‘তৌহিদি জনতা’ ব্যানারে সক্রিয় কয়েকটি গোষ্ঠীর বাধায় ক্রমাগত চাপের মুখে পড়ছে দেশের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল। কনসার্ট, সিনেমা প্রদর্শনী ও সামাজিক অনুষ্ঠানে বাধা দেওয়ার পাশাপাশি মাজার ও দরগায় হামলার ঘটনায় দেশের বুদ্ধিজীবী, শিল্পী ও আলেমদের মধ্যে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দেশের বিভিন্ন স্থানে এসব বাধা প্রকাশ্যে এসেছে। কোথাও অনুষ্ঠান পণ্ড করা হয়েছে, কোথাও কনসার্টের বিরোধিতা করা হয়েছে, আবার কোথাও ঐতিহ্যবাহী সামাজিক আয়োজন বন্ধের দাবি তোলা হয়েছে।
সিলেটের বিয়ানীবাজারে আগামী ২৮ আগস্ট সুনাই নদীতে নির্ধারিত ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। ‘তৌহিদি জনতা’ ব্যানার ব্যবহার করে একটি দল ফেসবুকে প্রচার চালিয়ে এটি বাতিলের দাবি জানাচ্ছে। এ ছাড়া গত বৃহস্পতিবার বারইগ্রাম বাজার মসজিদে ‘তৌহিদি জনতা লাউতা ইউনিয়ন’ ব্যানারে প্রকাশ্যে সভা করে তারা একই দাবি জানিয়েছে।
এর আগে ১৯ আগস্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পুলিশ লাইন্সে উচ্চশব্দে গান বাজানোর অভিযোগ তুলে দারুল আরকাম ইসলামিয়া মাদ্রাসার কয়েকজন শিক্ষার্থী একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বাধা দেয়। পরে শতাধিক মাদ্রাসা শিক্ষার্থী অনুষ্ঠানস্থলে ঢুকে ভাঙচুর চালালে সংঘাতের সৃষ্টি হয়। ঘটনার পর পুলিশ জানায়, ‘আমি এমনভাবে আমার দায়িত্ব পালন করব, যাতে অন্য কারও কোনো ক্ষতি না হয়।’
একই দিনে কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলা ইমাম-উলামা পরিষদ পুরোনো স্টেডিয়ামে আয়োজিত ব্যান্ডের কনসার্টকে ‘শরিয়তবিরোধী’ আখ্যা দিয়ে তা বাতিলের দাবি জানায়। তারা প্রতিবাদ কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়ার পর কনসার্ট স্থগিত হলে কর্মসূচি তুলে নেয়।
তারও আগে গত ৩০ মে ঈদুল আজহা উপলক্ষে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফিল্ম সোসাইটি আয়োজিত ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমার প্রদর্শনী বন্ধ হয়ে যায়। কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদের শিক্ষার্থীরা ফেসবুকে প্রচারণা চালালে প্রদর্শনী স্থগিত করা হয়।
সিনেমা প্রদর্শনী বন্ধ করার ‘আন্দোলনে’ নেতৃত্ব দেওয়া সংগঠনটির নেতা নাসরুল্লাহ মুয়াজ সিনেমার পোস্টারে লাল ক্রস চিহ্ন দিয়ে ফেসবুকে লেখেন, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া আলেমদের শহর। আল্লামা ফখরে বেঙ্গল একসময় এই শহরে সিনেমা বন্ধ করেছিলেন। আর এখন কিছু ষড়যন্ত্রকারী দল আবার সিনেমা প্রদর্শনী চালুর চেষ্টা করছে।’
পরপর এসব ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের সাংস্কৃতিক কর্মীরা। তাদের আশঙ্কা, বারবার বাধা ও গোলযোগের কারণে সাংস্কৃতিক চর্চার পথ দিন দিন সংকুচিত হয়ে যাবে।
চলচ্চিত্র নির্মাতা আশফাক নিপুণ বলেন, ইচ্ছামতো সাংস্কৃতিক কাজ বন্ধ করে দেওয়ার এই প্রবণতা সরকারকে আইনিভাবে বন্ধ করতে হবে। ‘সরকার যদি নিজেদের সংস্কৃতিবান্ধব হিসেবে প্রমাণ করতে চায়, তবে যার যা খুশি বন্ধ করে দেওয়ার এই অপসংস্কৃতি আইনের মাধ্যমে থামাতে হবে।’
বাউল শিল্পী আরিফ দেওয়ান জানান, স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় এ ধরনের বাধা দেখতে হয়নি। কিন্তু সাম্প্রতিক হামলা ও অপ্রীতিকর ঘটনাগুলো সরাসরি লোকসংস্কৃতিকে আঘাত করছে এবং সংঘাতের প্রবণতা তৈরি করছে। এর জন্য তিনি একটি ‘উগ্র সুযোগসন্ধানী দলকে’দায়ী করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ও নাট্যকর্মী সামিনা লুৎফা টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, এসব ঘটনা মূলত সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের সংঘাত থেকে তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি বৈচিত্র্যময় ও অন্তর্ভুক্তিমূলক। কিন্তু বর্তমানে তা বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সংঘাতের মুখে পড়ছে।
