প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করার পরও ঘন্টা খানেকের ভারী বৃষ্টিতেই তলিয়ে যাচ্ছে বন্দর নগরী চট্টগ্রাম। মঙ্গলবার কেবল ৩ ঘণ্টায় ৫১ মিলিমিটার বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে বিভিন্ন এলাকা। ফলে জলাবদ্ধতার সেই পুরোনো দুর্ভোগই ফিরে এসেছে নগরবাসীর জীবনে।
জলাবদ্ধতা নিরসনে হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়ার পরও গোটা শহর বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে যাওয়ার দায় প্রকৃতির ওপর চাপিয়েছেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)-এর কর্মকর্তারা। তাদের দাবি, নগরের সব নালা ও খালগুলো পরিষ্কার রয়েছে, বরং বৃষ্টির তীব্রতা বেশি হওয়ায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে।
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) মেয়র শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অধীনে হিজরা খাল ও জামালখান খালের সংস্কারকাজ বর্তমানে চলমান রয়েছে। এসব কাজের কারণে কিছু জায়গায় পানি প্রবাহে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে সেসব এলাকায় সাময়িক জলাবদ্ধতা দেখা দিচ্ছে।’
‘উন্নয়নকাজ চলাকালে নাগরিকদের কিছুটা দুর্ভোগ পোহাতে হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখবে’ দাবি করে চসিক মেয়র বলেন, ‘কাজ শেষ হলে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি হবে এবং জলাবদ্ধতা অনেকাংশে কমে আসবে। চলতি বর্ষা মৌসুমেই নগরীর প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।’
এদিকে বন্দর নগরীর জলাবদ্ধতা স্থায়ী নিরসনে প্রায় প্রতি সরকারই জনগণকে আশ্বস্ত করছে। নিয়মিত বড় প্রকল্প নেওয়া হলেও জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি মিলছে না নগরবাসীর।
পরিসংখ্যান বলছে, গত চার বছরে অন্তত ৩০ বার ডুবেছে চট্টগ্রাম নগর। ২০২৫ সালে কিছুটা স্বস্তি মিললেও ২০২৪ সালে ছয় বার, ২০২৩ সালে ১৪ বার এবং ২০২২ সালে ১০ বার জলাবদ্ধতা দেখা গেছে।
এ বছরও কালবৈশাখী ঝড়ের প্রভাবে চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। মঙ্গলবার দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত তিন ঘণ্টায় ৫১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ সুমন সাহা।
তিনি বলেন, ‘আগামী চার দিন মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। উত্তর বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় বায়ুচাপের তারতম্য বিরাজ করছে।’
চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরসমূহকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা ও পাহাড়ধসের আশঙ্কা রয়েছে বলেও তিনি সতর্ক করেন।

এদিকে চসিক সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে যৌথভাবে চারটি বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড। এর মধ্যে সিডিএ-এর ‘খাল পুনঃখনন, সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন’ প্রকল্পের ব্যয় আট হাজার ৬২৬ কোটি টাকা। কর্ণফুলী নদীর তীরঘেঁষে সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের ব্যয় দুই হাজার ৭৭৯ কোটি টাকা। সিটি করপোরেশনের নতুন খাল খনন প্রকল্পের ব্যয় এক হাজার ৩৬২ কোটি টাকা এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের ড্রেনেজ উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় এক হাজার ৬২০ কোটি টাকা।
স্থানীয়রা জানান, ভারী বৃষ্টিতে মঙ্গলবার সকাল থেকে জলাবদ্ধতা শুরু হয়। বিভিন্ন এলাকায় এক থেকে চার ঘণ্টা পর্যন্ত পানি জমে ছিল। বেলা ৩টার দিকে পানি নামতে শুরু করে।
সরেজমিন ও খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নগরের প্রবর্তক মোড়, মুরাদপুরের শুলকবহর, চকবাজার কাঁচাবাজার, কাপাসগোলা, কাতালগঞ্জ, জিইসি মোড়, ঝাউতলা রেললাইন, আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকা, এম এম আলী সড়ক, হালিশহর, মোহরা, রিয়াজউদ্দিন বাজার, পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকা এবং আগ্রাবাদের রঙ্গিপাড়া এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। কোথাও হাঁটুসমান, কোথাও কোমরসমান পানি জমে। এসব এলাকার সড়ক, দোকানপাট, ঘরবাড়ি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তলিয়ে যায়।
দুপুরে রিয়াজউদ্দিন বাজারে গিয়ে দেখা যায়, দোকানিরা ও কর্মচারীরা দোকানের ভেতরের পানি সরাচ্ছেন। এটি নগরের অন্যতম বড় পাইকারি বাজার। এখানে অন্তত ১০০টি দোকান পানিতে তলিয়ে যায়।
প্রবর্তক মোড়ে দেখা যায়, মূল সড়কে বুকসমান পানি জমে আছে। লোকজন রিকশায় চলাচল করলেও আটকে ছিল অন্য যানবাহন। একই চিত্র দেখা যায় মুরাদপুরের মুহাম্মদপুর ও শুলকবহর এলাকায়। দুপুর ১২টার দিকে কাতালগঞ্জ এলাকায় সড়কে কোমরসমান পানি দেখা যায়। ডুবে যায় বিভিন্ন ভবনের নিচতলা।
ভারী বর্ষণ ও জলাবদ্ধতার কারণে সড়কে যানবাহনের সংখ্যা কমে যায়। মুরাদপুর, চকবাজার, প্রবর্তক এলাকায় মাত্রাতিরিক্ত যানজটে ভোগান্তিতে পড়েন নগরবাসী। এ সুযোগে চালকেরা অতিরিক্ত ভাড়া দাবি করেন। নিরুপায় হয়ে যাত্রীদের বাড়তি ভাড়া দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে হয়। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন স্কুলগামী শিশু-কিশোর ও তাদের অভিভাবকেরা।

নগরের কাতালগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা ওমর ফারুক জানান, তার সন্তান পাঁচলাইশ এলাকার একটি স্কুলে পড়ে। প্রতিদিন রিকশাভাড়া ৬০ টাকা হলেও বৃষ্টির কারণে রিকশা পাওয়া যায়নি। পরে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় যেতে ১৬০ টাকা ভাড়া দিতে হয়েছে, যেখানে স্বাভাবিক ভাড়া ১০০ টাকা। সন্তানকে স্কুলে নামিয়ে দিয়ে অফিসে যেতে আরও ৩০ টাকা অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে হয়েছে।
প্রবর্তক এলাকার বাসিন্দা শাহেদ ইসলাম বলেন, ‘বাসা থেকে অফিসে যাওয়ার পথে তিন জায়গায় জলাবদ্ধতায় আটকে পড়েন। পরে সাত থেকে আট কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ ঘুরে অফিসে পৌঁছাতে হয়, এতে প্রায় এক ঘণ্টা দেরি হয়।’
মঙ্গলবার সন্ধ্যার দিকে নগরীতে বৃষ্টির পরিমাণ কমে এলেও রাতভর মেঘাচ্ছন্ন থাকে আকাশ। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, মঙ্গলবার বিকেল ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত চট্টগ্রামে মাত্র ১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী ২৪ ঘণ্টাসহ পরবর্তী ৪-৫ দিন চট্টগ্রামে বৃষ্টির এই প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে। তবে মাঝে কিছুটা বিরতি দিয়ে আগামী বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার বৃষ্টির তীব্রতা আরও বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত জারি থাকায় নিরাপত্তার স্বার্থে উপকূলীয় অঞ্চলের কার্যক্রম এবং নৌযান চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে।
জলাবদ্ধতার ব্যাপারে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রধান প্রকৌশলী আহমেদ আনোয়ারুল নজরুল বলেন, বৃষ্টির মধ্যেও শহরের অভ্যন্তরীণ ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং স্থাপিত সুইস গেটগুলোর অবস্থা স্বাভাবিক রয়েছে। ড্রেনগুলোতে পানির প্রবাহ ঠিক আছে এবং বিভিন্ন স্থানে পানির স্তর বিপদসীমার নিচে রয়েছে।
‘প্রবর্তক মোড়, কাতালগঞ্জ ও মুরাদপুর এলাকার জলাবদ্ধতার বিষয়টি তারা জানেন’ উল্লেখ করে এই কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রবর্তক মোড়ে ড্রেন উন্নয়নকাজ চলায় অস্থায়ী বাঁধ দেওয়া হয়েছে, যা পানির প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করেছে। ফলে প্রবর্তক ও পার্শ্ববর্তী কাতালগঞ্জ এলাকায় সাময়িক পানি জমেছে। তবে মুরাদপুরের পরিস্থিতি নিয়ে আমি অবগত নই’।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ইখতিয়ার উদ্দীন আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘প্রবর্তক এলাকায় সিডিএর জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের কাজ চলমান থাকায় পানি চলাচল সাময়িকভাবে ব্যাহত হয়েছে। নিচু এলাকাগুলোতে পানি জমলেও ধীরে ধীরে তা নেমে যাচ্ছে।’


