বৈশাখ: স্মৃতি ও বর্তমানের সেতুবন্ধন

বৈশাখ: স্মৃতি ও বর্তমানের সেতুবন্ধন
ছবি: সংগৃহীত
Advertisement
Advertisement

বৈশাখ দরজায় কড়া নাড়ছে, অথচ মনটা যেন এক অদ্ভুত শূন্যতায় ডুবে আছে। কিসের যেন অভাব অনুভব করি। মনের অজান্তেই বারবার ফিরে যাই অতীতে-স্মৃতির ভাঁজে ভাঁজে জমে থাকা সেই দিনগুলোতে, যেখানে বাঙালির ঐতিহ্যবাহী বৈশাখ মানেই আনন্দ, উচ্ছ্বাস আর অফুরন্ত প্রাণচাঞ্চল্য। শৈশবে গ্রামে বৈশাখ ছিল এক অন্যরকম উৎসব। গ্রামে গ্রামে মেলা বসত।

আমরা-কাজল, নাসির, এনাম, জালাল আরও অনেকেই দলবেঁধে ছুটে যেতাম সেই মেলায়। রঙিন ঘুড়ি, মাটির খেলনা, বাঁশি, বেলুন, বেহালা, একতারা, তিলের মোয়া, মুড়ি, কদমা-কত কিছু যে কিনতাম! মেলায় গরমের দুপুরে গলে যাওয়া আইসক্রিম খাওয়া এবং দোকান বসে মিষ্টি, দই খাওয়ার আনন্দ ছিল অপরিসীম। আবার পাশের বন্ধুদের হাসাহাসি-সব মিলিয়ে এক অপরূপ আনন্দের জগৎ। চারদিকে বাজত বৈশাখী গান, লোকগীতি-সব মিলিয়ে এক অন্যরকম উৎসবের আবহ।

সময় গড়াল, আমরা ও বড় হতে থাকলাম।  হাইস্কুল জীবনের পরিধি আরও বিস্তৃত হলো। হাইস্কুল জীবনে এমদাদ, মাহবুব, ফরিদ, রেজি আপা, নিলুফা, মনজিলা, সুরাইয়া, হাবিব, কালাম, আলমগীর, সামাদ ভাই, শাহীন মামাসহ অনেকেই বেলশ্বরী মেলায় যেতাম। মেলাটি আমাদের জন্য বিশেষ আকর্ষণ হয়ে উঠেছিল। নদীর পাড়ে নৌকার সারি সারি, মানুষের ঢল-সব মিলিয়ে এক জীবন্ত উৎসবের ছবি। সেখানে পাওয়া যেত নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সবকিছু। বৈশাখ উপলক্ষে নানা আয়োজন থাকত-বন্দুক দিয়ে বেলুন ফোটানো, দোলনা, তিন তাস, চরকি ঘুরানো, ছক্কা-এসব খেলায় মেতে উঠতাম অনেকেই। হাতের কিছু টাকা দিয়েই অংশ নিতাম, জয়-পরাজয় খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল না, আনন্দটাই ছিল আসল।

জীবনের আরেক নতুন অধ্যায়-ঢাকায় আগমন। শহরের ব্যস্ততা, নতুন পরিবেশ-সবকিছুই ছিল ভিন্ন। এখানে বৈশাখ যেন নতুন রূপে ধরা দিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চারুকলা, রমনার বটমূল-সবকিছু ঘিরে এক বর্ণিল উৎসব। পান্তা-ইলিশ, মঙ্গল-শোভাযাত্রা-সবকিছুতেই ছিল এক অন্যরকম আবেগ আর গর্ব।

ঢাকা কলেজের দিনগুলো ছিল বন্ধুত্ব, স্বপ্ন আর আবেগে ভরা। বন্ধু মোস্তাক, সারোয়ার, মুক্তা, উজ্জ্বল, মহিউদ্দীন, লিপু, মামুন, সাদী, কবির, হিমু, মোয়াজ্জেম, রফিক, কামাল, সুমন, আমান-মিলে নানা সময়ে দলবেঁধে ঘুরে বেড়াতাম। বিদ্যুৎ চলে গেলে পিলু পিলু বলে হৈচৈ করে চিৎকার। ভণ্ড ব্লকের ঐতিহাসিক মিছিল। এসব ছোট ছোট মুহূর্তই তখন জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দ হয়ে উঠেছিল। নীলক্ষেত, নিউমার্কেট, গাউসিয়া-সব জায়গাই ছিল আমাদের পদচারণায় মুখর। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সাথী বদলেছে, কেউ এসেছে, কেউ হারিয়ে গেছে-জীবনের স্বাভাবিক নিয়মে।

আরও পড়ুন

এরপর পা রাখলাম দেশের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে- মুক্ত চিন্তা আর সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল কেন্দ্র। এখানে এসে জীবনের অ্যালবামে যুক্ত হলো আরও নতুন কিছু মুখ, নতুন কিছু সম্পর্ক। টিএসসি, চারুকলা, বাংলা একাডেমি, রমনার বটমূল-সব জায়গাতেই বৈশাখ যেন প্রাণের উৎসব হয়ে উঠত। গান-বাজনা, পান্তা-ইলিশ, মেলা, আড্ডা- সবকিছু মিলিয়ে এক অবিস্মরণীয় সময়।

তখন হাসান, মিজান, টিপু, আশা, জাহিদ, আতিক, বাশার, নাহিদ, মামুন, নিবির, সেতু, মৌটুসী, রেজা, মামুন, ফয়েজ, আতা, আরিফ, নিয়াম, মিতা, রাঙা, মারুফ-অনেকেই আড্ডার অংশ হয়ে উঠত। পাশাপাশি ঢাকা কলেজ এইচএসসি-৯৫ সোসাইটি, মার্কেটিং, ঢাবি, ডুফা ১৯৯৫-৯৬ তে নানা বৈশাখীর আয়োজন। আজ অনেকেই দেশে-বিদেশে প্রতিষ্ঠিত।

পড়াশোনা শেষে শুরু হলো জীবনের প্রত্যাশিত অধ্যায়-সংসার ও কর্মজীবন। বৈশাখ তখনো আসে, তবে রূপ বদলায়। পরিবারে সঙ্গে বৈশাখী পোশাক, পান্তা-ইলিশ, ঘুরে বেড়ানো- সবকিছুতেই আনন্দ থাকে, তবে তার রঙ হয় একটু পরিণত। আবার অফিসে শাড়ি-পাঞ্জাবি, পরিধান ও নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উদযাপন। সবই ক্ষুদ্র জীবনের আনন্দের অংশ।

জীবনের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন-বিদেশ পাড়ি। পরিচিত সবকিছু ছেড়ে এক নতুন পরিবেশে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সংগ্রাম শুরু হলো। চারপাশে অপরিচিত মানুষ, ব্যস্ততা আর একাকীত্ব-সবকিছু মিলিয়ে এক ভিন্ন বাস্তবতা। তবু জীবন থেমে থাকে না। নতুন করে শুরু করতে হয়, নতুন করে সাথী খুঁজে নিতে হয়। হাতের প্রচুর সময়। এই সময়ে শুরু হলো লেখালেখির নতুন মাত্রা। ধীরে ধীরে গড়ে উঠল নতুন জগৎ, নতুন কিছু সম্পর্ক। সাহিত্য চর্চা, বই প্রকাশ, পত্রিকা ও ম্যাগাজিনে লেখা-সব মিলিয়ে জীবনে আবার নতুন করে প্রাণ সঞ্চার হলো। নামীদামী কবি, লেখক ও সাহিত্যেকের সাথে পরিচয়। পরিবারের আপনজনদের বাইরে যাদের সঙ্গে সেতুবন্ধন- কাউসার ভাই, নীরা কাদরী আপু, মোশাররফ ভাই, ফারহানা আপু, আছকির ভাই, নাসির শিকদার, সাহিত্য একাডেমি, লেখকের অঙ্গন। বিদেশের মাটিতে ও বৈশাখ আসে-ভিন্ন আঙ্গিকে কিন্তু চমৎকার আবেগ নিয়ে। এখানেও যেন বাংলাদেশরই একটি ছোট্ট প্রতিচ্ছবি। সময় এগিয়ে চলে- জীবনের অ্যালবামে নতুন নতুন মুখ যোগ হয় আর পুরনো স্মৃতিগুলো ধীরে ধীরে কুয়াশার মতো ঝাপসা হয়ে যায়। তবুও কিছু সাথী, কিছু মুহূর্ত, কিছু বৈশাখ চিরদিন হৃদয়ের গভীরে থেকে যায়।

জীবন বদলায়, সময় বদলায়, মানুষ বদলায়। তবুও সময়ের স্রোতে কিছু সম্পর্ক, কিছু সংস্কৃতি, কিছু স্মৃতি কখনো হারায় না। তারা থেকে যায় নীরবে, অমলিন হয়-হৃদয়ের গভীরে, মণিকোঠায় ছড়ায় মায়ার সেতুবন্ধনে নিভৃতে আলো।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad