জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় ঢাকার সাভারে সাঁজোয়া পুলিশযান থেকে ফেলে আসহাবুল ইয়ামিনকে হত্যা মামলায় ছয় আসামিকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছে আদালত। একই ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ঢাকা-১৯ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য সাইফুল ইসলামসহ ১৩ জনকে আত্মসমর্পণের জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রসিকিউশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ আদেশ দেয়।
যাদের বিরুদ্ধে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তাদের মধ্যে রয়েছেন ঢাকা-১৯ আসনের সাবেক এমপি সাইফুল ইসলাম, ঢাকা রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি সৈয়দ নুরুল ইসলাম, সাবেক পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান রিপন, সাভার থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহজামান এবং আশুলিয়া থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এএফএম সায়েদ।
অন্যদের মধ্যে রয়েছেন সাভার উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মঞ্জুরুল আলম রাজিব, উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি মো. আতিকুর রহমান, ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ফখরুল আলম সমর, সাভার পৌরসভার সাবেক মেয়র আব্দুল গণির ছেলে মেহেদী হাসান তুষার, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান রাজীবের ব্যক্তিগত সহকারী রাজু আহম্মেদ, মো. ফরিদ, জামান খান এবং শরীফ আশরাফুল আলম বাবুল।
কারাগারে পাঠানো হয়েছে ঢাকা জেলার সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. আব্দুল্লাহিল কাফী, সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাভার সার্কেল) মো. শাহিদুল ইসলাম, এএসআই মোহাম্মদ আলী, নায়েক সুহেল মিয়া, কনস্টেবল মাহফুজ মিয়া এবং ঢাকা জেলা যুবলীগের সভাপতি মিজানুর রহমান ওরফে জিএস মিজানকে।
প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ। তিনি বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলায় ১৯ আসামির মধ্যে অন্য মামলায় গ্রেপ্তার রয়েছেন ছয়জন। তাদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়েছে। গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকায় সাবেক এমপি সাইফুলসহ ১৩ জনের স্থায়ী-অস্থায়ী ঠিকানায় গিয়েও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাদের হদিস পায়নি। তাই, ট্রাইব্যুনালে হাজির হওয়া ছয়জনকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর পাশাপাশি পলাতকদের হাজিরের জন্য জাতীয় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা প্রয়োজন।
শুনানি শেষে প্রসিকিউশনের আবেদন মঞ্জুর করে আদালত। পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ৭ সেপ্টেম্বর দিন ধার্য করা হয়েছে।
ইয়ামিন হত্যার ঘটনায় সাইফুল ইসলামসহ ১৯ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গত ২৬ জুলাই আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল। সেদিন পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করা হয়। আসহাবুল ইয়ামিন মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন।
প্রসিকিউশনের অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ড এলাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মসূচি চলাকালে পুলিশ ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা হামলা চালান। দুপুর দেড়টার দিকে ইয়ামিনকে ধরে টেনে একটি পুলিশের সাঁজোয়া যানের কাছে নেওয়া হয়। সেখানে তার বুকের বাম পাশে গুলি করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। গুলিতে তার বুকের পাশে অসংখ্য স্প্লিন্টার বিদ্ধ হয়।
এরপর ইয়ামিনকে টেনে সাঁজোয়া যানের ওপর ফেলে রাখা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, আন্দোলনরত ছাত্র-জনতাকে ভীতি প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা ইয়ামিনকে নিয়ে সাঁজোয়া যানটি এপাশ থেকে ওপাশে ঘোরাতে থাকেন।
একপর্যায়ে প্রায় মৃত অবস্থায় ইয়ামিনকে সড়কে ফেলে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। একই সময় সাঁজোয়া যানের ভেতর থেকে একজন পুলিশ সদস্যকে বের করে ইয়ামিনের পায়ে আবার গুলি করার নির্দেশ দেওয়া হয় বলেও প্রসিকিউশনের অভিযোগে বলা হয়েছে।
তবে ওই পুলিশ সদস্য ইয়ামিনকে মৃত ভেবে তার পায়ে গুলি না করে তাকে রাস্তার একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে টেনে নিয়ে সড়ক বিভাজকের পাশে ফেলে দেন। সে সময়ও গুলিবিদ্ধ ইয়ামিনকে নিশ্বাস নিতে দেখা যাচ্ছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। প্রসিকিউশন এই ঘটনাটিকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করছে।


