জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর পুনর্জন্ম হয়েছিল কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ-জকসু। গত ৬ জানুয়ারি এর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও চার মাস পেরিয়ে যাওয়ার পর শিক্ষার্থীরা বলছেন, জকসুর কর্মকাণ্ডে ছাত্রবান্ধব কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।
নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এবং প্রতিনিধিদের আন্তরিকতা নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতাদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণে ধীরগতি এবং অভ্যন্তরীণ বিভক্তির কারণে জকসু কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। ছাত্রশিবির, ছাত্রদল এবং স্বতন্ত্র প্যানেল থেকে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মধ্যে মতবিরোধ এখন স্পষ্ট। অভিযোগ উঠেছে, তারা ইশতেহার বাস্তবায়নের চেয়ে রাজনৈতিক কর্মসূচি ও প্রতীকী কর্মকাণ্ডে বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন। ফলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে জকসু নিয়ে আস্থা কমছে।
চার মাসের কর্মকাণ্ড
গত চার মাসে জকসু বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বাস ট্র্যাকিং অ্যাপ ‘জেএনইউ এক্সপ্রেস’ চালু, গ্লোবাল অ্যালামনাই নেটওয়ার্ক, অনলাইন রেজাল্ট সিস্টেম, কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স কর্নার এবং আইন অনুষদে ডিএলআর সেবা চালু করা। এছাড়া গ্রাফিক ডিজাইন ও আইইএলটিএস কোর্স, আন্তর্জাতিক শিক্ষা মেলা এবং ‘ব্রিলিয়ান্ট ব্রেইনস ভ্যালি’র সাথে চুক্তি স্বাক্ষর করেছে তারা।
জাতীয় ও ক্যাম্পাস সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ইস্যুতে তারা মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচিও পালন করেছে। ক্যাম্পাসে পরীক্ষামূলকভাবে ‘স্টারলিংক’ ইন্টারনেট সেবা চালু করা হলেও ধীরগতির কারণে শিক্ষার্থীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। পরে নতুন রাউটার বসানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
তবে শিক্ষার্থীদের দাবি, এসব ছোটখাটো উদ্যোগের তুলনায় আবাসন সংকট, সম্পূরক বৃত্তি, ক্যাফেটেরিয়ার খাবারের মান ও দাম নিয়ন্ত্রণ এবং দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের কাজের অগ্রগতির মতো মৌলিক সমস্যা সমাধানে কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেই।
ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী আরিফুল ইসলাম বলেন, চার মাস সময় কম নয়। কিন্তু তাদের ইশতেহার বাস্তবায়নের গতি খুবই ধীর।
লোকপ্রশাসন বিভাগের তানজিম হোসেন বলেন, বড় আশা নিয়ে শিক্ষার্থীরা যাদের ভোট দিয়েছিল, তারা আস্থা হারাচ্ছেন। আবাসন সংকটের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো এখন আর অগ্রাধিকার পাচ্ছে না।
সমালোচনার জবাবে জকসু সাধারণ সম্পাদক আব্দুল আলিম আরিফ বলেন, “এক বছরের মধ্যে সব সমস্যা সমাধান করা অবাস্তব। প্রশাসন ও সরকার পূর্ণ সহযোগিতা করলে লক্ষ্য পূরণ সহজ হতো। তবে সবসময় সেই সহযোগিতা পাওয়া যায় না। মেয়াদ শেষে শিক্ষার্থীরাই আমাদের কাজের বিচার করবে।”
ছাত্রদল ও শিবিরের মধ্যে বিভক্তি
জাতীয় ও ক্যাম্পাস ইস্যুতে ছাত্র সংসদের ভেতরে রাজনৈতিক বিভক্তি এখন প্রকাশ্যে। ছাত্রশিবির, ছাত্রদল এবং স্বতন্ত্র—এই তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন প্রতিনিধিরা। এমনকি তারা আলাদা আলাদা প্যাডে পাল্টাপাল্টি বিবৃতি ও কর্মসূচিও দিচ্ছেন।
ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেল থেকে নির্বাচিত চার প্রতিনিধি অভিযোগ করেছেন, জকসুতে শিবিরের ১৬ জন প্রতিনিধির একক আধিপত্য চলছে। গত ২৫ এপ্রিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নেতাদের ওপর হামলার প্রতিবাদে জকসু কর্মসূচি পালন করে। এর পরদিন ছাত্রদল প্যানেল থেকে নির্বাচিত চারজন—লাইব্রেরি সম্পাদক রিয়াসাল রাকিব, সাংস্কৃতিক সম্পাদক তাকরিম আহমেদ, পরিবহন সম্পাদক মাহিদ হাসান এবং সদস্য সাদমান সাম্য সংবাদ সম্মেলন করে অভিযোগ করেন, জকসুকে শিবিরের সাংগঠনিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে ব্যবহার করা হচ্ছে।
দর্শন বিভাগের শিক্ষার্থী লিমন ইসলাম সতর্ক করে বলেন, “রাজনীতি ও আদর্শের ঊর্ধ্বে উঠে কাজ না করলে সাধারণ শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”
তবে স্বতন্ত্র সদস্য জাহিদ হাসান মনে করেন, এখনই চূড়ান্ত মন্তব্য করার সময় আসেনি। তিনি বলেন, “ছুটি ও জাতীয় নির্বাচনের কারণে অনেক কাজ বাকি রয়ে গেছে। তবে নীতিনির্ধারণে আমাদের আরও সক্রিয় হওয়া প্রয়োজন।”
সাংস্কৃতিক সম্পাদক তাকরিম মিয়া বলেন, “শিবির সমর্থিত প্রতিনিধিরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ায় তারা একতরফা সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেন। বাকি ৫ জনের মতামতের কোনো গুরুত্ব দেওয়া হয় না।”
অবশ্য সাধারণ সম্পাদক আব্দুল আলিম আরিফ বিভক্তির কথা অস্বীকার করে বলেন, মতভেদ থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু সবাই শিক্ষার্থীদের জন্যই কাজ করছেন।
সাদা দলের সমালোচনা
গত ৬ মে বিএনপির আদর্শধারী শিক্ষক সংগঠন ‘সাদা দল’ এক বিবৃতিতে দাবি করে, জকসুর কর্মকাণ্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশকে অস্থিতিশীল করছে। তারা অভিযোগ করেন, জকসু সুস্থ একাডেমিক পরিবেশের পরিপন্থী কাজ করছে। এমনকি উপাচার্যকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করা হচ্ছে, যা প্রশাসনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করছে।
এর প্রতিবাদে ৭ মে জকসু পাল্টা বিবৃতিতে জানায়, সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভোটে নির্বাচিত জকসু সবসময় শিক্ষার্থীদের অধিকার ও স্বার্থ রক্ষায় কাজ করছে। সাদা দলের বিবৃতিকে তারা শিক্ষার্থীদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণ করার চেষ্টা হিসেবে অভিহিত করে।
ছাত্র নেতাদের হতাশা
বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতারা মনে করেন, জকসু সাধারণ শিক্ষার্থীদের ম্যান্ডেট রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে। তারা প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা বা অবকাঠামো সংকটে শিক্ষার্থীদের ঐক্যবদ্ধ করতে পারছে না।
ছাত্রদল জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আহ্বায়ক মেহেদী হাসান হিমেল বলেন, “দলাদলির ঊর্ধ্বে উঠে জকসুর কাজ করার কথা ছিল। কিন্তু একটি নির্দিষ্ট সংগঠনের অনুসারী হওয়ায় তারা মৌলিক দায়িত্ব পালন করতে পারছে না।”
সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের সভাপতি ইভান তাহসিব বলেন, “আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে জকসু ব্যর্থ। তবে আমরা প্রতি বছর নির্বাচন চাই, যাতে যোগ্য প্রতিনিধিরা উঠে আসতে পারে।”
ছাত্র অধিকার পরিষদের সাবেক সভাপতি এ কে এম রকিব এবং ছাত্র শক্তির আহ্বায়ক ফয়সাল মুরাদও জকসুর কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেন। তারা বলেন, মৌলিক সমস্যাগুলো এড়িয়ে দলীয় স্বার্থ প্রাধান্য দেওয়ায় জকসু শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে না।


