বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা সুসংহত করতে অন্তত ৯০ দিনের জ্বালানি তেল মজুত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছেন, সরকার বর্তমানে জ্বালানি তেলের মজুত বাড়ানোর পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো ও সক্ষমতা যাচাই করে দেখছে।
টাইমস অব বাংলাদেশকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকারের পরিকল্পনা হলো ধাপে ধাপে অন্তত ৯০ দিনের জ্বালানি মজুত নিশ্চিত করা। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকারি স্থাপনাগুলো চিহ্নিত করার পাশাপাশি বেসরকারি খাতের স্টোরেজ বা মজুত ক্ষমতা ব্যবহারের বিষয়টিও সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে যে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, তা উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে পৃথিবী এক নতুন স্বাভাবিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে যেখানে যেকোনো সময় জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হতে পারে। বাংলাদেশ যেন কোনো ধরনের জ্বালানি সংকটে না পড়ে, সেজন্য আগে থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ভাসমান মজুতসহ প্রায় ৩০ থেকে ৪৫ দিনের জ্বালানি তেলের ধারণক্ষমতা রয়েছে। বর্তমানে বিপিসির মোট ব্যবহারযোগ্য মজুত ক্ষমতা ১৩ দশমিক ২৫ লাখ মেট্রিক টন, যার মধ্যে ডিজেলের পরিমাণ ৬ দশমিক শূন্য পাঁচ লাখ মেট্রিক টন।
সরকারের এই উদ্যোগের বিষয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম. তামিম বলেন, বিশ্বের খুব কম দেশেই ৯০ দিনের কৌশলগত মজুত ব্যবস্থা রয়েছে। বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করা ছাড়া এত বিশাল মজুত গড়ে তোলা সম্ভব নয়। এজন্য সুনির্দিষ্ট অবকাঠামো, আর্থিক বিনিয়োগ এবং একটি সুনির্দিষ্ট সময়সীমা উল্লেখ করে স্বচ্ছ পরিকল্পনা প্রয়োজন।
এনার্জিপ্যাকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হুমায়ুন রশীদ মনে করেন, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত জ্বালানির জন্য ৯০ দিনের মজুত জরুরি না হলেও আমদানিকৃত জ্বালানির জন্য শক্তিশালী মজুত ব্যবস্থা গড়ে তোলা অপরিহার্য।
তিনি জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিপিসি চার লাখ ১৫ হাজার ৬৫৩ টন অকটেন এবং চার লাখ ৬২ হাজার ৪৭৫ টন পেট্রোল বিক্রি করেছে। এর মধ্যে পুরো পেট্রোল এবং প্রায় অর্ধেক অকটেন স্থানীয় রিফাইনারি থেকে সরবরাহ করা হয়েছে, যা মূলত গ্যাসক্ষেত্রের কনডেনসেট থেকে উৎপাদিত হয়।
হুমায়ুন রশীদ আরও জানান, এক দশক আগে স্থানীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে রিফাইনারিগুলোর প্রয়োজনীয় শতভাগ কনডেনসেট পাওয়া যেত। এখন সেটি ৬০ শতাংশে নেমে এসেছে। ফলে এখন রিফাইনারিগুলোকেও কনডেনসেট আমদানি করতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, মজুদ ও ফটকা কেনাবেচা নিয়ন্ত্রণ করা গেলে অকটেন ও পেট্রোলের জন্য বর্তমানে থাকা দুই থেকে চার সপ্তাহের মজুতই যথেষ্ট। তবে ডিজেলের জন্য বড় মজুত গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
তিনি সরকারকে অব্যবহৃত স্টোরেজগুলো জরুরি মজুতের জন্য ব্যবহার করার এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার স্বার্থে বেসরকারি বিনিয়োগ সহজতর করার পরামর্শ দেন।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর ৬৮ লাখ টনের বেশি পেট্রোলিয়াম পণ্য ব্যবহৃত হয়। যার মধ্যে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পাঁচ লাখ ৪৭ হাজার ৮০৪ টন জেট ফুয়েল এবং ৪৩ লাখ ৫০ হাজার ৭৫ টন ডিজেল ছিল।
এই বিশাল চাহিদার বিপরীতে মজুত ক্ষমতা বাড়ানো প্রসঙ্গে ইয়ুথ গ্রুপের কোম্পানি সচিব ইয়াসিন আহমেদ বলেন, বেসরকারি খাতে প্রায় এক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের মাধ্যমে আগামী ৭ থেকে ৯ মাসের মধ্যে আরও ২০ লাখ টন মজুত ক্ষমতা যোগ করা সম্ভব। এই বিনিয়োগ নিশ্চিত হলে এমনকি অকটেন এবং পেট্রোলের মজুতও ৯০ দিন পর্যন্ত বাড়ানো যাবে।
বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করে সিকম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আমিরুল হক জানান, নীতিগত সহায়তা এবং মুনাফার নিশ্চয়তা পেলে তার প্রতিষ্ঠান দুই লাখ টন ধারণক্ষমতার জ্বালানি তেল মজুত সুবিধা তৈরিতে বিনিয়োগ করতে প্রস্তুত।
আবার সুপার পেট্রোকেমিক্যালসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মোস্তফা হায়দার মনে করেন, দক্ষতা বাড়াতে পেট্রোলিয়াম খাতে সরকারের বড় আকারের বেসরকারি বিনিয়োগ বিবেচনা করা উচিত। তবে বিনিয়োগের বিপরীতে ভালো মুনাফা পেতে হলে কোম্পানিগুলোকে আমদানি, শোধন, মজুত এবং খুচরা পর্যায়ে বিক্রির সুযোগ দিতে হবে।
ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে. চৌধুরী বলেন, মূলত অবকাঠামোর সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে মজুতের হিসাব করা উচিত। এক্ষেত্রে পরিবহনাধীন থাকা বা ডিপো ও ফিলিং স্টেশনে থাকা তেলের ওপর ভিত্তি করে হিসাব করা উচিত নয়।
তিনি দীর্ঘদিন ধরে পেট্রোল ও ডিজেল আমদানি ও বিতরণে বেসরকারি খাতকে সুযোগ দেওয়ার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়ে আসছেন। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, যেহেতু জ্বালানি পণ্য অত্যন্ত সংবেদনশীল, তাই শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, আর্থিক শক্তি এবং নিরাপত্তা বজায় রাখার সক্ষমতা আছে এমন যোগ্য কোম্পানিগুলোকেই এই সুযোগ দেওয়া উচিত।
এলপিজি খাতের মতো এখানেও যত্রতত্র সক্ষমতা বাড়ানো ঠিক হবে না উল্লেখ করে আজম জে চৌধুরী বলেন, বেসরকারি খাতে বর্তমানে বার্ষিক চাহিদার তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ অর্থাৎ ৩০ লাখ টন এলপিজি মজুত করার সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। তাই একটি সুশৃঙ্খল নীতিমালা ও সুশাসনের আওতায় সরকারি খাতের পাশাপাশি বেসরকারি সক্ষমতা গড়ে তোলা জরুরি।


