বিদ্যমান আঞ্চলিক ব্যাপক অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব (আরসিইপি) বাণিজ্য জোটে যোগদানের প্রক্রিয়ায় অস্ট্রেলিয়ার সমর্থন চেয়েছে বাংলাদেশ।
একই সঙ্গে এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা বাড়ানো, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) এবং দ্বিপক্ষীয় শিল্প সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও ক্যানবেরার সঙ্গে আলোচনা করেছে ঢাকা।
অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য দপ্তরে (ডিএফএটি) অনুষ্ঠিত দুটি পৃথক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততা, বাণিজ্য সুবিধা সম্প্রসারণ এবং নতুন শিল্প সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বৃহস্পতিবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আতাউর রহমান খান।
তিনি ডিএফএটির ফার্স্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি রবি কেওয়ালরাম এবং সাউথ অ্যান্ড সেন্ট্রাল এশিয়া ডিভিশনের ফার্স্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি সারা স্টোরির সঙ্গে পৃথক বৈঠকে অংশ নেন।
বৈঠকে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তিনটি বিষয়–আরসিইপিতে যোগদান, স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের সময়সীমা এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও শিল্প সহযোগিতা–নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
আরসিইপি হলো এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের ১৫ দেশের একটি বিদ্যমান মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি, যা ২০২২ সালের ১ জানুয়ারি কার্যকর হয়। এতে আসিয়ানের ১০ সদস্য দেশের পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়া, চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও নিউজিল্যান্ড রয়েছে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এই বাণিজ্য জোট বৈশ্বিক জিডিপির প্রায় ৩০ শতাংশ এবং বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জনসংখ্যাকে যুক্ত করেছে।
চুক্তিটির লক্ষ্য হলো সদস্য দেশগুলোর মধ্যে পণ্য ও সেবা বাণিজ্যের বাধা কমানো, বিনিয়োগ বাড়ানো এবং আঞ্চলিক সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা।
বাংলাদেশ মনে করছে, প্রায় ১৭ কোটি মানুষের বাজার নিয়ে এই জোটে যুক্ত হতে পারলে দক্ষিণ এশিয়াকে পূর্ব এশিয়া ও আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে দেশটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করতে পারবে। তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, ওষুধ, কৃষিপণ্য ও হালকা প্রকৌশল খাতে বড় আঞ্চলিক বাজারে প্রবেশের সুযোগও বাড়তে পারে।
বাংলাদেশ ইতিমধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে আরসিইপি অ্যাকসেশন প্রশ্নমালা জমা দিয়েছে। পাশাপাশি বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তি, প্রতিযোগিতা এবং ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা-সংক্রান্ত আইনকে আরসিইপির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
আরসিইপির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য অস্ট্রেলিয়ার সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতা এই যোগদান প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে ঢাকা।
এলডিসি উত্তরণ নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। বৈশ্বিক জ্বালানি মূল্যস্ফীতি, বাণিজ্য বিঘ্ন এবং সাম্প্রতিক অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ উত্তরণের সময় ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর জন্য জাতিসংঘের কাছে আবেদন করেছে।
জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি ইতিমধ্যে এ আবেদনের বিষয়ে সুপারিশ করেছে। আগামী সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা রয়েছে।
বাংলাদেশ উত্তরণের পরও দেশীয় পণ্যের জন্য অস্ট্রেলিয়ার শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত বাজার সুবিধা অব্যাহত রাখার জন্য দেশটির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে এবং এ সুবিধা ধরে রাখতে সমর্থন কামনা করেছে।
এ ছাড়া বাংলাদেশ ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে একটি দ্বিপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করার প্রস্তাব দিয়েছে ঢাকা। অস্ট্রেলিয়া জানিয়েছে, এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করা হবে।
দুই দেশ নতুন শিল্প সহযোগিতার ক্ষেত্র নিয়েও আলোচনা করেছে। বৈঠকে বলা হয়, অস্ট্রেলিয়ার উন্নতমানের পশম ও তুলা ব্যবহার করে বাংলাদেশ উচ্চমূল্যের তৈরি পোশাক উৎপাদন বাড়াতে পারে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পকে অস্ট্রেলিয়ার প্রিমিয়াম প্রাকৃতিক তন্তুর একটি গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য হিসেবেও বিবেচনা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া পরিচ্ছন্ন জ্বালানি প্রযুক্তি, বিদ্যুৎ গ্রিড আধুনিকীকরণ এবং অস্ট্রেলিয়ার কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর (টিভিইটি) সঙ্গে কর্মশক্তি উন্নয়ন সহযোগিতা নিয়েও আলোচনা হয়।
বাণিজ্য আলোচনার সক্ষমতা বাড়াতে অস্ট্রেলিয়ার সহায়তা এবং ‘বিল্যাটারেল ট্রেড নেগোশিয়েশনস’ শীর্ষক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি অব্যাহত রাখার বিষয়েও মতবিনিময় হয়।
বৈঠকে উভয় পক্ষ আরসিইপি অ্যাকসেশন প্রক্রিয়া, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে সমন্বয় এবং ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট ফ্রেমওয়ার্ক অ্যারেঞ্জমেন্টের (টিফা) অধীনে কার্যকরী গ্রুপের মাধ্যমে নিয়মিত সংলাপ চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে সম্মত হয়।
তবে আরসিইপিতে যোগ দিতে বাংলাদেশকে সদস্য দেশগুলোর অনুমোদন পেতে হবে। একই সঙ্গে বাণিজ্য, সেবা, বিনিয়োগ, প্রতিযোগিতা নীতি, বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তি ও ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার মতো ক্ষেত্রে চুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সংস্কারও প্রয়োজন হতে পারে।
বাংলাদেশের প্রতিনিধি দল আশা প্রকাশ করেছে, এসব উদ্যোগ দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে এবং উভয় অর্থনীতির জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করবে।


