এক দশক পেরিয়েও অনিশ্চয়তায় স্মার্ট কার্ড প্রকল্প: বাড়ছে সময় ও ব্যয়

এক দশক পেরিয়েও অনিশ্চয়তায় স্মার্ট কার্ড প্রকল্প: বাড়ছে সময় ও ব্যয়
প্রতীকী ছবি
Advertisement
Advertisement

এক দশকের বেশি সময় পার করেও লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) একটি বড় প্রকল্প। কর্তৃপক্ষ এখন এই প্রকল্পের মেয়াদ এবং বাজেট আবারও বাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।

২০১১ সালে ‘আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম ফর এনহ্যান্সিং অ্যাকসেস টু সার্ভিসেস’ (আইডিইএ) নামের এই প্রকল্প শুরু করেছিল নির্বাচন কমিশন। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও প্রযুক্তিগতভাবে সুরক্ষিত স্মার্ট কার্ড প্রদান করা। প্রকল্প শুরুর ১৫ বছর হতে চললেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এখনো বলতে পারছেন না ঠিক কবে সব নাগরিক এই কার্ড হাতে পাবেন।

এই প্রকল্পটি বারবার বিলম্ব, ক্রমবর্ধমান খরচ এবং লক্ষ্য পরিবর্তনের জন্য পরিচিতি পেয়েছে। এখন প্রকল্পের মেয়াদ আরও দুই বছর বাড়ানোর জন্য নতুন করে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এই পদক্ষেপ প্রকল্পের দক্ষতা এবং জবাবদিহিতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। একই সঙ্গে এই প্রকল্পে ব্যয় করা অর্থের সঠিক ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্মার্ট কার্ড তৈরিতে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করা হলেও পরিকাঠামোর অভাবে এটি এখন সাধারণ লেমিনেট করা কার্ডের চেয়ে বাড়তি কোনো সুবিধা দিতে পারছে না।

শুরু থেকেই ধীরগতি

নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তা এবং প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, শুরু থেকেই এই প্রকল্পের অগ্রগতি ছিল অত্যন্ত ধীর। ২০১১ সালে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে চুক্তি হলেও পদ্ধতিগত জটিলতার কারণে কাজ শুরু করতে প্রায় দুই বছর দেরি হয়। এরপর ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে ফরাসি প্রতিষ্ঠান ওবার্থার টেকনোলজিসের সঙ্গে ৮১৬ কোটি টাকার একটি চুক্তি সই হয়। ২০১৬ সালের জুনের মধ্যে স্মার্ট কার্ড তৈরি ও বিতরণের কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও পরে সেই মেয়াদ ২০১৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল।

কাজের ধীরগতি এবং পারফরম্যান্স নিয়ে অসন্তোষের কারণে ২০১৭ সালে ফরাসি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে নির্বাচন কমিশন। বিশ্বব্যাংকও এই প্রকল্প থেকে তাদের অর্থায়ন প্রত্যাহার করে নেয়।

পরবর্তীতে সরকারি অর্থায়নে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি (বিএমটিএফ) প্রকল্পের কাজ শুরু করে। ২০২০ সাল নাগাদ প্রায় ৬ কোটি ভোটার স্মার্ট কার্ড পেলেও ততদিনে প্রকল্পের মেয়াদ ছয়বার বাড়ানো হয়েছিল।

চ্যালেঞ্জের মুখে দ্বিতীয় ধাপের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন

পুরানো প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর বদলে নির্বাচন কমিশন ২০২০ সালের ডিসেম্বরে ৫ বছর মেয়াদি দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ শুরু করে। এই পর্যায়ে ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বরের মধ্যে ৩ কোটি নাগরিককে স্মার্ট কার্ড দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে সেই লক্ষ্য পূরণ না হওয়ায় এখন সময়সীমা ২০২৬ সালের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। কাজ অসম্পূর্ণ থাকায় কর্মকর্তারা এখন এই মেয়াদ আরও দুই বছর বাড়ানোর চিন্তা করছেন।

স্মার্ট কার্ড সংগ্রহের কাজও বাধার মুখে পড়েছে। বিএমটিএফ নির্বাচন কমিশনকে জানিয়েছে, ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় তারা আগের নির্ধারিত মূল্যে ৩ কোটি কার্ড সরবরাহ করতে পারবে না। আলোচনার পর ১৭১ টাকা দরে ২ কোটি ৩৬ লাখ ৩৪ হাজার কার্ড সরবরাহের জন্য ৪০৬ কোটি টাকার একটি সংশোধিত চুক্তি হয়। এর ফলে মূল পরিকল্পনার চেয়ে প্রায় ৬৪ লাখ কার্ড কম পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। দ্বিতীয় ধাপের পাঁচ বছর পার হলেও স্থানীয় নির্বাচন অফিসগুলোর মাধ্যমে বিতরণ হয়েছে মাত্র ১৭ লাখ স্মার্ট কার্ড।

আরও পড়ুন

২০২৫ সালের অক্টোবরে নির্বাচন কমিশনার আবু ফজল মো. সানাউল্লাহ এবং প্রকল্প পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আজিজুর রহমান সিদ্দিকী ফ্রান্সে ব্লাঙ্ক কার্ড পরিদর্শনে গিয়েছিলেন। কিন্তু সাত মাস পেরিয়ে গেলেও প্রায় ২ কোটি ১৯ লাখ কার্ড এখনো বাংলাদেশে এসে পৌঁছায়নি।

বর্তমান সময়সীমার মধ্যে বাকি কার্ডগুলো সরবরাহ করা সম্ভব কি না তা নিয়ে প্রবল সংশয় রয়েছে। তবে বর্তমান প্রকল্প পরিচালক আজিজুর রহমান সিদ্দিকী আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, সময়মতো সরবরাহ সম্ভব না হলে বিএমটিএফ-এর সঙ্গে চুক্তি করা হতো না।

উচ্চ ব্যয় সত্ত্বেও সীমিত সুবিধা

স্মার্ট কার্ডগুলোতে ৬৪ কিলোবাইটের চিপ এবং ২৪ ধরনের নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য থাকলেও এর ব্যবহারিক সুবিধা অত্যন্ত সীমিত। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো এই চিপ ব্যবহার করার মতো প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি করতে পারেনি। ফলে সাধারণ লেমিনেট করা কার্ডের তুলনায় নাগরিকরা এর থেকে বাড়তি কোনো সুবিধা পাচ্ছেন না।

বিশ্লেষকদের মতে, পারিবারিক সহায়তা বা কৃষি কার্ডের মতো বিভিন্ন জনসেবা এই একটি কার্ডের সঙ্গেই যুক্ত করা সম্ভব ছিল। এতে কাজের গতি বাড়তো এবং জালিয়াতি কমতো।

নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, কার্ডের কার্যকারিতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে গঠিত একটি কমিটি মে মাসের শুরুতে প্রতিবেদন জমা দেবে।

আর্থিক অনিয়ম ও অডিট আপত্তি

প্রকল্পের আর্থিক লেনদেন নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছে। নির্বাচন কমিশন প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, জনবল এবং ব্লাঙ্ক কার্ড সরবরাহ করলেও বিএমটিএফ কার্ডে তথ্য অন্তর্ভুক্ত করার জন্য আলাদাভাবে টাকা নিচ্ছে। কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি ছাড়াই ১২১ কোটি তথ্য বসানোর জন্য কার্ড প্রতি ৩২ টাকা হারে প্রায় ৭৪ কোটি টাকা বিএমটিএফ’কে পরিশোধ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

এ ছাড়া যন্ত্রপাতি মেরামতের জন্য আরও ২৩ কোটি টাকা দাবি করেছে বিএমটিএফ। নির্বাচন কমিশনের দুটি তদন্ত কমিটি যন্ত্র মেরামতের এমন দাবির স্বপক্ষে কোনো প্রমাণ পায়নি। বর্তমানে প্রকল্পের জন্য থাকা ১০টি যন্ত্রের মধ্যে মাত্র ২টি সচল রয়েছে।

তবে প্রকল্প পরিচালক দাবি করেন, সবকিছু চুক্তি অনুযায়ী করা হচ্ছে এবং মেরামতের টাকা বিএমটিএফ-এর অন্য পাওনা থেকে সমন্বয় করা হয়েছে।

প্রবাসী ভোটার নিবন্ধনে নগণ্য সাফল্য

প্রবাসীদের ভোটার তালিকায় নাম তোলার উদ্যোগও সফল হয়নি। দ্বিতীয় ধাপের আইডিইএ প্রকল্পের আওতায় ২০২৫ সালের মধ্যে ৪০টি দেশে ভোটার নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা ছিল এবং এর জন্য ২০ কোটি টাকা বাজেট রাখা হয়েছিল। এখন পর্যন্ত মাত্র ১৫ থেকে ১৬টি দেশে এই কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

এই কাজের জন্য বাজেটের ১০ কোটি টাকা ইতিমধ্যে খরচ হয়ে গেছে। এই খরচের বড় অংশই ব্যয় হয়েছে কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণে। এত অর্থ ব্যয়ের পরও মাত্র ৪০ হাজার প্রবাসী ভোটার নিবন্ধিত হয়েছেন। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং জাপানের মতো দেশগুলোতে বড় বড় প্রতিনিধি দল সফর করলেও কারিগরি দলের মাধ্যমে কাজ করা সম্ভব ছিল বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

খরচের বোঝা আরও বাড়ার আশঙ্কা

প্রকল্পের ব্যয় আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এনআইডি ডাটাবেজের নিরাপত্তার জন্য ডিজাস্টার রিকভারি সিস্টেম (ডিআরএস) তৈরিতে ২০০ কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ দেওয়ার প্রস্তাব আসতে পারে। প্রকল্পের মেয়াদ বাড়লে পরিচালনা ব্যয়ও বাড়বে। বর্তমানে এই প্রকল্পে ২ হাজার ২০০ জন আউটসোর্স কর্মী রয়েছেন যাদের পেছনে প্রতি মাসে ৬ কোটি টাকা খরচ হয়। প্রকল্পের মেয়াদ এক বছর বাড়ালে শুধু বেতন বাবদই অতিরিক্ত ৭২ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে।

কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

প্রকল্প পরিচালক স্বীকার করেন, স্মার্ট কার্ডের পূর্ণ সম্ভাবনা এখনো কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন, বর্তমান স্মার্ট কার্ডের মূল সুবিধা হলো এর উচ্চতর নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য, যা নকল করা অসম্ভব।

কার্ডের বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য বুয়েটের বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি দল কাজ করছে যারা ৯ মে’র মধ্যে তাদের প্রতিবেদন দেবে। ভবিষ্যতে এই কার্ড মেট্রোরেল, আর্থিক লেনদেন এবং জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় ব্যবহার করা যেতে পারে বলে জানান প্রকল্প পরিচালক। তবে এর জন্য সব প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।

আজিজুর রহমান সিদ্দিকী জানান, প্রকল্পের মেয়াদ দুই বছর বাড়ানো এবং কিছু ক্ষেত্রে বরাদ্দ বাড়ানোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। আগামীতে এনআইডি ইস্যু করার খরচ প্রকল্পের পরিবর্তে রাজস্ব বাজেট থেকে মেটানো হবে বলেও জানান তিনি। বিএমটিএফ থেকে পাওয়া বাকি কার্ডগুলো ৩০ নভেম্বরের মধ্যে পাওয়া যাবে বলে তিনি আশা করছেন।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad