বাংলাদেশের ক্ষমতা, রাজনীতি এবং রাষ্ট্রীয় বৈধতা স্বাধীনতার পর থেকেই মুক্তিযুদ্ধ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়েছে। তবে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবারই এই যুদ্ধের ব্যাখ্যা ও উদযাপনের ধরন বদলে গেছে। এর সর্বশেষ উদাহরণ ২০২৪ সালের জুলাই মাসের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়কাল। ওই বছরের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বের ভূমিকা এবং এর চেতনাগত অবস্থান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তোলা হয়। এই পরিবর্তনের প্রভাব জাতীয় দিবস উদযাপনেও পরিলক্ষিত হয়েছে। তবে গত দুই বছরের মলিনতা কাটিয়ে এবার দেশজুড়ে মহান স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের জন্য বিস্তৃত ও বহুমাত্রিক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধ কেবল একটি সামরিক বা রাজনৈতিক ঘটনা নয়। এটি ৩০ লাখ মানুষের আত্মত্যাগ, লাখো নারীর ওপর অমানবিক নির্যাতন এবং এক কোটি মানুষের শরণার্থী হওয়ার সম্মিলিত অভিজ্ঞতায় গড়া এক গভীর মানবিক বাস্তবতা। এই নৈতিক শক্তিই বারবার রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার ও অপব্যবহারের শিকার হয়েছে।
এখানেই রাষ্ট্রচিন্তার মূল দ্বন্দ্বটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বেনেডিক্ট এন্ডারসনের মতে জাতির পরিচয় মূলত একটি নির্মিত বয়ান। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধ সেই বয়ানের কেন্দ্রবিন্দু হলেও তার ব্যাখ্যা সবসময়ই ক্ষমতার সঙ্গে জড়িত ছিল। ১৯৭২ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে রাষ্ট্রগঠন প্রক্রিয়ায় মুক্তিযুদ্ধকে একটি সুসংহত জাতীয় আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা দেখা যায়। তৎকালীন সংবিধানে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার মাধ্যমে রাষ্ট্রকে একটি আদর্শিক ভিত্তি দেওয়া হয়। এই মূলনীতিগুলো সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে সংযুক্ত ছিল।
গবেষকদের মতে স্বাধীনতার পর প্রথম তিন বছরে দেশের অর্থনীতি ছিল অত্যন্ত সংকটাপন্ন। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সময়কালে গড় প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ২ থেকে ৩ শতাংশের মধ্যে। খাদ্য ঘাটতি ও অবকাঠামো ধ্বংসের কারণে রাষ্ট্র তখন দ্রুত কেন্দ্রীভূত সিদ্ধান্তের দিকে ধাবিত হয়।
একই সময়ে ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ অধ্যাদেশ প্রণয়ন এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এটি প্রমাণ করে যে মুক্তিযুদ্ধ কেবল একটি স্মৃতি ছিল না বরং এটি ন্যায়বিচারের একটি প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিও ছিল।
তবে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইন ও ১৯৭৫ সালে বাকশাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বহুদলীয় গণতন্ত্রের অবসান ঘটে। এসব পদক্ষেপ সমালোচকদের কাছে মুক্তিযুদ্ধের গণতান্ত্রিক আদর্শ সংকুচিত হওয়ার উদাহরণ হিসেবে পরিচিত। তখন থেকেই রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার যুক্তির বিপরীতে নৈতিক বৈধতার প্রশ্নটি জটিল হয়ে ওঠে।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড এই ধারাকে সম্পূর্ণ ভিন্ন দিকে নিয়ে যায়। পরবর্তী সামরিক শাসনামলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সরাসরি অস্বীকার করা না হলেও তা নতুনভাবে পুনর্গঠিত হয়। এই পুনর্গঠনের মধ্যেও রাজনৈতিক স্বার্থের ব্যবহার স্পষ্ট ছিল। এ সময় মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির রাজনীতিতে ফিরে আসার সুযোগ তৈরি হয়। অনেক গবেষক একে ‘বাছাই করা স্মৃতির রাজনীতি’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। ক্ষমতার বৈধতা রক্ষার প্রয়োজনে ইতিহাসের কিছু অংশ সামনে আনা হয় এবং কিছু অংশ আড়াল করা হয়। এরশাদের আমলে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করা হয়। এই পদক্ষেপ মুক্তিযুদ্ধের ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শ থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দিলেও উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার বুলি দিয়ে ক্ষমতার গ্রহণযোগ্যতা তৈরির চেষ্টা চলে।
১৯৯০ পরবর্তী গণতান্ত্রিক সময়কাল এই দ্বন্দ্বকে আরও জটিল করে তোলে। প্রায় সব রাজনৈতিক দলই নিজেদেরকে মুক্তিযুদ্ধের ধারক হিসেবে উপস্থাপন করতে চায়। বাস্তবে সেই চেতনার নাম ব্যবহার করেই অনেক বিতর্কিত কর্মকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। সংখ্যালঘু নির্যাতন, জঙ্গিবাদের উত্থান এবং রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা মুক্তিযুদ্ধের বহুত্ববাদী আদর্শের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বাস্তবতা তৈরি করে।
২০০৮ পরবর্তী আওয়ামী শাসনামল এই দ্বৈততার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হয়ে ওঠে। একদিকে যুদ্ধাপরাধের বিচার ও পাঠ্যপুস্তকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি শক্তিশালী বয়ান গড়ে ওঠে। অন্যদিকে মানবাধিকার লঙ্ঘন, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুমের অভিযোগ সামনে আসে। এর ফলে একটি গভীর দ্বৈততা তৈরি হয়। মুক্তিযুদ্ধ একদিকে রাষ্ট্রীয় বৈধতার উৎস হয়ে ওঠে, অন্যদিকে সেই বৈধতার ভাষ্যই সমালোচনার লক্ষ্যবস্তু হয়।
এই প্রক্রিয়ায় ইতিহাস নিজেই একটি প্রতিযোগিতামূলক ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। প্রতিটি সরকার মুক্তিযুদ্ধের চেতনার একচ্ছত্র মালিকানা দাবি করতে চায়। ফলে ইতিহাস স্থির সত্য না হয়ে রাজনৈতিকভাবে পুনর্গঠিত বয়ানে রূপ নেয়। নতুন প্রজন্মের মধ্যে এর সামাজিক প্রতিফলন বিশেষভাবে দেখা যাচ্ছে। তাদের একটি অংশ মুক্তিযুদ্ধকে ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা হিসেবে না দেখে রাজনৈতিক বিতর্ক হিসেবে দেখতে শুরু করেছে। উচ্চ নৈতিক আদর্শ এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার বৈপরীত্য তাদের মনে সন্দেহ তৈরি করছে। যে ইতিহাস একসময় জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল, সেটিই এখন মতাদর্শিক বিভাজনের সূচকে পরিণত হচ্ছে। এই প্রশ্নের উত্তরের মধ্যেই বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তার ভবিষ্যৎ নিহিত রয়েছে। রাষ্ট্র কি মুক্তিযুদ্ধ দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে নাকি রাষ্ট্র নিজের প্রয়োজনে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ব্যবহার করছে তা এখন বড় প্রশ্ন।
এই প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তন ও ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ইতিহাসের বিতর্ককে নতুন মাত্রা দেয়। কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু হওয়া গণঅভ্যুত্থান ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পদত্যাগের মাধ্যমে একটি নাটকীয় পরিণতি পায়। এই আন্দোলন আবারও প্রমাণ করেছে যে, বাংলাদেশে ক্ষমতার পরিবর্তন কেবল নির্বাচনের মাধ্যমে হয় না। রাজনৈতিক সংকট ও গণঅভ্যুত্থানও রাষ্ট্রের গতিপথ নির্ধারণ করে দিতে পারে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আগমন সেই ধারাবাহিকতার অংশ। এই পরিবর্তনের পর ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’ বা ‘স্বাধীনতা ২.০’ নামের একটি নতুন রাজনৈতিক বয়ান সামনে আসে। কেউ একে নতুন যুগের সূচনা বললেও অনেকে একে ইতিহাসের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বী একটি বয়ান নির্মাণের চেষ্টা হিসেবে দেখছেন।
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সংগীতশিল্পী মনোরঞ্জন ঘোষাল এই প্রবণতাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে করেন। তার মতে একটি দেশ দুইবার স্বাধীন হতে পারে না। তিনি বলেন, “আমরা একবারই স্বাধীনতা অর্জন করেছি এবং যুদ্ধের মাধ্যমে বিজয় ছিনিয়ে এনেছি। স্বাধীনতার পর রাজনৈতিক পরিবর্তন বা আন্দোলন হতে পারে কিন্তু সেগুলোকে স্বাধীনতার সমতুল্য বলা ইতিহাসের সঙ্গে অসঙ্গত।”
তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, নতুন বয়ান তৈরির মাধ্যমে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকে আড়াল করার চেষ্টা চলছে। তার বিশ্লেষণে বিষয়টি কেবল মতাদর্শগত নয় বরং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার সঙ্গে সম্পর্কিত। দীর্ঘদিন নিজেদের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করতে না পারা কিছু শক্তি এখন ইতিহাসকে পুনর্ব্যাখ্যার সুযোগ খুঁজছে।
মনোরঞ্জন ঘোষালের বক্তব্যে ইতিহাস ও গণতন্ত্রের সম্পর্কের বিষয়টিও উঠে আসে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, যাকে ইতিহাস রাজাকার হিসেবে চিহ্নিত করেছে সে যদি সংসদে প্রবেশ করে তবে সেটি একটি নৈতিক সংকট। রাজনৈতিক বিরোধিতা কখনো এমন পর্যায়ে পৌঁছানো উচিত নয় যেখানে মানুষ মূল আদর্শ ভুলে গিয়ে বিপরীত শক্তিকে সমর্থন করে। মুক্তিযোদ্ধাদের সামাজিক হেনস্থার প্রসঙ্গ তুলে আক্ষেপ করে তিনি বলেন, যে দেশের জন্য মানুষ জীবন দিয়েছে সেখানে তাদের এমন পরিণতি হবে তা কেউ ভাবেনি।
একই বিতর্ককে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেন শিল্পী কল্যাণী ঘোষ। তার মতে স্বাধীনতা কেবল রাজনৈতিক ঘটনা নয় বরং এটি মানসিক ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার প্রশ্ন। ২০২৪ সালের আন্দোলনের পর এমন এক সামাজিক প্রভাব তৈরি হয়েছে যেখানে নতুন প্রজন্ম ১৯৭১ সালের প্রকৃত ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা এবং সোশ্যাল মিডিয়া নির্ভর তথ্যপ্রবাহ তরুণদের ইতিহাসবোধকে প্রভাবিত করছে। নতুন প্রজন্ম উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিভ্রান্ত হচ্ছে এবং এর ফলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।
তিনি বলেন, এটি কেবল ইতিহাসের সংকট নয় বরং জাতীয় আত্মপরিচয়েরও সংকট। যখন স্বীকৃত হত্যাকারীকেও কেউ কেউ উদযাপন করে তখন সত্য-মিথ্যার সীমারেখা ঝাপসা হয়ে যায়। কল্যাণী ঘোষ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থেকে আলাদা রাখার ওপর জোর দেন। মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান ক্ষুণ্ণ হওয়া বা ইতিহাস বিকৃত হওয়াকে তিনি অত্যন্ত দুঃখজনক বলে উল্লেখ করেন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে রাষ্ট্রীয় কুচকাওয়াজ না হওয়া সমাজে নেতিবাচক বার্তা বহন করে বলেও তিনি মনে করেন।
তবে নির্বাচিত সরকারের অধীনে এবারের স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের রাষ্ট্রীয় আয়োজনে অংশগ্রহণের বৈচিত্র ও গভীরতা অনেক বেশি। আয়োজনের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হিসেবে ফিরে এসেছে ঐতিহ্যবাহী কুচকাওয়াজ।
রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও এবার ব্যাপক ও বর্ণাঢ্য আয়োজনে স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করছে।
সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এক সমন্বিত আয়োজনের মধ্য দিয়ে গৌরবময় ইতিহাস ও শহীদদের আত্মত্যাগকে স্মরণ করছে বাংলাদেশ।


