রাজস্ব আদায় যখন দুর্বল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে শিল্পকারখানা যখন সংকটে এবং বেসরকারি বিনিয়োগ যখন স্থবির–ঠিক এমন সময়ে সরকারি কর্মচারীদের বেতন ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর পরিকল্পনা দেশের অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টির ঝুঁকি তৈরি করছে।
অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলছেন, বেতনের এই বর্ধিত অর্থ হয়তো ঋণ নিয়ে অথবা অন্য কোনো খাতের বরাদ্দ কাটছাঁট করে মেটাতে হতে পারে। এর ফলে একদিকে যেমন সরকারের ঋণের বোঝা বাড়তে পারে, অন্যদিকে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও জরুরি সেবা খাতগুলোতে ব্যয় সংকুচিত হতে পারে।
বিদ্যমান নানা অর্থনৈতিক চাপের মধ্যেই তারেক রহমানের বিএনপি সরকার এই নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে উদ্যোগী হয়েছে। জ্বালানি সংকটে ব্যাহত হচ্ছে শিল্প উৎপাদন, চড়া সুদের হারের কারণে নিরুৎসাহিত হচ্ছে বেসরকারি বিনিয়োগ এবং সরকারের রাজস্ব সংগ্রহও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের চেয়ে নিচে।
এমন পরিস্থিতিতে অর্থনীতিবিদদের পরামর্শ—প্রস্তাবিত এই বেতন বৃদ্ধির সময় পুনর্বিবেচনা করা এবং অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা উচিত।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, এই অতিরিক্ত ব্যয় বহন করার মতো টেকসই সক্ষমতা সরকারের আছে কি না, তা গভীরভাবে ভেবে দেখা দরকার।
তিনি বলেন, ‘বর্তমানে এই ব্যয় মেটানোর মতো সক্ষমতা নেই। সক্ষমতা বলতে আমি বোঝাচ্ছি, রাজস্ব আদায় থেকে যে আয় হয়, তার ভিত্তিতে এটি করা সম্ভব কি না। এখনো সেটি অর্জন করা সম্ভব হয়নি। আর ঋণ নিয়ে তো আর বেতন দেওয়া যায় না।’
গত ১১ জুন জাতীয় সংসদে নতুন বাজেট উপস্থাপনের সময় অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ঘোষণা দেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে নতুন বেতন কাঠামো চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে। তিনি উল্লেখ করেন, সরকারি কর্মচারীরা প্রায় ১১ বছর ধরে একই স্কেলে কাজ করছেন, অথচ মূল্যস্ফীতির কারণে এই সময়ে জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বেড়েছে।
নবম পে কমিশন সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন এক লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করেছে। কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, এই সুপারিশ পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে হলে বছরে অতিরিক্ত এক লাখ ছয় হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও ভাতার জন্য মোট ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা রাখা হয়েছে। তবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, প্রস্তাবিত ১০০ শতাংশ বৃদ্ধির কথা বলা হলেও বাস্তবে এটি হবে প্রায় ৭০ শতাংশের মতো। আর এর জন্যই অতিরিক্ত লাগবে প্রায় ৬২ হাজার ৮৮৭ কোটি টাকা।
চলতি অর্থবছরে নতুন বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়নের জন্য সরকার ৪৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছে। তবে সরকারের দুর্বল রাজস্ব পরিস্থিতি একটি বড় চিন্তার বিষয়।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল পাঁচ লাখ তিন হাজার কোটি টাকা। কিন্তু আদায় হয়েছে চার লাখ ১৫ হাজার ৪৭৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা কম আদায় হয়েছে।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য এনবিআরের রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ছয় লাখ চার হাজার কোটি টাকা। কিন্তু অর্থবছরের প্রথম মাস অর্থাৎ জুলাইয়ে ৩৮ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে এনবিআর আদায় করতে পেরেছে মাত্র ২৩ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা। ফলে শুরুতেই ১৫ হাজার ৫৫ কোটি টাকার ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
বিদ্যমান জ্বালানি সংকট এই রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে। গ্যাস সংকটের কারণে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে অথবা তাদের উৎপাদন কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে দেশীয় উৎপাদন ও বিক্রি কমে গিয়ে আয়কর এবং ভ্যাটসহ অন্যান্য রাজস্ব আদায় কমতে পারে।
একই সময়ে, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকারকে নিজস্ব তহবিল থেকে অনেক বেশি অর্থ খরচ করতে হচ্ছে, যা সরকারি অর্থের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।
আবার বেতনের এই বাড়তি টাকা মেটাতে সরকার যদি ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়, তবে তা বেসরকারি খাতের বিনিয়োগের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
জুন মাসের শেষে বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধি কমে রেকর্ড সর্বনিম্ন ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে নেমে এসেছে। সরকার যদি ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নেওয়া শুরু করে, তবে সাধারণ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য ঋণের সুযোগ আরও সীমিত হয়ে পড়বে, যা শেষ পর্যন্ত বিনিয়োগ ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে ব্যাহত করতে পারে।
তবে সরকারের এই সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেছেন, প্রয়োজনে ঋণ নেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা হবে।
গত বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া এগিয়ে চলেছে। তবে এর সময়সীমা এবং এটি কয়টি ধাপে করা হবে সে বিষয়ে মন্ত্রিসভা সিদ্ধান্ত নেবে।
প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা বলেন, ‘নতুন বেতন কাঠামোর অর্থ জোগাড় করতে রাজস্ব আদায় বাড়ানো হবে এবং প্রয়োজন হলে ঋণও নেওয়া হবে।’
তবে অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন সতর্ক করে বলেন, ঋণ নিলে সুদের খরচের মাধ্যমে আরেকটি স্থায়ী ও অতিরিক্ত বোঝা তৈরি হবে।
তিনি বলেন, ‘এর মানে হলো–আপনি যদি একটি খরচ বাড়ান, তবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আরেকটি খরচও বেড়ে যাবে। ভবিষ্যতে এই দুটি খরচ কীভাবে সামলানো হবে?’
তিনি আরও বলেন, বেতন বাড়ালে পরিচালনা ব্যয় বাড়বে এবং ঋণ নিলে সুদের খরচ বাড়বে। ফলে সরকার কার্যত একটি ঋণের ফাঁদে পড়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
আর সরকার যদি ঋণ নেওয়া এড়িয়ে চলতে চায়, তবে তাদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো মৌলিক উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর বরাদ্দ কমাতে হবে অথবা পরিচালনা ব্যয় কাটছাঁট করতে হবে।
এ বিষয়ে জাহিদ হোসেন প্রশ্ন তোলেন, বাজেট যদি কমাতেই হয়, তবে কোন কোন খাতকে এই ক্ষতির বোঝা বহন করতে হবে এবং যেসব মানুষ ওই সব খাতের ব্যয়ের ওপর নির্ভরশীল, তাদের কী হবে?
অর্থনীতিবিদ এম মাসরুর রিয়াজ টাইমসকে বলেন, সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কারণ, বাজারে বর্তমান দ্রব্যমূল্যের তুলনায় তাদের বেতন সত্যিই কম। তবে বেতন বাড়ানোর সময়ের যৌক্তিকতা নিয়ে তিনিও প্রশ্ন তুলেছেন।
এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘এমনিতেই রাজস্ব আদায় অনেক কম। এই অবস্থায় এখন বেতন বাড়াতে গেলে ঋণের ওপর সরকারের নির্ভরতা আরও বেড়ে যাবে। তাই সোজা কথায়, বেতন বাড়ানোর জন্য এটি উপযুক্ত সময় নয়।’


