গ্রামীণফোনের (জিপি) কয়েক হাজার সাবেক কর্মীর সঙ্গে ১৫ বছরের পুরোনো আইনি লড়াই এখন বিক্ষোভ ও গ্রেপ্তারের মতো উত্তপ্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। আন্দোলনরত কর্মীদের দাবি, এই বিরোধে জড়িয়ে থাকা টাকার পরিমাণ সরকারের সঙ্গে কোম্পানির চলমান ১ বিলিয়ন ডলারের (প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা) অডিট মামলার বিরোধকেও ছাড়িয়ে গেছে।
এই বিরোধের মূল কারণ ২০১০ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত শ্রমিকদের লভ্যাংশ তহবিলের (ডব্লিউপিপিএফ) টাকা দেরিতে দেওয়ায় তার ওপর আইনগত সুদ। সাবেক কর্মীদের অভিযোগ, গ্রামীণফোন মামলার অজুহাতে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে মূল টাকা আটকে রেখেছিল। এর ফলে বাংলাদেশ শ্রম আইন অনুযায়ী সুদের পরিমাণ জমতে জমতে এটি এখন দেশের ইতিহাসের অন্যতম বড় করপোরেট পাওনা দাবিতে পরিণত হয়েছে।
তবে গ্রামীণফোন এই দাবি অস্বীকার করে বলেছে, তারা আদালতের নির্দেশ মেনেই মূল টাকা পরিশোধ করেছে এবং বাকি বিষয়গুলো এখন আদালতে বিচারাধীন।
মঙ্গলবার এই বিরোধ রাজপথে নেমে আসে। ‘গ্রামীণফোন ৫ পারসেন্ট ডিলে এরিয়ার রিকভারি ইউনিটি কাউন্সিল’-এর ব্যানারে প্রায় ৫০০ সাবেক কর্মী ও তাদের পরিবার আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি মেটানোর দাবিতে জিপি হাউজের সামনে জড়ো হন। কিন্তু কর্মসূচি শুরু হওয়ার আগেই পুলিশ ছয়জন সংগঠককে আটক করে, যদিও পরে তারা জামিন পান।
ভাটারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাজহারুল ইসলাম টাইমস অব বাংলাদেশ’কে জানান, জিপি কয়েক দিন আগে ভাঙচুর ও মারধরের অভিযোগে একটি মামলা করেছিল। মঙ্গলবার আটক হওয়া ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদের পর ওই মামলায় খালিদ মামুন, বুলবুল, নজরুল, কালাম, মজিবুর ও কুরাইশীকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
আন্দোলনকারীরা অবশ্য বলছেন, তাদের কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ ছিল। তাদের অভিযোগ, গ্রামীণফোন আলোচনার টেবিলে না বসে পুলিশ দিয়ে আন্দোলন দমনের চেষ্টা করছে। এর প্রতিবাদে তারা ১ জুলাই থেকে দেশব্যাপী বড় আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েছেন।
অন্যদিকে গ্রামীণফোন তাদের অবস্থানে অনড় থেকে বলেছে, যেকোনো দাবি আদালতের মাধ্যমেই সুরাহা হওয়া উচিত। কর্মকর্তা ও সম্পদের নিরাপত্তার স্বার্থেই তারা পুলিশের সহযোগিতা চেয়েছিল যাতে মোবাইল নেটওয়ার্ক সেবায় কোনো বিঘ্ন না ঘটে।
এক সংবাদ সম্মেলনে সাবেক কর্মীরা দাবি করেন, শ্রম আইনের একটি ধারা অনুযায়ী যদি জিপি’র বার্ষিক লভ্যাংশের ৭৫ শতাংশ হারে সুদ হিসাব করা হয়, তবে ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ৪,০০০ কর্মীর প্রত্যেকে ৩৩ কোটি টাকারও বেশি পাওয়ার অধিকারী হবেন। সংগঠনের যোগাযোগ সম্পাদক আদিবা জেরিন চৌধুরী টাইমস’কে বলেন, যদি ওই কঠিন ধারাটি প্রয়োগ নাও করা হয়, তাহলেও প্রত্যেকে অন্তত ২২ কোটি টাকা করে পাবেন।
গ্রামীণফোন এই হিসাবকে ভুল আখ্যা দিয়ে বলেছে, হাইকোর্টের নির্দেশ মেনে মুচলেকা দিয়ে ৪,৩০০ জনেরও বেশি কর্মী আগেই স্বেচ্ছায় মূল টাকা নিয়ে নিয়েছেন।
আদিবা এই দাবি খণ্ডন করে বলেন, গ্রামীণফোন শুধু মূল টাকাই দিয়েছে। সুদের বিষয়টি আদালতের রায়ের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। তিনি অভিযোগ করেন, যখন কর্মীরা আদালতে জেতার কাছাকাছি ছিলেন, তখন কোম্পানিটি চালাকি করে ২০২৩ সালে সরকারের বিরুদ্ধে করা তাদের রিট মামলাটি তুলে নেয়, যার ফলে পুরো আইনি প্রক্রিয়া গোলমেলে হয়ে যায়।
এই ঘটনার পর থেকেই প্রায়ই বিক্ষোভ হচ্ছে এবং এটি একটি বড় আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
এই বিরোধের সূত্রপাত হয় ২০১০ সালের অক্টোবরে, যখন সরকারি এক আদেশে মোবাইল অপারেটরদের শ্রম আইনের আওতায় এনে কর্মীদের জন্য লভ্যাংশ তহবিল গঠন বাধ্যতামূলক করা হয়।
গ্রামীণফোন ২০১১ সালে হাইকোর্টে এই আদেশের বিরুদ্ধে মামলা করে এবং স্থগিতাদেশ পায়। পরে ২০১৩ সালে সংসদ আইন সংশোধন করে মোবাইল কোম্পানিগুলোর জন্য এই তহবিল গঠন স্পষ্টভাবেই বাধ্যতামূলক করে। এরপর গ্রামীণফোন তহবিল গঠন করে এবং নিয়মিত টাকা দিচ্ছে বলে জানায়। তবে ২০১০ থেকে ২০১২ সালের বকেয়া টাকা নিয়ে মূল বিরোধটি থেকে যায়।
সাবেক কর্মীদের বক্তব্য, হাইকোর্ট ২০১৪ সালে গ্রামীণফোনকে শুধু মূল টাকা দেওয়ার অনুমতি দিয়েছিল এবং দেরিতে টাকা দেওয়ার কারণে যে সুদ আসবে, তা পরের মামলার রায়ের ওপর ছেড়ে দেয়। তাই মূল টাকা নেওয়ার সময় দেওয়া অঙ্গীকারনামার কারণে তাদের সুদের অধিকার চলে যায়নি। গ্রামীণফোন অবশ্য দাবি করছে, তারা আদালতের নির্দেশ পুরোপুরি মেনে চলেছে।
২০২৩ সালের মার্চ মাসে গ্রামীণফোন তাদের মূল মামলাটি প্রত্যাহার করে নিলে পরিস্থিতি নতুন মোড় নেয়। সাবেক কর্মীদের দাবি, মামলা তুলে নেওয়ার কারণে ২০১০ সালের সরকারি আদেশটিই বহাল হয়ে গেছে এবং শ্রম আইন অনুযায়ী তারা এখন সুদ পাওয়ার যোগ্য।
এরপরই ১,০০০-এরও বেশি সাবেক কর্মী সুদের দাবিতে শ্রম আদালতে আলাদা আলাদা মামলা করেন। আন্দোলনকারীরা বলছেন, গ্রামীণফোন এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (যা চাকরি হারানো নেতারাই আগে গঠন করেছিলেন) মামলাটি আবার চালু করার জন্য নতুন আবেদন করায় শ্রম আদালতের মামলাগুলোর গতি থমকে গেছে। গ্রামীণফোন অবশ্য এই অভিযোগ মানতে নারাজ। তারা আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই সব সমাধানের কথা বলছে।
শ্রম আদালতে দেওয়া কর্মীদের হিসাবে দেখা যায়, লভ্যাংশের ওপর ভিত্তি করে যে বিপুল সুদের দাবি করা হচ্ছে, তা বিটিআরসি’র অডিট নিয়ে সরকারের সাথে গ্রামীণফোনের ১ বিলিয়ন ডলারের বিরোধের চেয়েও অনেক বড়। তবে এই হিসাবটি শুধুই আদালতে জমা দেওয়া নথির অংশ, আদালত এখনো এ বিষয়ে কোনো রায় দেননি। গ্রামীণফোন এই হিসাব ও আইনি ব্যাখ্যা—দুটো নিয়েই আপত্তি তুলেছে।
এর আগেও সাবেক কর্মীদের সাথে পুলিশের সংঘর্ষ হয়েছিল, যার মধ্যে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির বিক্ষোভে জলকামান ব্যবহার ও লাঠিচার্জের ঘটনা ঘটে।
গ্রামীণফোন এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা আদিবা জেরিন তাকে চাকরি থেকে বাদ দেওয়ার বিষয়টি আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থায় (আইএলও) উত্থাপন করেছেন। তার দাবি, শ্রমিক ইউনিয়ন করার কারণেই তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে। আইএলও চলতি বছরের শুরুতে এই বিষয়টিকে ‘গুরুতর’ বলে অভিহিত করেছে।
এত বছর ধরে মামলা চালানোর পর মাঝপথে কেন গ্রামীণফোন মামলাটি তুলে নিল—টাইমস অব বাংলাদেশ-এর এমন প্রশ্নের তাৎক্ষণিক কোনো জবাব দেয়নি কোম্পানিটি। বরং তারা উত্তর দেওয়ার জন্য আরও সময় চেয়েছে।


