ময়মনসিংহের ত্রিশালে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার সময় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরাফাত সিদ্দিকী একজনকে চড় থাপ্পড় ও লাঠিপেটা করার ঘটনাটি জন প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়কে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন।
আইন অনুযায়ী কাউকে শারীরিক শাস্তি দেওয়ার সুযোগ না থাকলেও ইউএনও তার ক্ষমতা দেখিয়ে এই কাজটি করার পর এখন তিনি কারও ফোন ধরছেন না।
ময়মনসিংহের ডিসি মো. সাইফুর রহমান টাইমস অব বাংলাদেশকে জানিয়েছেন, এই ঘটনায় ভাইরাল হওয়া ভিডিওটি তিনি দেখেছেন।
তার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নিচ্ছেন–এই প্রশ্নে তিনি টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘বিষয়টি ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে এবং তারা এটি খতিয়ে দেখছেন। তবে এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা আপডেট আসেনি।’
‘ইউএনও যে আচরণ করেছেন, এটি পেশাদারত্বের মধ্যে পড়ে না। কোন পরিস্থিতিতে তিনি কী করেছেন, তাকে এর জবাব দিতে হবে। ভুক্তভোগী লিখিত অভিযোগ দিলে সে অনুযায়ী প্রতিকারের ব্যবস্থা করা হবে’, বলেন ডিসি।
গত বুধবার বেলা ২টার দিকে ত্রিশালের কাঁঠাল ইউনিয়নের কালীরবাজারের কুলুরবাড়ি এলাকায় বালু বিক্রির একটি পয়েন্টে ঘটনাটি ঘটে।
ছড়িয়ে পড়া সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, আনসার ও র্যাবের সদস্যদের নিয়ে ওই বালু বিক্রির পয়েন্টে উপস্থিত হন ইউএনও। তিনি ইজারার কাগজপত্র দেখতে চান।
সেখানে উপস্থিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক সারোয়ার জাহান ওরফে বাচ্চু অভিযানে আসা ব্যক্তিদের পরিচয় জানতে চান। তখন আরাফাত সিদ্দিকী নিজের পরিচয় দেন।
কথাবার্তার একপর্যায়ে সারোয়ার জাহানকে পরপর দুটি থাপ্পড় দেন ইউএনও। প্রথম থাপ্পড়টি দেন বা হাতে এবং দ্বিতীয়টি ডান হাতে। এরপর এক র্যাব সদস্য ভুক্তভোগী ধরে নিয়ে যাওয়ার সময় ইউএনও তার কাছ থেকে লাঠি নিয়ে সারোয়ারকে চারবার আঘাত করেন।
এ সময় উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. মাহবুবুর রহমান ইউএনওকে থামানোর চেষ্টা করেন।
মারধরের শিকার সারোয়ার জাহান ময়মনসিংহ মহানগর ছাত্রদলের সাবেক সহসভাপতি।
ভ্রাম্যমাণ আদালত চলাকালে কাউকে প্রহার করার কোনো আইনি সুযোগ আছে কি না এমন প্রশ্নে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার টাইমসকে বলেন, ‘এটা তো কোনো আইনেই নেই। কোনো কোর্ট কাউকে প্রহার করতে পারবেন না।’
তিনি বলেন, ‘দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেক সময় কর্মকর্তারা বাধার মুখে পড়েন, বাধাতে অনেক সময় ক্ষিপ্তও হন। তবে প্রকাশ্যে এভাবে কাউকে চড় মারা উচিত না।’
ইজারাদার পক্ষ জানিয়েছে, মারধরের পর সারোয়ারকে র্যাবের গাড়িতে করে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় এবং পরে ধলা এলাকায় তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। সেখান থেকে তাকে উদ্ধার করে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
‘সৃষ্টি এন্টারপ্রাইজ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান ত্রিশালের কালীরবাজার এলাকায় বালু বিক্রির ইজারা নিয়েছে। বালুমহালটি মূলত ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার নিয়ন্ত্রণাধীন।
সৃষ্টি এন্টারপ্রাইজের মালিক শামসুজ্জামান মাসুদ জানান, তিনি প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয়ে ঘাটটি ইজারা নিয়েছেন। পাঁচ-ছয় মাস আগে ইজারা পেলেও রাস্তা না থাকায় বালু পরিবহন করা সম্ভব হয়নি। ৮-১০ দিন আগে তারা বালু সরানো শুরু করেন এবং কালীরবাজারের কুলুরবাড়ি এলাকায় বালু বিক্রির কাউন্টার চালু করেন।
‘এই ঘটনার পর আমি ইউএনওর সঙ্গে দেখা করতে গেলেও দেখা করতে পারিনি’, বলেন তিনি।
বাংলাদেশের মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯ অনুযায়ী একজন ম্যাজিস্ট্রেট কেবল দুটি উপায়ে দণ্ড প্রদান করতে পারেন। সংশ্লিষ্ট আইনের ধারা অনুযায়ী অর্থদণ্ড (জরিমানা) অথবা সর্বোচ্চ দুই বছর পর্যন্ত বিনাশ্রম বা সশ্রম কারাদণ্ড দিতে পারেন। তবে আইনে শারীরিক নির্যাতন, লাঠিপেটা বা থাপ্পড় মারার কোনো অধিকার ম্যাজিস্ট্রেটকে দেওয়া হয়নি।
সংবিধানের ৩৫(৫) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির সঙ্গে নিষ্ঠুর, অমানবিক বা লাঞ্ছনাদায়ক আচরণ করা মৌলিক অধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
দণ্ডবিধি অনুযায়ী, একজন সরকারি কর্মকর্তা নিজ হাতে কাউকে প্রহার বা লাঞ্ছিত করলে তা ‘আঘাত করা’, ‘বলপ্রয়োগ’ বা ‘ক্ষমতার অপব্যবহার’ হিসেবে অপরাধ বলে গণ্য হবে।
আইন অনুযায়ী, মোবাইল কোর্ট পরিচালনার সময় আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটলে বা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ বা আনসার বাহিনী প্রয়োজনীয় আইনি বলপ্রয়োগ (যেমন: গ্রেপ্তার বা প্রতিরোধ) করতে পারে। কিন্তু কোনো অবস্থাতে ম্যাজিস্ট্রেট নিজ হাতে কাউকে প্রহার করতে পারেন না।


