দুই কোটি টাকা চাঁদা না পেয়ে চট্টগ্রামের চকবাজারে ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল ডট নেট (ডিডিএন) কার্যালয়ে সংঘবদ্ধ হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় করা মামলায় আরও নয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব।
শনিবার দুপুরে চট্টগ্রামের চান্দগাঁওয়ে র্যাব-৭ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান র্যাব-৭-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন- মাইকেল রোহেন মিয়া প্রকাশ মাইকেল (৩১), মো. তুহিন (২২), আকবর হোসেন (৩৮), মো. আব্দুল মুমিন (৩০), মো. মাসাদ মিয়া (২৭), মো. দিদার মিয়া (২২), মো. সানজাত হাসান (১৮), সৈরত হোসেন (১৮) এবং মো. সাইফুদ্দিন (৩২)।
এ সময় তাদের কাছ থেকে হামলায় ব্যবহৃত চারটি দেশি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়।
র্যাব জানায়, গত ১১ জুলাই ডিডিএনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আদিল বিন মামুনের কাছে হোয়াটসঅ্যাপে দুই কোটি টাকা চাঁদা দাবি করেন ডেভিড ইমন ওরফে মোবারক হোসেন ইমন। চাঁদা না দেওয়ায় দুই দিন পর, ১৩ জুলাই তার নির্দেশে পরিকল্পিতভাবে হামলা চালানো হয়। হামলার সমন্বয়ের দায়িত্বে ছিলেন মাইকেল, সানি ও রাজু। তারা নগরের বিভিন্ন এলাকা থেকে ভাড়াটে সন্ত্রাসী জড়ো করে বাকলিয়ায় পাঠান।
র্যাবের তদন্তে উঠে এসেছে, হামলার দিন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বহদ্দারহাট এলাকায় হামলায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের নিয়ে একটি বৈঠক হয়। গ্রেপ্তার হওয়া মাইকেলের মোবাইল ফোনে পাওয়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, তিনি হামলার আগে অংশগ্রহণকারীদের কীভাবে অভিযান পরিচালনা করতে হবে, সে বিষয়ে নির্দেশনা দিচ্ছেন। এরপর সন্ত্রাসীরা কয়েকটি অটোরিকশায় ভাগ হয়ে বাকলিয়ার দিকে যায়। একটি দল অফিসের বাইরে অবস্থান নিয়ে নজরদারির দায়িত্ব পালন করে। অন্য দলটি সরাসরি ডিডিএনের কার্যালয়ে ঢুকে হামলা চালায়। এ সময় প্রায় ৩৫ লাখ টাকা লুট করা হয় এবং অফিসে ব্যাপক ভাঙচুর চালানো হয়।
র্যাবের তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার পরপরই অভিযান শুরু হয়। ১৪ জুলাই পুলিশ ছয়জন এবং র্যাব দুজনকে গ্রেপ্তার করে। পরে ১৮ জুলাই বিকেল থেকে ১৯ জুলাই ভোর পর্যন্ত আলাদা অভিযানে র্যাব আরও নয়জন এবং পুলিশ আরও চারজনকে গ্রেপ্তার করে। সব মিলিয়ে এ ঘটনায় গ্রেপ্তার হয়েছেন ২১ জন।
তবে সিএমপির সহকারী কমিশনার আমিনুর রশীদ বলেন, ‘হামলার ঘটনায় ব্যবহৃত গাড়ি এবং সেই গাড়ির চালককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকি তিনজনকে গ্রেপ্তার করা নিয়ে আমার কাছে তথ্য নেই।’
সংবাদ সম্মেলনে র্যাব অধিনায়ক জানান, ডেভিড ইমনের অবস্থান সম্পর্কে তাদের ‘মোটামুটি ধারণা’ রয়েছে। তবে কৌশলগত কারণে এখনই তা প্রকাশ করা হচ্ছে না।
তিনি বলেন, ‘ইমনের নামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেসব অডিও বার্তা প্রচার করা হচ্ছে, সেগুলো সরাসরি পাঠানো নয়; আগে থেকেই রেকর্ড করা এবং বিদেশি নম্বর ব্যবহার করে সেগুলো ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ডেভিড ইমন নিজেকে নির্দোষ দাবি করার বিষয়ে জানতে চাইলে হাফিজুর রহমান বলেন, ‘তার বড় একটি নেটওয়ার্ক ধরা পড়েছে। এখন সে নিজেকে বাঁচানোর জন্য নাটক করছে। অথচ এর আগে সে নিজেই প্রকাশ্যে হুমকি দিয়েছিল, তার কথা না শুনলে ব্যবসা করা যাবে না।’
মূল পরিকল্পনাকারী ছয় দিনেও গ্রেপ্তার না হওয়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যর্থতা কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে র্যাব অধিনায়ক বলেন, ‘ঘটনার ছয় দিনের মধ্যে সরাসরি জড়িত ২১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এটাকে ব্যর্থতা বলা যায় না। আমরা মূল আসামিকেও গ্রেপ্তারে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।’
সন্ত্রাসীরা জামিনে বের হয়ে আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ার বিষয়ে আলোকপাত করা হলে তিনি বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করে আসামিদের গ্রেপ্তার করে। তবে জামিন দেওয়া আদালতের এখতিয়ার।’ সংঘবদ্ধ অপরাধে জড়িতদের ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থান নেওয়া হলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ আরও সহজ হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বড় সাজ্জাদ ও ডেভিড ইমনের মতো কথিত সন্ত্রাসী গডফাদারদের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে র্যাব অধিনায়ক বলেন, ‘বড় সাজ্জাদ বহু বছর ধরে দেশে নেই। অনেকেই তার নাম ব্যবহার করে নিজেদের প্রভাবশালী হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। ডেভিড ইমনও বিদেশে অবস্থান করে ভয়ভীতি তৈরির চেষ্টা করছে।’
‘সে যদি এতই বড় গডফাদার হতো, তাহলে দেশে থাকত। দেশে থাকলে তাকেও আমরা গ্রেপ্তার করতাম’, যোগ করেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান।
তিনি আরও জানান, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের কাছ থেকে হামলার সময় ব্যবহৃত চারটি দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া পলাতক ডেভিড ইমনসহ অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
গত ১৩ জুলাই বেলা সাড়ে ১১টার দিকে প্রায় ২০ থেকে ২৫ জন অস্ত্রধারী ব্যক্তি বাকলিয়ার মরিয়ম হাইটস ভবনে অবস্থিত ডিডিএনের কার্যালয়ে ঢুকে হামলা চালায়। হামলাকারীরা অফিসে ভাঙচুর, লুটপাট করে। পরে এ ঘটনায় চকবাজার থানায় মামলা করা হয়।


