ছোট নোটের অভাবে অদৃশ্য খরচের বোঝা

ছোট নোটের অভাবে অদৃশ্য খরচের বোঝা
Advertisement
Advertisement

একজন গ্রাহকের বিদ্যুৎ বিল এসেছে ৩ হাজার ২৩ টাকা। কিন্তু খুচরা তিন টাকা নেওয়ার মতো ব্যবস্থা ব্যাংকেও ছিল না। তাই সেই গ্রাহককে দিতে হয়েছে ৩ হাজার ২৫ টাকা।

আরেকজন গ্রাহক ঢাকার বাইরে একটি স্কুলের হিসাবে টাকা জমা করবেন। ১০ হাজার টাকা জমা দিতে চার্জ ২৩ টাকার বদলে তাকে দিতে হয়েছে ৩০ টাকা। কারণ, সেই শাখায় সাত টাকা খুচরা দেওয়ার পরিস্থিতি ছিল না।

একইভাবে একটি মুদি দোকানে ১৯৭ টাকার পণ্য কিনে এক গ্রাহককে গুনতে হয়েছে ২০০ টাকা। ফার্মেসিতে ৩৮ টাকার ওষুধ কিনে ফেরত মেলেনি দুই টাকা।

প্রতিবার অঙ্কটা খুব ছোট। তাই বেশিরভাগ মানুষ হিসাবও রাখেন না। কিন্তু দিন শেষে, মাস শেষে, বছরের শেষে এই হারিয়ে যাওয়া টাকাগুলোই হয়ে উঠছে ভোক্তাদের জন্য এক ধরনের ‘অদৃশ্য খরচ’।

এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বাজারে থেকে পাঁচ টাকার নোট ও কয়েন সংকটের কারণে। এ কারণে এক সময় কাঁচাবাজারে পণ্যের দাম যেখানে আগে পাঁচ টাকার বেশি হলে ছয় বা সাত বা আট এভাবে অথবা ১০ টাকার বেশি হলে ১১ বা ১২ বা ১৩ টাকায় দরদাম হতো, এখন তা সরাসরি ৫, ১০, ১৫, ২০-এভাবে হয়।

নগর পরিবহনে কিলোমিটার হিসেবে ভাড়া গুনার কথা থাকলেও এখন আর ১২, ১৭, ১৮ বা ২৩ টাকা ভাড়া দেওয়ার সুযোগই নেই। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই একক হয়ে গেছে ১০, ২০ বা ৩০ টাকা। ১২ টাকা যেখানে ভাড়া দিলেই চলত, যাত্রীদের দিতে হচ্ছে ২০ টাকা।

দোকানে খুচরার অভাবে ক্রেতাদের হাতে কখনো ক্যান্ডি, কখনো কমদামি চকলেট, কখনো অন্য পণ্য গছিয়ে দেওয়া হয়।

কারওয়ানবাজার এলাকায় একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘দুই টাকা ও পাঁচ টাকার চাহিদা অনেক, কিন্তু আমাদের কাছে না থাকায় আমরাও দিতে পারি না। অনেক ব্যবসায়ী খুচরা টাকা চাইতে আসেন, কিন্তু দেওয়া সম্ভব হয় না, কারণ বাংলাদেশ ব্যাংক গত কয়েক বছর নতুন নোট আর ছাপেনি।’

তিনি জানান, প্রতিটি ব্যাংকে প্রায় ১০ হাজার টাকা সমপরিমাণ ১, ২ ও ৫ টাকার কয়েন রাখা হয়। আগে অনেক দোকানদার এসব কয়েন নিয়ে যেতেন। তবে গ্রাহকরা কয়েন নিতে অনাগ্রহী হওয়ায় এখন সেগুলোর ব্যবহার কমে গেছে। ফলে ব্যাংকে অনেক কয়েন কার্যত অচল অবস্থায় পড়ে থাকে। আবার কেউ বেশি পরিমাণে কয়েন চাইলে নির্ধারিত সীমার কারণে সরবরাহ করাও সম্ভব হয় না।

বিশেষ করে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধের সময় দুই বা পাঁচ টাকার নোট না থাকলে ব্যাংক বা ভোক্তা যেকোনো এক পক্ষকে ক্ষতির মুখে পড়তে হয়, বলেন সেই কর্মকর্তা।

আরও পড়ুন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক শাহদাত সিদ্দিকী টাইমসকে বলেন, ‘ছোট নোটের সংকটের কারণে এই অতিরিক্ত অর্থপ্রদানের প্রতিটি ঘটনা আলাদাভাবে খুব ছোট মনে হলেও এর একটি সম্মিলিত অর্থনৈতিক প্রভাব রয়েছে। মাস শেষে প্রতিটি পরিবারের, প্রতিটি সদস্যের এভাবে একটি অঙ্ক চলে যাচ্ছে। এটিও একটি চাপ।’

তবে এ ধরনের লেনদেনে মোট কত অর্থ অতিরিক্ত আদান-প্রদান হচ্ছে, তার কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য বা উপাত্ত নেই। ফলে সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রভাবের পরিমাণ নির্ধারণ করা কঠিন।

