জাকসু নির্বাচন: ৩৩ বছর পরও নারীরা পেছনে

জাকসু নির্বাচন: ৩৩ বছর পরও নারীরা পেছনে
জাকসু নির্বাচনে নারী প্রার্থী কম। ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

অনিক রহমান/ কে.এম. জাদিদ বিন খালিদ ।।  জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩৩ বছর পর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জাকসু) নির্বাচন। আগামী ১১ সেপ্টেম্বরের ওই নির্বাচনকে অনেকেই দেখছেন শিক্ষাঙ্গনে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার পদক্ষেপ হিসেবে। কিন্তু তা ম্লান করে দিচ্ছে নির্বাচনে নেতৃত্বের জায়গায় নারীদের অংশগ্রহণ।

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অস্থিরতার কারণে ১৯৯২ সালের পর আর আয়োজন করা যায়নি জাকসু নির্বাচন। তখন থেকে শিক্ষার্থী ছাড়াই উপাচার্য ও একজন শিক্ষক মিলে অস্থায়ীভাবে ছাত্র সংসদের কাজ চালিয়ে নিচ্ছিলেন। তাই দীর্ঘ সময় পরে আয়োজিত এবারের নির্বাচনকে শুধু একটি সাধারণ ভোট নয়, বরং দেখা হচ্ছে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি পুনরুদ্ধারের সুযোগ হিসেবে। কিন্তু তাতে নারীর অংশগ্রহণের ঘাটতি দেখে অনেকেরই আশঙ্কা, সেই পুনরুদ্ধার হয়তো অসম্পূর্ণই থেকে যাবে।

ভোটার তালিকার তথ্য বলছে, এবারের নির্বাচনে মোট ভোটার ১১ হাজার ৯১৯ জন শিক্ষার্থী, তার মধ্যে ছেলে ছয় হাজার ১০২ জন আর মেয়ে ৫ হাজার ৮১৭ জন। কিন্তু ভারসাম্যহীনতা রয়েছে প্রার্থীর তালিকায়। নির্বাচনে হল সংসদ ও কেন্দ্রীয় সংসদ মিলিয়ে মোট ৬২২ জন প্রার্থীর মধ্যে নারী মাত্র ১৭৩ জন।

এবারের নির্বাচনে শুধু জাকসুতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ১৭৯ জন প্রার্থী, তার মধ্যে নারী মাত্র ৪৬ জন। কোনও প্যানেলের ভাইস প্রেসিডেন্ট, ক্রীড়া, আইটি এবং পরিবহন সম্পাদকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে নেই কোনো নারী প্রার্থী। সহকারী সাধারণ সম্পাদক পদে লড়াই করছেন মাত্র দুজন নারী।

জাকসু নির্বাচনে ভোটগ্রহণ করা হবে ১১ সেপ্টেম্বর। ছবি: টাইমস

এই বৈপরিত্য দেখে হতবাক অনেকে। যেখানে মোট ভোটারের ৪৯ শতাংশই নারী, সেখানে নারী প্রার্থীর সংখ্যা এক তৃতীয়াংশেরও কম। নেতৃত্বের জায়গায় তারা প্রায় নেই বললেই চলে।

শিক্ষার্থীরা বলছেন, সামাজিক, পারিবারিক এবং নিরাপত্তাবিষয়ক বাধাই নারীদের বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতিতে না আসার বড় কারণ। সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী আরিফার মতে, ‘সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাধা, পরিবার ও বন্ধুদের চাপ আর নিরাপত্তা শঙ্কা- সব মিলিয়েই মেয়েরা এগিয়ে আসতে ভয় পায়।’ তাছাড়া নেতৃত্বের পদে দাঁড়ালে যে ধরনের সমালোচনা ও ঝুঁকির মুখে পড়তে হবে, সেটাকেও দায়ী করেন তিনি।

আরও পড়ুন

দীর্ঘদিন জাকসু কার্যকর না থাকায় নতুন প্রজন্মের মেয়েরা কোনো নারী নেত্রীকে দেখেনি। অনুপ্রেরণার অভাবও তাদেরকে অনেকটা পিছিয়ে দিচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ধর্মীয় সংখ্যালঘুর পাশাপাশি ভিন্ন ভাষাভাষী প্রার্থীদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন। নির্বাচনে নাট্য সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করচেন ইগিমি চাকমা। পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে উত্তেজনার সময় সামাজিক মাধ্যমে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হয় তাকে, পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে শেষ পর্যন্ত ফেসবুক অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন তিনি। ইগিমি প্রশ্ন তোলেন, ‘এমন পরিবেশে কীভাবে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী উৎসাহিত হবে?’

চলছে জাকসু নির্বাচনের প্রচারণা। ছবি: টাইমস

বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্বাচনের আগে ঘোষিত বিভিন্ন প্যানেলও যেন অসাম্যেরই প্রতিচ্ছবি। এখন পর্যন্ত ঘোষিত সাতটি প্যানেলের মধ্যে শুধু ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেলেই একজন নারী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জেনারেল সেক্রেটারি পদে। তার নাম তানজিলা হোসাইন বৈশাখী। ‘সম্প্রীতির ঐক্য’ প্যানেলে মোট ১১ জন নারী আছেন, কিন্তু শীর্ষ পদে নেই কেউ। অন্যান্য প্যানেল যেমন ‘স্বতন্ত্র ছাত্র সম্মেলন’ এবং ‘শ্যামসপ্তক পরিষদ’-এও শীর্ষ পদে কোনো নারী নেই।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ভারসাম্যহীনতা শুধু জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় নয়, বরং পুরো দেশের ছাত্র রাজনীতির জন্য একটি প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশ দীর্ঘদিন নারীনেতৃত্বে পরিচালিত হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতিতে নারীর এভাবে পিছিয়ে থাকাকে পরস্পরবিরোধী হিসেবেই অ্যাখ্যা দিচ্ছেন তারা।

জাকসু নির্বাচন ঘিরে এখন চলছে নির্বাচনী প্রচারণা। প্রচারণা শেষ হবে নয় সেপ্টেম্বর রাত ১২টায়। এরপর ১১ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হবে ভোটগ্রহণ।

নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে উত্তেজনা। শিক্ষার্থীরা প্রস্তুতি নিচ্ছে ঐতিহাসিক দিনটির জন্য। সেই ইতিহাসে নারীর অবস্থান কি থাকবে তা সময়ই বলে দেবে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad