নদী ও খালবেষ্টিত পিরোজপুরে গরমের প্রকোপ বাড়ার আগেই পৌর এলাকায় সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। পানির অভাবে অতিষ্ঠ হয়ে অনেক ভাড়াটিয়া ইতোমধ্যে এলাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছেন।
নদী ও ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের পুকুর শুকিয়ে যাওয়ায় পৌরসভার একমাত্র পানি শোধনাগারটি এখন অচলপ্রায়। এর ফলে পৌরসভার প্রায় দুই লক্ষ মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। নিয়ম অনুযায়ী দিনে দুই বেলা দুই ঘণ্টা করে পানি সরবরাহের কথা থাকলেও এখন এক ঘণ্টাও পানি মিলছে না। কখনো কখনো এক দিন অন্তর পানি সরবরাহ করা হচ্ছে যার ফলে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
প্রায় দেড়শ বছরের পুরনো পিরোজপুর পৌরসভা। প্রায় ৫০ বছর আগেও জনগনের পানির চাহিদা মেটানোর জন্য বিভিন্ন এলাকায় নির্দিষ্ট পুকুর ও নলকূপ ছিল। পরবর্তীতে ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে জনস্বাস্থ্য বিভাগ ১৯৮৩ সালে একটি পানি শোধনাগার চালু করে। শুরুতে এই কেন্দ্রে প্রতি ঘণ্টায় ৫০ হাজার লিটার পানি উৎপাদন হলেও বর্তমানে তা বেড়ে তিন লক্ষ লিটারে দাঁড়িয়েছে। তবে বর্তমান চাহিদার তুলনায় এই উৎপাদন অত্যন্ত সামান্য হওয়ায় কর্তৃপক্ষ পানি সরবরাহ করতে হিমশিম খাচ্ছে।
পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা বাবুল খান জানান, তিনি প্রায় ১৮ হাজার টাকা খরচ করে পৌরসভা থেকে পানির সংযোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু লাইনে কোনো পানি না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত সংযোগটি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছেন। তিনি আরও জানান, পৌর এলাকায় টিউবওয়েল বসানো সম্ভব না হওয়ায় তারা সম্পূর্ণভাবে ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন কিন্তু সেখান থেকেও প্রয়োজনীয় পানি পাওয়া যাচ্ছে না।
একই ধরণের সমস্যার কথা তুলে ধরেন ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা ফজলুল হক। তিনি জানান, পানির সংকটের কারণে তার বাড়িতে ভাড়াটিয়ারা বেশিদিন থাকতে চান না। পানির সমস্যার জন্য তার তিনটি ঘরের মধ্যে দুটি ঘরের ভাড়াটিয়াই অন্যত্র চলে গিয়েছেন। এই সংকটের কারণে বাড়ির মালিকরা অর্থনৈতিকভাবেও ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন।
পানির এই সমস্যার মূলে বেশ কিছু কারিগরি ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। পৌরসভার ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের কর্মচারী বাবুল হাওলাদার জানান, সমস্যা সমাধানের জন্য গৃহীত পদক্ষেপগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়ন না হওয়ায় সংকট কাটছে না।
তিনি বলেন, বর্তমান সংকট কাটাতে ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের পুকুরটি দ্রুত খনন করা প্রয়োজন। এছাড়া ৩০-৪০ বছর আগে শহরজুড়ে যে চিকন পাইপগুলো বসানো হয়েছিল সেগুলো পরিবর্তন করে মোটা পাইপ স্থাপন করলে পানির প্রবাহ বাড়ানো সম্ভব হবে।
পৌরসভার পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন বিভাগের সহকারী প্রকৌশলী মেহেদী হাসান জানান, শুরুতে পৌরসভার পানির গ্রাহক ছিল মাত্র পাঁচশ জন। বর্তমানে সেই সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। চলতি মৌসুমে নদী ও খাল-বিল শুকিয়ে যাওয়ায় পানির উৎস কমে গেছে যা সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে।
তিনি জানান, পানি সমস্যা সমাধানে নতুন একটি ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের প্রক্রিয়া চলছে। এই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে পানির সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে বলে তিনি আশা করেন। তবে এটি বাস্তবায়ন করা সময়সাপেক্ষ এবং অর্থ বরাদ্দের ওপর নির্ভরশীল।
বর্তমানে পিরোজপুর পৌরসভার প্রায় দুই লক্ষ বাসিন্দার জন্য প্রতি ঘণ্টায় নয় লাখ লিটার পানির চাহিদা থাকলেও উৎপাদন হচ্ছে মাত্র তিন লাখ লিটার। চাহিদার তুলনায় উৎপাদনের এই বিশাল ঘাটতিই মূলত শহরবাসীকে এক অনিশ্চিত ও মানবেতর জীবনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।