সংসদে দাঁড়িয়ে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বলেন, ‘যারা দেশকে পেছনে ও অন্ধকারের দিকে নিতে চায় এবং বাংলাদেশকে চরমপন্থী রাষ্ট্র হিসেবে দেখাতে চায়, তারাই এসব কর্মকাণ্ডের পেছনে রয়েছে।’
উদ্বেগ বাড়াচ্ছে মাজার হামলা
পুরো পরিস্থিতির নেপথ্যে রয়েছে ধারাবাহিকভাবে ঘটে যাওয়া মাজার হামলার ঘটনা। ‘মাকাম: সেন্টার ফর সুফি হেরিটেজ’-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আন্দোলনের পর থেকে এ পর্যন্ত ১০৩টি মাজারে হামলার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ৯৭টি ঘটেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়কালে।
এসব ঘটনায় ভাঙচুর, অগ্নিকাণ্ড, লুটপাট ও প্রাণহানি ঘটেছে। গত ১১ এপ্রিল কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগে ‘পীর’ শামীম রেজাকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
সংস্থাটি জানায়, এতগুলো হামলার পরও মাত্র ১২টি মামলা হয়েছে। বেশিরভাগ তদন্তেই দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই, উল্লেখযোগ্য কেউ গ্রেপ্তারও হয়নি।
ক্রমাগত ঘটে যাওয়া এসব ঘটনা বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ওপর কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে চিন্তিত বিশ্লেষক ও চিন্তাবিদরা।
এই পরিস্থিতিকে ‘ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের’সঙ্গে তুলনা করেছেন লেখক ও চিন্তাবিদ ফরহাদ মজহার। তিনি টাইমসকে বলেন, ‘সহিংসতা ইসলামের পথ নয়। যারা নিরপরাধ মানুষের ওপর নির্যাতন জানায়, তারা মহানবীর (সা.) অনুসারী হতে পারে না।’
তিনি আরও বলেন, নিপীড়নের মাধ্যমে অন্যের ওপর নিজের মত চাপিয়ে দেওয়া অপরাধ। সাধারণ মানুষ হয়ে পরম সত্যের মালিক সেজে কেউ ঐশ্বরিক ক্ষমতার বাহাদুরি দেখাতে পারে না।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এসব ঘটনা বাংলাদেশের লোক ঐতিহ্য, বহুত্ববাদ এবং নানা সংস্কৃতি বিরোধী শক্তির উত্থানকে নির্দেশ করছে। তিনি ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোকে লোক ঐতিহ্য, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও ভিন্ন বিশ্বাসের সহাবস্থানের বিষয়ে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করার আহ্বান জানান।
সহিংসতা প্রত্যাখ্যান আলেমদের
ইসলাম ধর্মের আলেমরাও সার্বিক ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
ঢাকার তাকওয়া মসজিদের ইমাম ও ইসলামিক পণ্ডিত মুফতি সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘ইসলাম কোনোভাবেই এ ধরনের হামলা সমর্থন করে না। যেকোনো অভিযোগ থাকলে প্রশাসনের কাছে যাওয়া যেতে পারে, তবে নিজের হাতে আইন তুলে নিয়ে হামলা চালানো অবৈধ।’
ইসলামিক ফাউন্ডেশনে ১৮ বছরের বেশি সময় মুহাদ্দিস হিসেবে দায়িত্ব পালন করা গবেষক ওয়ালিউর রহমান বলেন, এ ধরনের ঘটনা প্রায়ই স্থানীয় যুবক বা কম ধর্মীয় জ্ঞানসম্পন্ন মানুষদের দ্বারা ঘটে। তার মতে, মসজিদ থেকে বের হওয়ার পর অনেকে উত্তেজিত হয়ে পড়েন এবং পরবর্তীতে এসব হামলায় জড়িয়ে যান।
বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের আমীরে শরিয়ত আল্লামা আবু জাফর কাসেমী সংক্ষেপে বলেন, ‘মতের পার্থক্য যতই থাকুক না কেন, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার কারও নেই।’


