দেশের সর্ব উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ের সীমান্তবর্তী উপজেলা তেঁতুলিয়ার শালবাহান যুগিগছ গ্রাম। তিন যুগেরও বেশি সময় আগে যেখানে তেল খনির খবর ঘিরে সরগরম ছিল পুরো দেশ। দেশি-বিদেশি কোম্পানির আনাগোনা, হেলিকপ্টারে বিশেষজ্ঞদের যাতায়াত, কোটি টাকার প্রকল্প সবকিছুতেই ছিল স্বপ্নের হাতছানি। জমি অধিগ্রহণ, বস্তি সরিয়ে কাঁটা তারের বেড়া দিয়ে সীমানা নির্ধারণ এবং মহাসমারোহে ভারী খনন উপকরণ নিয়ে কাজ শুরু সেই দৃশ্যপট অবহেলিত এই জনপদকে বর্ণিল করে তোলে। কিন্তু উদ্বোধনের মাত্র এক সপ্তাহের মাথায় রহস্যজনকভাবে বন্ধ হয়ে যায় সেই তেল খনি। ৩৮ বছর পেরিয়ে গেলেও আজও রহস্যের জট খুলেনি।
১৯৮৭ সালে ভূকম্পন জরিপে শালবাহান এলাকায় তেলের সম্ভাবনার সন্ধান পাওয়া যায়। পরের বছর ১৯৮৮ সালের ১০ মে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সরেজমিনে গিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন খনন কার্যক্রম। সে সময় প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় শতকোটি টাকা। দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমেও ব্যাপক প্রচার হয় সম্ভাবনাময় এই তেল খনির খবর।
জানা গেছে, প্রায় ৮ হাজার ফুট গভীর থেকে তেল উত্তোলনের পরিকল্পনা ছিল। খনন কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয় ফ্রান্সের একটি কোম্পানিকে। বিদেশি প্রকৌশলী ও বিশেষজ্ঞরা ঢাকার অভিজাত হোটেল থেকে হেলিকপ্টারে করে নিয়মিত আসা-যাওয়া করতেন। খনিকে ঘিরে নেওয়া হয় কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা। স্থানীয় অনেক মানুষ সেখানে শ্রমিক, রাজমিস্ত্রি ও নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন।
কিন্তু আশার আলো জ্বালিয়ে হঠাৎ করেই থেমে যায় সবকিছু। উদ্বোধনের এক সপ্তাহের মধ্যেই বন্ধ হয়ে যায় তেল খনির কার্যক্রম। সংশ্লিষ্ট বিদেশি কোম্পানিও রাতারাতি গুটিয়ে নেয় তাদের সব কার্যক্রম। কেন বন্ধ করা হলো, তার কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা আজও পাওয়া যায়নি।
সেসময় খনন কাজের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন এমন অনেকেই এখন বয়সের ভারে ন্যুব্জ। তাদের স্মৃতিতে এখনো স্পষ্ট সেই সময়ের কর্মচাঞ্চল্য।
স্থানীয়দের মধ্যে রয়েছে নানা আলোচনা ও সন্দেহ। কেউ কেউ বলছেন, একই কোম্পানি ভারতের জলপাইগুড়ি এলাকায় গিয়ে খনন চালায়। এমন ধারণা আছে, সেখান থেকেই তেল উত্তোলন চলছে।
খনিটি পুনরায় চালুর দাবিতে কয়েক মাস ধরে মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচিও পালন করছেন স্থানীয়রা। তাদের প্রত্যাশা, শুধু রহস্য উন্মোচন নয়, পুনরায় চালু হোক এই খনি। এটি চালু হলে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও তেলের ঘাটতি পূরণসহ বদলে যাবে এই জেলার কৃষি অর্থনীতি।
সীমান্ত জনপদ তেঁতুলিয়ার শালবাহানে তেল ও গ্যাসের সম্ভাবনা নিশ্চিত হওয়ার পরও অদৃশ্য কালো থাবায় হঠাৎ করে তা বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ তিন যুগ পার হয়ে গেলেও অজানা রহস্য, তেল আছে, নাকি হারিয়ে গেছে ইতিহাসের কোন ষড়যন্ত্রে? খনি ঘিরে এই প্রশ্ন দানা বেঁধে উঠেছে মানুষের মধ্যে।
দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা খনির জায়গায় এখন গড়ে উঠেছে বসতবাড়ি। তবে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে এখনো রয়ে গেছে সিমেন্ট দিয়ে ঢেকে দেওয়া সেই তেল কূপের মুখ। এখনো প্রায় প্রতিদিনই দেশের নানা প্রান্ত থেকে দেখতে আসেন মানুষ।
বসতবাড়ির মালিক ইউসুফ বলেন, ‘আমি নিজেও এখানে তেল খনি থেকে তেল উত্তোলন হতে দেখেছি। ১৯৮৮ সালে উদ্বোধন হওয়ার পরপরই খনিটি বন্ধ হয়ে যায়। আমি পরে ২০০০ সালে এখানে বাড়ি করে বসবাস করছি। সরকার যদি আবারও এই খনিটি অনুসন্ধান করে চালুর উদ্যোগ নেয়, তাহলে আমি দেশের স্বার্থে বাড়িটি সরিয়ে নেব। তবুও চাই এটি চালু হোক। নানা প্রান্ত থেকে এটি দেখতে আসে মানুষ। গ্রামটির নামই হয়ে গেছে তেল কোম্পানি নামে।’
এ বিষয়ে শালবাহান এলাকার হুসেন আলী বলেন, ‘খনিটি যখন চালু ছিল আমি তখন খনিতে রাজমিস্ত্রি হিসেবে কাজ করেছি। স্থানীয় আমরা অনেকে কাজ করতাম। হঠাৎ কি কারণে খনিটি বন্ধ হলো আমরা জানতে পারিনি। সরকারের কাছে দাবি খনিটি যেন আবারও চালু করা হয়।’
স্থানীয় আবদুল মোতালেব বলেন, ‘যখন তেল খনি উদ্বোধন হয় ১৯৮৮ সালে, তখন আমরা ছোট ছিলাম। প্রেসিডেন্ট এরশাদ নিজে এসে খনিটি উদ্বোধন করেন। তেল উত্তোলনও হয়েছিল কিন্তু হঠাৎ কী কারণে বন্ধ হলো, আমরা জানি না। ভারত যদি ওপারে তেল উত্তোলন করে, আমরা কেন পারব না।’
এ বিষয়ে তেঁতুলিয়া সচেতন নাগরিক কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট মনোয়ার হোসেন হানিফ বলেন, ‘শালবাহান তেল খনিটি উদ্বোধনের এক সপ্তাহের মধ্যে কেন বন্ধ হলো, কী কারণে বন্ধ হলো, এই রহস্য আজও আমরা জানতে পারিনি। এখানে তেল ছিল, সে সময়ে আমরা নিজেই দেখেছি। তাই সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি, আবারও যেন এই খনিটি চালু করা হয়। আমরা জানতে চাই, তেল আছে কি না এবং কী কারণে হঠাৎ বন্ধ করা হয়েছে খনিটি।’
জেলার সোশ্যাল অ্যাক্টিভিস্ট ও আইনজীবী আহসান হাবীব সরকার বলেন, ‘শালবাহান তেল খনিটি সেই সময়ে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট এরশাদ নিজে এসে উদ্বোধন করে যান। উদ্বোধনের এক সপ্তাহের মধ্যে বন্ধ হয়ে যায়। আমরা সরকারের কাছে দাবি জানাব, যেহেতু এটি দেশের অর্থনৈতিক বিষয় জড়িত, তাই দেশের স্বার্থে আবারও খনি এলাকায় অনুসন্ধান চালানো হোক। এই খনি পুনরায় চালু করা গেলে দেশের জ্বালানি খাতে বড় ধরনের অবদান রাখতে পারে।
তেঁতুলিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আফরোজ শাহীন খসরু বলেন, ‘খনিটির সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের চিঠি পাঠানো হবে।’


