সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জুলাই গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার চলছে। বর্তমানে ৫৯০টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে এবং আরও ১২টি মামলার তদন্ত শেষ হয়ে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের অপেক্ষায় আছে।
প্রয়োজন হলে ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা, প্রসিকিউটর, তদন্তকারী কর্মকর্তা ও লজিস্টিক সহায়তা আরও বাড়ানো হবে, যাতে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা যায়।
মঙ্গলবার রাতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনের ২৪তম দিনে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব ও রংপুর-৪ আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য আখতার হোসেন কার্যপ্রণালি বিধির ৬৮ অনুযায়ী জনগুরুত্বপূর্ণ ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও গণহত্যার বিচার সম্পর্কে সাম্প্রতিক আলোচনা’ শীর্ষক বিষয়টি জাতীয় সংসদে উত্থাপন করেন। ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন।
আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আওয়ামী লীগের দলগত বিচারের দাবিতে বিএনপি শুরু থেকেই সোচ্চার ছিল। পরবর্তীতে আইন সংশোধনের মাধ্যমে দলগত বিচারের আইনি ভিত্তিও তৈরি হয়েছে।
সংবিধান সংস্কার নিয়ে বিরোধী দলের উদ্দেশে তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং ভবিষ্যতে ফ্যাসিবাদ ঠেকাতে সরকার সংবিধান সংস্কারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ লক্ষ্যে গঠিত সংবিধান সংস্কার কমিটিতে বিরোধী দলের জন্য এখনো পাঁচটি আসন খালি রাখা হয়েছে। তিনি তাদের আলোচনায় ফিরে আসার আহ্বান জানান।
জুলাই যোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের জন্য সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, প্রতিটি শহীদ পরিবারের জন্য এককালীন ৩০ লাখ টাকা, ক শ্রেণির আহতদের ৫ লাখ টাকা, খ শ্রেণির আহতদের ৩ লাখ টাকা এবং গ শ্রেণির আহতদের ১ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি শহীদ পরিবার ও আহতদের জন্য মাসিক ভাতাও চালু করা হয়েছে। গুরুতর আহতদের প্রয়োজনে বিদেশে চিকিৎসার ব্যবস্থাও করা হবে। জুলাই ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও জানান, আগামী ৫ আগস্ট জুলাই স্মৃতি জাদুঘর উদ্বোধন করা হবে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, সরকার মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে। তবে সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রের স্বার্থে যে যৌক্তিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তা আইন অনুযায়ী কার্যকর হবে।
সীমান্ত ও পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে তিনি বলেন, বর্তমান সরকার দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কঠোর অবস্থানে রয়েছে। প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্ক হবে পারস্পরিক সম্মান, মর্যাদা ও সমতার ভিত্তিতে। সরকারের নীতি–‘সবার আগে বাংলাদেশ’।
হাসিনাকে ফেরানোর চেষ্টা অব্যাহত
শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতাভুক্ত দেশে তাকে ফেরানোর চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে সরকার। দেশে ফিরলে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি জানান, সরকারি হিসাব অনুযায়ী গেজেটভুক্ত শহীদের সংখ্যা ৮৪৩ জন এবং আহতসহ স্বীকৃত জুলাই যোদ্ধার সংখ্যা ১৫ হাজার ২১২ জন। শহীদদের ঘটনায় ৭৫১টি হত্যা মামলা, একটি অপমৃত্যু মামলা, ৩৩টি সিআর মামলা এবং ৪৮টি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ, আহত ও নির্যাতিত প্রত্যেক মানুষের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সংবিধান সংস্কারে ফের আলোচনার আহ্বান
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রথম ও সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল জুলাই ঘোষণাপত্র। সেই ঘোষণাপত্রের ধারাবাহিকতায় জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের উদ্যোগে জুলাই জাতীয় সনদ প্রণীত হয়েছে। কিন্তু সংসদে জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে আলোচনায় এ দুটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জনের কথা যথাযথভাবে উঠে আসেনি বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
তিনি বলেন, জুলাই ঘোষণাপত্র ও জাতীয় সনদে শহীদ পরিবার, আহত জুলাই যোদ্ধাদের সুরক্ষা, সাংবিধানিক স্বীকৃতি এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার যে অঙ্গীকার করা হয়েছে, সরকার তা বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান কোনো একক রাজনৈতিক দল বা ছাত্রসংগঠনের আন্দোলন ছিল না; এটি ছিল সমগ্র বাংলাদেশের মানুষের গণঅভ্যুত্থান। একই সঙ্গে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, এই অভ্যুত্থানের পেছনে ছিল দীর্ঘ ১৭ বছরের গণতান্ত্রিক আন্দোলন, যেখানে গুম, খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যা, আয়নাঘরে নির্যাতনসহ নানা নিপীড়নের শিকার হয়েছেন হাজারো মানুষ।


