ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধ করতে চীনের সহায়তা প্রয়োজন হবে না বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। স্থানীয় সময় মঙ্গলবার তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘এখনই শি জিনপিংয়ের সহযোগিতা নেওয়ার কোনো প্রয়োজন আমি দেখছি না।’
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়, বুধবার বহুল প্রতীক্ষিত বেইজিং সফরে যাচ্ছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘ইরান ইস্যুতে আমাদের অন্য কারও সাহায্য লাগবে বলে আমি মনে করি না। শান্তিপূর্ণভাবে হোক বা অন্য কোনোভাবে, আমরা জিতবই।’
বার্তা সংস্থা এপির প্রতিবেদনে বলা হয়, চীনের উদ্দেশে মেরিল্যান্ডের জয়েন্ট বেজ অ্যান্ড্রু ছাড়ার আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন।
এ সময় তিনি বলেন, ‘আমরাই দুই পরাশক্তি। সামরিক শক্তির দিক থেকে আমরাই পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ। যুক্তরাষ্ট্রের পর চীনকে দ্বিতীয় শক্তিধর হিসেবে বিবেচনা করা হয়।’
‘আমাদের আলোচনার জন্য অনেক বিষয় রয়েছে। সত্যি বলতে, ইরানকে আমি প্রধান আলোচ্য বিষয় বলব না। কারণ ইরানকে আমরা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রেখেছি।’
সফরের আগেও চীনের প্রতি নমনীয় না হওয়া এবং ইরানের প্রতি কঠোর অবস্থান ধরে রাখা হিতে বিপরীত হতে পারে শঙ্কা জানিয়েছেন বিশ্লেষকরা।
তারা বলছেন, ইরান দীর্ঘদিন ধরে চীনের ঘনিষ্ঠমিত্র। এমনকি পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে বেইজিং বহুবছর ধরে তেহরানের তেল কিনছে।
গত সপ্তাহেই বেইজিং সফর করেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। এমন পরিস্থিতিতে ইরানি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মধ্যস্থতায় চীন সরকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারতো।
কাজেই ট্রাম্প প্রশাসন বেইজিংয়ের দ্বারস্থ না হলে তেহরানের সঙ্গে স্থায়ী শান্তিচুক্তির আশা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে পড়বে। পাশাপাশি তেহরানও দিনকে দিন হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করেছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, হরমুজ ও ইরানের বন্দরে মার্কিন অবরোধ থাকায় ইরানের খুব বেশি ক্ষতি হচ্ছে না বলেই মনে হচ্ছে। এরইমধ্যে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনে ইরানের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি করেছে ইরাক ও পাকিস্তান।
জ্বালানির সংকটে থাকা অন্য দেশগুলোও তেহরানের সঙ্গে একই ধরনের চুক্তির সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে। ফলে হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ দীর্ঘমেয়াদে স্বাভাবিক ও স্থায়ী রূপ পেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসন মঙ্গলবার জানিয়েছে, কোনো দেশ (ইরান) যেন হরমুজের জলপথ ব্যবহারকারী জাহাজের কাছ থেকে অতিরিক্ত টোল আদায় করতে না পারে সে বিষয়ে গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা একমত হয়েছিলেন।
ট্রাম্পের বেইজিং সফরের আগে বিষয়টি চীন সরকারকে মনে করিয়ে দিতেই ফের দুই দেশের ঐকমত্য তুলে ধরল ওয়াশিংটন। অবশ্য ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখা এবং তাদের তেলের বড় ক্রেতা হিসেবে পরিচিত চীন এখনো ট্রাম্প প্রশাসনের বক্তব্যের বিরোধিতা করেনি।

কূটনৈতিক বোদ্ধারা বলছেন, আগামী বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে ট্রাম্প ইরান যুদ্ধ নিয়ে আলোচনা করবেন। ধারণা করা হচ্ছে, তিনি বেইজিংকে তেহরানের ওপর প্রভাব খাটিয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সমঝোতায় আনতে উৎসাহিত করবেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান দাবির মধ্যে রয়েছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করা, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ইরানের বাইরে স্থানান্তর (বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রে ফিরিয়ে নেওয়া) এবং হরমুজ প্রণালির ওপর তেহরানের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রত্যাহার করা।
যুক্তরাষ্ট্রের এমন দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ইরানও পাল্টা কিছু দাবি জানিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে- যুদ্ধজনিত ক্ষতিপূরণ, ইরানের বন্দরে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ প্রত্যাহার এবং লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ করা।
তবে ইরানের এই প্রস্তাবকে ‘আবর্জনা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ব্যয় বাড়তে থাকলেও তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের অর্থনৈতিক কষ্ট তার ইরাননীতি বা যুদ্ধবিষয়ক সিদ্ধান্তে কোনো প্রভাব ফেলছে না।
এক সাংবাদিক জানতে চান, সাধারণ আমেরিকানদের অর্থনৈতিক চাপ তাকে ইরানের সঙ্গে সমঝোতার দিকে যেতে কতটা প্রভাবিত করছে। জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘একটুও না।’
চীনের উদ্দেশে হোয়াইট হাউস ত্যাগ করার আগে ট্রাম্প বলেন, ‘ইরান প্রসঙ্গে আমি শুধু একটি বিষয় নিয়েই ভাবি- তারা যেন কখনো পারমাণবিক অস্ত্র না পায়। আমি আমেরিকানদের আর্থিক অবস্থা নিয়ে ভাবি না। আমি কারও কথা ভাবি না। আমি শুধু একটি বিষয় ভাবি- ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র পেতে দেওয়া যাবে না।’
পেন্টাগন জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত যুদ্ধের ব্যয় দাঁড়িয়েছে ২৯ বিলিয়ন ডলার, যা গত মাসের শেষের হিসাবের তুলনায় চার বিলিয়ন ডলার বেশি। এক কর্মকর্তা আইনপ্রণেতাদের বলেন, নতুন হিসাবের মধ্যে সামরিক সরঞ্জাম মেরামত, প্রতিস্থাপন ও অভিযান পরিচালনার ব্যয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।


