লক্ষ্মীপুরের কমলনগরে অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) আওতাধীন মতিরহাট ও মাতাব্বরহাট লঞ্চঘাটে টোল আদায়ের নামে চরম নৈরাজ্য ও বেপরোয়া অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
লক্ষ্মীপুর জেলা পরিষদের আওতাধীন ভোলা-লক্ষ্মীপুর নৌ-রুটের খেয়াঘাট ইজারাদার মুক্তার হোসেন ও তার সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে এই অনিয়মের অভিযোগ করেছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পথচারীরা।
বিআইডব্লিউটিএর কতিপয় অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে ব্যবস্থা না নেওয়ায় নদীকৈন্দিক ব্যবসা পরিচালনা ও স্থানীয় জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ১ জুলাই থেকে এক বছরের জন্য চরকালকিনি এলাকার বাসিন্দা আলমগীর হোসেনের ছেলে মুক্তার হোসেন জেলা পরিষদের খেয়াঘাট ইজারা নেন। কিন্তু ইজারার শর্ত ভঙ্গ করে কয়েক গুণ বেশি লাভে স্থানীয় কাদির, আক্তার, মানিক ও শাহজাহান নামের চার ব্যক্তির কাছে ঘাটটি সাব-ইজারা দেন।
পাশাপাশি চট্টগ্রাম বন্দর এলাকায় মুদি ব্যবসার সুবাদে বিআইডব্লিউটিএর কতিপয় কর্মকর্তার সঙ্গে সখ্য তৈরি করে তিনি বিআইডব্লিউটিএর আওতাধীন মতিরহাট ও মাতাব্বরহাট লঞ্চঘাট দুটির ইজারা প্রক্রিয়া পণ্ড করার উদ্যোগ নেন।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় থেকে ঘাট দুটির দরপত্র আহ্বান করা হলে, মুক্তার হাইকোর্টে একটি রিট করেন। আদালত ইজারা প্রক্রিয়ার ওপর ৬ মাসের স্থগিতাদেশ দেন। পরবর্তীকালে সরকারি রাজস্ব সচল রাখতে বিআইডব্লিউটিএ মো. তোফাজ্জল হোসেন ও মো. শামীম আল শাকিব নামের দুই শুল্ক আদায়কারী কর্মকর্তাকে খাস কালেকশনের দায়িত্ব দিয়ে ঘাটে পাঠায়।
তবে গত ২১ জুলাই রিটের সম্পূরক শুনানির পর আদালতের আদেশের বিকৃত ব্যাখ্যা দিয়ে ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করে বিআইডব্লিউটিএর ওই কর্মকর্তাদের ঘাট ছাড়তে বাধ্য করা হয়।
বিআইডব্লিউটিএর শুল্ক আদায়কারী কর্মকর্তা তোফাজ্জল হোসেন জানান, ‘মুক্তার সিন্ডিকেটের লোকজন আমাকে হত্যার হুমকি পর্যন্ত দিয়েছে। বাধ্য হয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে ঢাকায় ফিরে এসেছি।’
আদালতের চূড়ান্ত রায় না থাকলেও মুক্তার নিজেকে ইজারাদার দাবি করে দুটি ঘাট এলাকা অন্তত ৬০ লাখ টাকায় বিভিন্ন গ্রুপের কাছে সাব-ইজারা দিয়েছেন।
নাছিরগঞ্জ বাজারের সাব-ইজারাদার মো. রফিক এবং মতিরহাট অংশের সাব-ইজারাদার ওমর ফারুক জানান, বিআইডব্লিউটিএর কর্মকর্তাদের পরামর্শেই মুক্তার রিট করেছেন এবং ইজারা পাবেন–এমন আশ্বাসে তারা চুক্তি করে অর্থ পরিশোধ করেছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সূত্র জানিয়েছে, বিআইডব্লিউটিএ লক্ষ্মীপুর অফিসের কর্মকর্তা শাহ আলমের পরামর্শে মুক্তার রিট ও সম্পূরক শুনানি করান।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে বিআইডব্লিউটিএ লক্ষ্মীপুর জেলা সহকারী বন্দর ও পরিবহন কর্মকর্তা শাহ আলম বলেন, ‘মুক্তারের দেখানো কাগজে টোল আদায়ের কোনো বৈধ সুযোগ নেই। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
সরেজমিনে দেখা গেছে, মেঘনা নদীর তীর সংরক্ষণ বাঁধের মালামালবাহী কার্গো থেকে ৩ হাজার টাকা, সিমেন্ট আনলোডে বস্তাপ্রতি ১২ টাকা, বালুবাহী বলগেট থেকে ১ হাজার টাকা এবং প্রতিটি গরু থেকে ৬০ টাকা ও মহিষ প্রতি ১০০ টাকাসহ অন্তত নয়টি খাতে প্রকাশ্য চাঁদাবাজি চলছে।
বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জের হোগলা পাতা ব্যবসায়ী আজগর হোসেন জানান, ভোলায় ১০০ টাকা রাজস্ব দিলেও এখানে জোরপূর্বক ১ হাজার ৫০০ টাকা আদায় করা হয়েছে। একই কথা জানান বালু ব্যবসায়ী মিলন ভান্ডারীর ম্যানেজার মো. সজীব।
জাতীয়তাবাদী নৌযান শ্রমিক কর্মচারী দলের প্রচার সম্পাদক মো. জুয়েল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘খালি বলগেট নোঙর করলেও জোরপূর্বক চাঁদা নেওয়া হচ্ছে। এই বেআইনি চাঁদাবাজি অবিলম্বে বন্ধ করা দরকার।’
অভিযোগের বিষয়ে মুক্তার হোসেন বলেন, ‘আমি জেলা পরিষদ থেকে খেয়া ঘাটের ইজারা নিয়েছি। বিআইডব্লিউটিএ এখানে অনিয়মতান্ত্রিকভাবে টোল আদায়ের চেষ্টা করায় আদালতের শরণাপন্ন হয়েছি। একই ঘাটে তো দুই কর্তৃপক্ষের ইজারা চলতে পারে না।’
কমলনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাহাত উজ-জামান জানান, সরকারি বিধি লঙ্ঘন করে বেআইনি টোল আদায়ের সুযোগ নেই, দ্রুত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে লক্ষ্মীপুর জেলা পরিষদ প্রশাসক সাহাব উদ্দিন সাবু বলেন, ‘জেলা পরিষদের খেয়াঘাটের দোহাই দিয়ে বিআইডব্লিউটিএর ঘাটে চাঁদাবাজি সম্পূর্ণ অবৈধ। অভিযোগ প্রমাণিত হলে মুক্তারের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’


