দেশজুড়ে ক্রীড়া বিল্পবের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়ে তা বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে সরকার। ইতোমধ্যে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ৪ হাজার ৪৯৯ ইউনিয়নে একটি করে আধুনিক কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ নির্মাণে জমি চিহ্নিত করার কাজ শুরু করা হয়েছে।
একই সঙ্গে অবশিষ্ট ২৯৪টি উপজেলায় ক্রীড়া অফিস স্থাপনে ইতোমধ্যে ৮৮২টি নতুন পদ সৃষ্টিও করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এ ছাড়া, প্রতিটি বিভাগে আন্তর্জাতিক মানের স্পোর্টস ভিলেজ নির্মাণ উদ্যোগও দৃশ্যমান হচ্ছে।
দেশের যুবসমাজকে মাদক, কিশোর গ্যাং, সহিংসতা ও অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রেখে খেলাধুলার মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম গড়ে তুলতেই এ ধরনের কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার।
যুব ও ত্রীড়া মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে বিশেষ করে খেলার মাঠ কমে যাওয়ায় শিশু-কিশোরদের স্বাভাবিক শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে অবসর সময়ের ইতিবাচক ব্যবহার না থাকায় অনেক তরুণ মোবাইল আসক্তি, মাদক, কিশোর অপরাধ, সহিংসতা ও বিভিন্ন সামাজিক অবক্ষয়ের দিকে ঝুঁকে পড়ছে।
এ বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই সরকার ক্রীড়াকে সামাজিক উন্নয়ন ও অপরাধ প্রতিরোধের অন্যতম কার্যকর মাধ্যম হিসেবে সামনে এনে একটি দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি বাস্তবায়ন শুরু করেছে।
যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘খেলাধুলার সার্বিক উন্নয়নের জন্য পর্যাপ্ত মাঠের কোনো বিকল্প নেই। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের উদ্যোগে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে।’ তিনি ওই কমিটির আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করছেন বলে জানান।
তিনি আরও বলেন, ‘কমিটিতে স্থানীয় সরকার ও গৃহায়ণ প্রতিমন্ত্রীসহ ১২ জন সচিব সদস্য হিসেবে রয়েছেন। তাদের সমন্বয়ে মাঠ সংরক্ষণ, সংস্কার এবং নতুন মাঠ নির্মাণের কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রত্যেক সংসদ সদস্যকে নিজ এলাকায় অন্তত ৮ বিঘা জমি নির্ধারণের অনুরোধ জানিয়ে ডিও লেটার পাঠানো হয়েছে। যুব সমাজকে অবরাধ মূলক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে সরাতে এবং তৃণমূলের প্রতিভা তুলে আনতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এমন উদ্যোগ নিয়েছেন।’
৪ হাজার ৪৯৯ ইউনিয়নে মাঠ নির্মাণের উদ্যোগ
যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে দেশের ৪ হাজার ৪৯৯টি ইউনিয়নে একটি করে কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ নির্মাণ অথবা বিদ্যমান মাঠ আধুনিকায়নের জন্য উপযুক্ত জমি চিহ্নিত করার কাজ শুরু করেছে। এ লক্ষ্যে মন্ত্রণালয় থেকে সব সংসদ সদস্যের কাছে আধা-সরকারি (ডিও) চিঠি পাঠানো হয়েছে। প্রতিটি ইউনিয়নে অন্তত ৮ বিঘা জমি নির্ধারণ করে সেখানে বহুমুখী ক্রীড়া সুবিধাসম্পন্ন কেন্দ্রীয় মাঠ গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
আন্তমন্ত্রণালয় সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) প্রতিটি ইউনিয়নে সম্ভাব্য মাঠ চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সংস্কার, উন্নয়ন কিংবা নতুন মাঠ নির্মাণের প্রস্তাব পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদেরও এ কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা হয়েছে।
কৃষিজমি রক্ষা করে মাঠ নির্মাণ
সরকারি নির্দেশনায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, নতুন মাঠ নির্মাণের জন্য কোনো অবস্থাতেই কৃষিজমি নষ্ট করা যাবে না। ভূমি একটি সীমিত জাতীয় সম্পদ হওয়ায় ইউনিয়নের মধ্যবর্তী স্থান, সরকারি খাসজমি অথবা গ্রোথ সেন্টারের আশপাশের জমিকে অগ্রাধিকার দিয়ে মাঠ নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী মাঠগুলোতে ফুটবল, ক্রিকেট, ভলিবল, কাবাডিসহ বিভিন্ন খেলাধুলার সুযোগ থাকবে। পাশাপাশি থাকবে বাউন্ডারি ওয়াল, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, দর্শক বসার স্থান এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য স্থানীয় প্রশাসনের নেতৃত্বে ব্যবস্থাপনা কমিটি।
আরও ২৯৪ উপজেলায় ক্রীড়া অফিস
ক্রীড়া কার্যক্রমকে মাঠপর্যায়ে আরও গতিশীল করতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সম্প্রতি আরও ২৯৪টি উপজেলায় উপজেলা ক্রীড়া অফিস স্থাপনের জন্য ৮৮২টি নতুন পদ সৃষ্টির অনুমোদন দিয়েছে। ৯ জুলাই জারি করা প্রজ্ঞাপনে এ সম্মতি দেওয়া হয়।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী প্রতিটি উপজেলায় একজন উপজেলা ক্রীড়া অফিসার, একজন অফিস সহকারি কাম-কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক এবং একজন অফিস সহায়ক নিয়োগ দেওয়া হবে। এর আগে, মিনি স্টেডিয়াম থাকা ২০১টি উপজেলায় ৬০৩টি পদ সৃজনে সম্মতি দেওয়া হয়েছিল। নতুন সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে পর্যায়ক্রমে দেশের সব উপজেলায় ক্রীড়া অফিস স্থাপন সম্ভব হবে।
অবশ্য, এসব পদ কার্যকর হওয়ার আগে অর্থ বিভাগের সম্মতি, স্কেল ভেটিং, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রশাসনিক উন্নয়ন-সংক্রান্ত সচিব কমিটির অনুমোদন এবং প্রয়োজনীয় নিয়োগ বিধিমালা সংশোধনের শর্ত দেওয়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক মানের স্পোর্টস ভিলেজ
সরকারের আরেকটি বড় পরিকল্পনা হলো দেশের আটটি বিভাগ এবং ফরিদপুর ও কুমিল্লাসহ মোট ১০টি অঞ্চলে আন্তর্জাতিক মানের স্পোর্টস ভিলেজ নির্মাণ। এসব স্পোর্টস ভিলেজে আধুনিক ইনডোর স্টেডিয়াম, সুইমিং পুল, আর্চারি, শুটিং, ফুটবল, অ্যাথলেটিক্সসহ বিভিন্ন ডিসিপ্লিনের আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ ও প্রতিযোগিতার সুযোগ থাকবে। এর মাধ্যমে দেশের খেলোয়াড়দের বিদেশে প্রশিক্ষণের ওপর নির্ভরতা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তৃণমূলের প্রতিভা খুঁজে আনার সুযোগ বাড়বে
ক্রীড়া সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উপজেলা পর্যায়ে ক্রীড়া অফিস চালু হলে গ্রামাঞ্চলের প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের চিহ্নিত করা সহজ হবে। তাদের বিকেএসপি, বিভাগীয় ক্রীড়া একাডেমি এবং জাতীয় প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা যাবে।
শিশু-কিশোরদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে সরকার ইতোমধ্যে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ কর্মসূচি চালু করেছে।
যুব ও ত্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক বলেন, ‘ইউনিয়নভিত্তিক খেলার মাঠ, উপজেলা পর্যায়ে ক্রীড়া অফিস, স্পোর্টস ভিলেজ এবং তৃণমূল পর্যায়ে নিয়মিত ক্রীড়া প্রতিযোগিতা চালু হলে দেশের ক্রীড়া ব্যবস্থাপনায় গুণগত পরিবর্তন আসবে। গ্রাম থেকে নতুন প্রতিভা উঠে আসবে, মেয়েদের অংশগ্রহণ বাড়বে, স্থানীয় ক্লাবগুলো আরও সক্রিয় হবে এবং সরকারি সহায়তা মাঠপর্যায়ে দ্রুত পৌঁছাবে।’
তার মতে, এই উদ্যোগগুলো কেবল জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানের খেলোয়াড় তৈরির ক্ষেত্রেই নয়, বরং তরুণদের মাদক, কিশোর অপরাধ ও সামাজিক অবক্ষয় থেকে দূরে রেখে সুষ্ঠু সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।


