শেখ হাসিনার পরিবার ও ১০টি শিল্পগ্রুপের ৭৬ হাজার কোটি টাকার সম্পদ অবরুদ্ধ করেছে আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য দিয়েছেন বিএফআইইউ‘র প্রধান ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ মামুন।
তবে অবরুদ্ধ সম্পদের মধ্যে শেখ হাসিনা পরিবারের সম্পদের পরিমাণ কত তা জানাননি তিনি। শুধু জানান, ‘অর্থপাচারের ১১টি যৌথ তদন্তের ঘটনায় আদালতের আদেশে ৭৬ হাজার কোটি টাকার সম্পদ অবরুদ্ধ করা হয়েছে। এর মধ্যে দেশের অভ্যন্তরে আছে ৫৭ হাজার কোটি টাকা, আর বিদেশে ১৯ হাজার কোটি টাকা।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে পাচার হওয়া অর্থ ফেরতে অগ্রগতি প্রসঙ্গে ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ মামুন বলেন, ‘আমাদের প্রক্রিয়া চলমান আছে। এই বছরের শেষের দিকে আমরা দেশবাসীকে একটা সুসংবাদ দিতে পারবো আশা করি।’
তিনি জানান, অর্থপাচারের ঘটনার তদন্ত কার্যক্রমে গতি আনতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে শেখ হাসিনা ও তার পরিবার এবং ১০টি গ্রুপকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। রাষ্ট্রের অন্যান্য সংগঠন মিলিয়ে গঠন করা হয় ১১টি যৌথ তদন্ত কমিটি। এই চাঞ্চল্যকর ১১টি ঘটনার তদন্তে এখন পর্যন্ত ৯৮টি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বিএফআইইউ কারো রাজনৈতিক বা অন্য কোনো পরিচয় দেখে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করে না। অভিযোগ আসলেই তদন্ত করা হয়। এখানে কোনো ব্যক্তিকে টার্গেট করে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট অবরুদ্ধ করা হয় না। আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা করে না। সন্দেহজনক লেনদেন বা কার্যক্রমের তথ্য পাওয়া গেলে নিয়ম অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ (ফ্রিজ) করা হয়।
ইস্টার্ন ব্যাংকের চেয়ারম্যান শওকত আলী চৌধুরীর বিরুদ্ধে যুক্তরাজ্যে ৩০৭ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ ওঠে। যথা সময়ে তা আটকাতে না পারায় পরবর্তীতে তা সংযুক্ত আরব আমিরাতে চলে যায় বলে সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ হয়। এ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন করা হলে বিএফআইইউ প্রধান কোনো উত্তর দেননি।
তবে সংবাদ সম্মেলন শেষে বিএফআইইউ-এর এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, যুক্তরাজ্য থেকে মধ্যপ্রাচ্যে চলে যাওয়া সেই অর্থের একটি অংশ আদায় হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ শেষে চলতি বছরের শেষ নাগাদ তার একটি অংশ দেশে ফেরত আসতে যাচ্ছে।
সুইস ব্যাংকের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক চুক্তির প্রস্তাবে সাড়া নেই
দেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের একটি অংশ চলে যায় সুইজারল্যান্ডের সুইস ব্যাংকগুলোতে। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের (এসএনবি) সর্বশেষ ২০২৫ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের মোট জমার পরিমাণ ৮৩ কোটি ৪১ লাখ ৬০ হাজার সুইস ফ্রাঁ, যা স্থানীয় মুদ্রায় প্রায় ১২,৭৬৩ কোটি টাকার সমপরিমাণ।
এক বছরের ব্যবধানে জমার পরিমাণ বেড়েছে ৪১ শতাংশ। ২০২৪ সালে এর পরিমাণ ছিল প্রায় ৫৯ কোটি সুইস ফ্রাঁ।
বিশ্বের ৯০টি দেশের সঙ্গে সরাসরি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি রয়েছে সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে। দ্বিপাক্ষিক তথ্য শেয়ারিং চুক্তি বা স্বয়ংক্রিয় তথ্য বিনিময় চুক্তির মাধ্যমে দেশগুলো সুইজারল্যান্ডে থাকা অর্থ কোন নাগরিকের তা জানতে পারে এসব দেশ।
এগমন্ট গ্রুপের সদস্য দেশ হওয়ার পর ২০২৩ সালে সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে চুক্তি করতে প্রস্তাব দেয় বিএফআইইউ।
পরবর্তীতে ২০১৪ ও ২০১৮ সালেও আরেকবার চিঠি দেওয়া হয়। প্রতিবেশি দেশ ভারত এই বিষয়ে চুক্তি করতে পারলেও বাংলাদেশ এখনো পারেনি।
সেই প্রক্রিয়ার অগ্রগতি কতোটা বাড়লো প্রশ্নে বিএফআইইউ প্রধান জানান, এনিয়ে কোনো অগ্রগতি নেই। এখন পর্যন্ত এগমন্ট গ্রুপের সদস্য হিসেবে বাংলাদেশের সঙ্গে সুইজারল্যান্ডের সমঝোতা স্মারক রয়েছে। সুইজারল্যান্ডও এগমন্ট গ্রুপের সদস্য।
দ্বিপাক্ষিক চুক্তি না থাকায় সুইস ব্যাংকে থাকা বাংলাদেশি নাগরিকদের অর্থের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে পারছে না বিএফআইইউ।
সন্দেহজনক লেনদেন বেড়েছে
আগের অর্থবছরের চেয়ে সার্বিকভাবে নগদ লেনদেনের পরিমাণ কমলেও সন্দেহজনক লেনদেন বেড়েছে। বিএফআইইউ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আর্থিক খাত থেকে মোট ৩০ হাজার ১৯৯টি সন্দেহজনক রিপোর্ট পায়। এর মধ্যে সন্দেহজনক লেনদেন হয়েছে ২০ হাজার ৫২৪টি। আর সন্দেহজনক কার্যক্রমে অর্থব্যবহারের ঘটনা সনাক্ত হয় ৯ হাজার ৬৭৫টি।
এছাড়া ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সন্দেহজনক রিপোর্ট আসে ১৭ হাজার ৩৪৫টি। এক বছরে সন্দেহজনক রিপোর্ট বেড়েছে ১২ হাজার ৮৫৪টি বা ৭৪ দশমিক ১০ শতাংশ।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, সন্দেহজনক লেনদেন ও কার্যক্রমের প্রতিবেদন দাখিলে দেশের ব্যাংকিং খাতই সবচেয়ে এগিয়ে। গত তিন অর্থবছরে মোট প্রতিবেদনের ৯০ শতাংশেরও বেশি এসেছে ব্যাংকগুলো থেকে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এ হার ছিল ৯১ শতাংশ, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৯২ শতাংশ এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে ৯৫ শতাংশে পৌঁছেছে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে ব্যাংকগুলো ২৮ হাজার ৭৫৫টি সন্দেহজনক লেনদেন ও কার্যক্রমের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে, যা আগের অর্থবছরের ১৫ হাজার ৯৯১টির তুলনায় প্রায় ৮০ শতাংশ বেশি।
অর্থপাচার করার নিত্য নতুন উপায় বেড়ে যাচ্ছে আর্থিক খাতে। অনলাইন জুয়া ও গেমিং এর একটি অংশ। তা প্রতিরোধে প্রস্তুতি কেমন জানতে চাইলে বিএফআইইউ প্রধান বলেন, টেকনোলজিক্যাল ডেভেলপমেন্টের কারণে মালি লন্ডারিংয়ের ধরনটা পালটে গেছে। তাই এসব প্রতিরোধ করার জন্য বিএফআইইউ কারিগরি ও প্রযুক্তিগত দিক থেকে আরও সমৃদ্ধ হচ্ছে।


