরে।’

জেলার মধ্যে সব থেকে বেশি লোডশেডিং দেয়া হয় পাথরঘাটা উপজেলায়। অথচ এই উপজেলার প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ মৎস্য পেশায় জড়িত।

বরফ মিল মালিকরা জানায়, এক ক্যান ভালো মানের বরফ উৎপাদন করতে ১৬ থেকে ১৭ ঘন্টা মিল চালু রাখতে হয়। মিল মালিকরা বলছেন, ২৪ ঘন্টায় একটানা সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয় ২ থেকে ৩ ঘন্টা। যার কারণে ব্যহত হচ্ছে বরফ উৎপাদন। তাই বেশিরভাগ বরফ উৎপাদন হচ্ছে নিম্নমানের।

মাসুম আইস ফ্যাক্টরির ম্যানেজার হাসনাত বলেন, অতিরিক্ত মূল্যে বরফ বিক্রি করছি না। বিদ্যুৎ থাকে না বললেই চলে। তাই দাম কিছুটা বেশি।

খান বরফ মিলের মালিক মহিউদ্দিন খান বলেন, দিনে ৩/৪ ঘন্টা বিদ্যুৎ পাচ্ছি। তাই এক ক্যান বরফ উৎপাদন করতে খরচ হচ্ছে অনেক বেশি। আমরা বাধ্য হয়ে কিছুটা বেশি দামে বিক্রি করছি। বেশি দামে বিক্রি মানেই বেশি ব্যবসা নয়। খরচ বেশি, তাই দাম বেশি।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ মৎস্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী বলেন, বরফকল মালিকদের সিন্ডিকেটের কারণে ২০০ টাকার বরফ ৬০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। এতে ট্রলার মালিক ও জেলেরা ধ্বংসের মুখে পড়ছেন। অনেকে ট্রলার ব্যবসা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। প্রতি বছর ইলিশ মৌসুমের শেষের দিকে এমন সিন্ডিকেট করে মিল মালিকরা।

পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির পাথরঘাটা জোনাল অফিসের ডিজিএম আরিফ শাহরিয়ার ফাহাদ বলেন, ‘পাথরঘাটায় প্রতিদিন বিদ্যুৎ এর ১৪ মেগাওয়াট চাহিদার অনুকূলে সবোর্চ্চ বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয় সাড়ে ৫ মেগাওয়াট। তাই লোডশেডিং দিতে বাধ্য হচ্ছি।’

তবে, বরগুনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ জিয়া উদ্দিন বলেন, অতিরিক্ত দামে বরফ বিক্রির অভিযোগ পেয়েছি। বরফ মিল গুলো যাতে চড়া দামে বরফ বিক্রি করতে না পারে সে ব্যাপারে পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, ইলিশের গুরুত্ব বিবেচনায় পাথরঘাটা উপজেলাকে জরুরি বিদ্যুৎ এর তালিকায় নিয়ে আসার জন্য বিদ্যুৎ বিভাগকে চিঠি দিয়েছেন তিনি।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad