জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রতীক শহীদ আবু সাঈদ দুই হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছেন, হাতের লাঠিতে একটি গিরগিটি। এক কাঁধে অস্ত্রধারী ধূসর মানুষের মারামারি, মদপানরত হেলমেটধারী চরিত্র ও খুলির স্তূপ; অন্য কাঁধে সাদা পাঞ্জাবি পরা ব্যক্তি টাকার বস্তায় বসা। নিচে দানবাকৃতির চরিত্র, হিংসাত্মক ভাষা, সহিংসতা ও ঝুলন্ত নারীর অবয়ব।
তবে আবু সাঈদের চোখে বিজয়ের আনন্দ নেই, আছে ক্লান্তি ও বিব্রতবোধ। যেন তিনি নিজেই প্রশ্ন করছেন—আত্মত্যাগের বিনিময়ে কী অর্জিত হলো? তার কাঁধে চেপে বসেছে নতুন বাস্তবতার ভার—ক্ষমতার দখলদারিত্ব, মব সহিংসতা, চাঁদাবাজি, মামলা বাণিজ্য, অর্থের প্রভাব, সুবিধাবাদ, নারী নির্যাতন, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ও অপূর্ণ প্রতিশ্রুতি।
ইংরেজি দৈনিক নিউ এজ-এর কার্টুনিস্ট মেহেদী হকের এই কার্টুন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র বিতর্ক চলছে। সমালোচকদের দাবি, এটি আন্দোলনের চেতনাকে আঘাত করেছে। তবে মেহেদী হকের দাবি, উদ্দেশ্য কোনো শহীদকে ব্যঙ্গ করা নয়, বরং তার আত্মত্যাগের পর তৈরি হওয়া রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করানো।
টাইমস অব বাংলাদেশ’কে তিনি বলেন, ‘এখানে আবু সাঈদকে পুঁজি করে সুবিধাবাদী মহল যেভাবে আখের গোছাচ্ছে, আর আবু সাঈদ সেটা করুণ চোখে দেখছে—তা-ই আঁকা হয়েছে। বরং কারা কিভাবে তাকে অবমাননা করছে, সেটিই ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।’
এর আগে জুলাই মাসকে প্রতীক করে মোটা চরিত্রের পোশাকে ‘জুলাই’ লিখে আরেকটি কার্টুন এঁকেও বিতর্কে পড়েন মেহেদী। তখনো তার বিরুদ্ধে আন্দোলনকে বিদ্রূপের অভিযোগ ওঠে। কিন্তু মেহেদী বলেন, ‘কার্টুনটি আন্দোলনকে ছোট করেনি; বরং এর পরের চুরি, ডাকাতি, মব সহিংসতা, চাঁদাবাজি, মামলা-বদলি বাণিজ্য ও অর্থপাচারের বাস্তব ঘটনাগুলোকে প্রতীকে তুলে ধরেছে। এটি কেবল জুলাই-পরবর্তী সময়ের চিত্র।’
এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে, দেশে রাজনৈতিক কার্টুনের গ্রহণযোগ্যতার সীমা কতটুকু? ক্ষমতার পরিবর্তনে কি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মানদণ্ডও বদলে যায়?
প্রসঙ্গত, ২০২৬ সালের রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস (আরএসএফ) ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে বাংলাদেশ ৩ ধাপ পিছিয়ে ১৫২তম হয়ে ‘অত্যন্ত উদ্বেগজনক’ শ্রেণিতে নেমে গেছে।
মেহেদী হক ২০০৩ সাল থেকে কার্টুন আঁকছেন। দুই দশকে দেশের সব গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা ও ক্ষমতার কেন্দ্রকে তিনি ব্যঙ্গচিত্রের বিষয় বানিয়েছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নির্বাচন, ভোটব্যবস্থা, প্রশাসন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে তিনি নিয়মিত আঁকেন।
২০১৪ সালের নির্বাচনের পর ব্যালট বাক্সকে ‘আলাদিনের চেরাগ’ ও সিইসিকে জিন বানানো, ২০১৮ সালের নির্বাচনের নৌকা ও ভোটব্যবস্থা এবং ২০২৩ সালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে জর্জ অরওয়েলের ‘বিগ ব্রাদার’ প্রতীকে কার্টুন এঁকেছিলেন তিনি।
এছাড়া সংসদকে কেক কাটা, ডিবির তৎকালীন প্রধান হারুনকে নুডলসের বাটি হাতে দেখানো কিংবা ‘কার্টুনে বিদ্রোহ’ প্রদর্শনীতে স্বৈরাচারের পালানোর পেছনে ‘মুক্তিযুদ্ধ’ লেখা দাবার গুটি ফেলে রাখার কার্টুনগুলো ব্যাপক আলোচিত হয়।
ক্ষমতার পরিবর্তনের পরও তার ধারা বদলায়নি। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে ফেরা, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও উপদেষ্টামণ্ডলী, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী—এমনকি নিউ এজ-এর সম্পাদক নূরুল কবীরকে নিয়েও তিনি কার্টুন এঁকেছেন। অর্থাৎ, ব্যক্তি নয়, ক্ষমতা ও রাজনৈতিক বাস্তবতাই ছিল তার বিষয়।
অথচ আগে যাকে অনেকে নির্ভীক ও বাকস্বাধীনতার প্রতীক ভাবতেন, জুলাই-পরবর্তী বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন তোলায় এখন তিনিই একাংশের কাছে ‘দালাল’ বা ‘বিক্রি হওয়া’ শিল্পী।
মেহেদী হক আক্ষেপ করে বলেন, ‘৫ আগস্টের পর ঘৃণা ও বিভাজনের রাজনীতি বহুগুণ বেড়েছে।’ ট্যাগিংয়ের শঙ্কা নিয়ে তিনি বলেন, ‘শিল্প ও সুরুচির বিরুদ্ধে পরিকল্পিত বিষোদগার চলছে। আক্রমণকারীরা মূলত ভীত ও সাময়িক ছদ্ম-ক্ষমতাভোগী, যাদের কোনো গণভিত্তি নেই।’
মেহেদী হক এই কার্টুনটি এঁকেছিলেন ২০২৫ সালের ৫ আগস্ট। তখন এনিয়ে খুব একটা উচ্চবাচ্য ছিলনা। তবে গত জুলাই মাসে জাতীয় নাগরিক পার্টির আহবায়ক নাহিদ ইসলামের ভুরিতে জুলাই লেখা কার্টুন আঁকার পরই আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হন এই কার্টুনিস্ট।
এরপরই এক বছরের পুরনো কার্টুন টেনে এনে এর তীব্র সমালোচনা করেন প্রেস ইন্সটিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআইবি) মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফ। ফেসবুকে তিনি লেখেন, ‘এ কার্টুনে জুলাই ও জুলাইয়ের হিরো শহীদ আবু সাঈদকে অপদস্থ করা হয়েছে।’
অথচ বিগত সরকারের আমলে লেখক মুশতাকের মৃত্যু ও কার্টুনিস্ট কিশোরের কারাবাসের সময় ফারুক ওয়াসিফই শহীদ মিনারে ‘জান ও জবানের স্বাধীনতা চাই’ সমাবেশের ডাক দিয়েছিলেন। হঠাৎ এমন প্রতিক্রিয়ার প্রশ্নে তিনি টাইমস’কে বলেন, ‘মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সীমা ঘৃণাবিদ্বেষ প্রচারের আগপর্যন্ত। কার্টুন কোনো ধর্মগ্রন্থ নয়, এর সমালোচনা বা ভিন্ন ব্যাখ্যা হতেই পারে।’
তিনি সতর্ক করেন, ‘কচুরিপানার মতো নাগরিকদেরও সবসময় স্বাধীনতার ওপর পাহারা দিতে হবে।’
ফলে, জুলাই অভ্যুত্থানের যে বাকস্বাধীনতার জন্য রক্ত ঝরল, তা ক্ষমতাকাঠামোয় আবার সংকুচিত হওয়ার মুখে।
অন্যদিকে অ্যাক্টিভিস্ট বাকী বিল্লাহ ভিন্ন মত দিয়ে বলেন, ‘মেহেদী হকরা শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে শুধু ২০২৪ সালের জুলাইয়ে নয়, বহু আগে থেকেই নির্ভয়ে কথা বলেছেন। লক্ষ্য ছিল এমন পরিবেশ, যেখানে সবাই ভয়হীন লিখতে ও আঁকতে পারবে।’
তার প্রশ্ন, ‘যে স্বাধীনতার জন্য এত দীর্ঘ সংগ্রাম, সেটিই যদি প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তবে আন্দোলনের মৌলিক চেতনা কোথায় দাঁড়ায়?’
একসময় যেভাবে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ দিয়ে ভিন্নমত কোণঠাসা করা হতো, এখন কি একইভাবে ‘জুলাইয়ের চেতনা’ ব্যবহার হচ্ছে? এমন প্রশ্নের জবাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সাইফুল আলম চৌধুরী টাইমস’কে বলেন, ‘কার্টুন ও সাংবাদিকতায় নিয়ন্ত্রণের প্রবণতা দূর হয়নি। ৫ আগস্টের পর রাষ্ট্রীয় চাপের একটি অংশ এখন সামাজিক মাধ্যমের ‘মব’-এর হাতে গেছে। ৫ আগস্টের সময় প্রশংসিত মেহেদী এখন সমালোচনা করায় শত্রু বনে যাচ্ছেন। অথচ একটি শক্তিশালী কার্টুন শত সংবাদের চেয়েও প্রভাবশালী।’
ক্ষমতা ও মতপ্রকাশ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘পক্ষে গেলে ঠিক, বিপক্ষে গেলেই অফ-লিমিট—এই সংস্কৃতিই সমস্যা। আগে যিনি স্বাধীন মতপ্রকাশের প্রতীক ছিলেন, পরে সমালোচনার কারণে তাকে স্বাধীনতাচ্যুত করার চেষ্টা দ্বিচারিতা ছাড়া কিছু নয়।’