ছোট নোটের সংকট পণ্যের মূল্য নির্ধারণেও প্রভাব ফেলে জানিয়ে অধ্যাপক সিদ্দিকী বলেন, ‘মুদ্রার সীমাবদ্ধতার কারণে মূল্যকে ওপরের দিকে সমন্বয় করা হয়। একটি পণ্যে অতিরিক্ত ১ বা ২ টাকা তেমন গুরুত্বপূর্ণ মনে না হলেও হাজার হাজার ইউনিট বিক্রির ক্ষেত্রে এর পরিমাণ বিশাল অঙ্কে পৌঁছাতে পারে। ফলে ধীরে ধীরে ভোক্তাদের ওপর অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ তৈরি হয় এবং এটি এক ধরনের উচ্চমূল্য পরিস্থিতি সৃষ্টি করে।’

ছোট নোট ছাপার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের যে সমস্যা, তা হলো, এক বা দুই টাকার নোট বা কয়েন বাজারে ছাড়ার খরচ পড়ে যাবে নোটের মূল্যমানের চেয়ে বেশি।

অধ্যাপক সিদ্দিকীর মতে, এই সমস্যার একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে ডিজিটাল পেমেন্টের প্রসার। মোবাইল ব্যাংকিং, কিউআর কোডভিত্তিক পেমেন্ট, ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড কিংবা তাৎক্ষণিক ব্যাংক ট্রান্সফারের মাধ্যমে নির্দিষ্ট অঙ্ক পরিশোধ করা সম্ভব হওয়ায় খুরচটার প্রয়োজন পড়ে না।

‘ডিজিটাল ব্যবস্থায় বিলের পরিমাণ দশমিকসহ যতই হোক, ঠিক ততটুকুই পরিশোধ করা যায়। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো বিপুল পরিমাণ লেনদেন নগদ বা ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে হয়। ফলে ভাংতি সংকটের প্রভাবও তুলনামূলকভাবে বেশি’, বলেন তিনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খানও ডিজিটাল পেমেন্টকেই সমাধান হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক সর্বত্র ডিজিটাল পেমেন্ট বাস্তবায়নের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এর অংশ হিসেবে জুলাই মাসের ১ তারিখ থেকে সারা দেশে বাংলা কিউআর নামের একটি একক পেমেন্ট সিস্টেম বাস্তবায়ন করছে।’

টাকা ছাপানো সময় ও ব্যয় সাপেক্ষ জানিয়ে ‍তিনি বলেন, ‘ডিজিটাল পেমেন্ট চালু করা গেলে বছরে টাকা ছাপানো বাবদ অন্তত ১০ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব হবে।’

ভারতে এই সমস্যার সমাধান ডিজিটাল পেমেন্টেই হয়েছে। সেখানে মুদির দোকানি, অটোরিকাশা- সব জায়গায় ডিজিটাল পেমেন্ট করা যাচ্ছে। তবে বাংলাদেশে এখনো সব জায়গায় তা চালু করা সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে ছোট মুদির দোকান, কাঁচাবাজার, ফুটপাতের ব্যবসা, গণপরিবহন এবং গ্রামীণ এলাকার অনেক ব্যবসায়ী ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, স্মার্টফোন, ইন্টারনেট সংযোগ বা প্রযুক্তিগত দক্ষতার অভাবে পিছিয়ে রয়েছেন। অনেকের মধ্যে অতিরিক্ত চার্জ, কর বা হিসাবের জটিলতা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।

জানতে চাইলে মোবাইল ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান নগদের মিডিয়া ও কমিউনিকেশনস বিভাগের প্রধান মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম টাইমসকে বলেন, বাংলাদেশে ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার ধীরগতির বিস্তারের পেছনে কাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক—উভয় ধরনের কারণ রয়েছে।

তার মতে, ব্যক্তি ও ব্যবসায়ী আনুষ্ঠানিক আর্থিক চ্যানেলের পরিবর্তে নগদে লেনদেনকে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থায় যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে কিছু প্রশাসনিক ও নিয়ন্ত্রক চ্যালেঞ্জও রয়েছে। ডিজিটাল লেনদেনের আওতায় আসতে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর ট্রেড লাইসেন্স, টিআইএন ও বিআইএন নম্বরের মতো আনুষ্ঠানিক নথিপত্র প্রয়োজন হয়। তবে অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এসব প্রক্রিয়ায় যুক্ত হতে অনাগ্রহী।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘বাংলা কিউআর’ উদ্যোগ ডিজিটাল লেনদেনের বিস্তারে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারলেও এই সমস্যার কতটা সমাধান করতে পারবে, তা নিয়ে সংশয় আছে জাহিদুলের।

তিনি বলেন, ‘১০ কোটির বেশি মানুষ মোবাইলভিত্তিক ডিজিটাল সেবা ব্যবহার করলেও কিউআর কোডভিত্তিক পেমেন্ট গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা আনুমানিক চার লাখের মতো। এই সংখ্যা সম্ভাব্য বাজারের তুলনায় অনেক কম, যা ডিজিটাল পেমেন্ট অবকাঠামোর সীমিত বিস্তারের ইঙ্গিত দেয়।’

নগদের এই কর্মকর্তার মতে, ডিজিটাল পেমেন্টের ব্যবহার বাড়াতে বিচ্ছিন্ন কোনো উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; বরং পুরো ইকোসিস্টেমের উন্নয়ন প্রয়োজন।

এজন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা, আর্থিক সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান এবং ব্যবসায়ীদের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad