রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ওরফে জুয়েল (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী (২৫) ও ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়মের (১২) মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন- কানুদাসের ছেলে মুগ্ধ দাস (২৩) ও বিনয়চন্দ্র দাসের ছেলে সিদ্ধার্থ দাস (১৯)। তারা নিহতদের পূর্ব পরিচিত বলে ধারণা করা হচ্ছে। রোববার দুপুর ১২টার দিকে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরএমপি) কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ এক সংবাদ সম্মেলন এসব তথ্য জানান। এ ঘটনায় জিজ্ঞাসবাদের জন্য সন্দেহভাজন হিসেবে প্রথমে তিনজনকে আটক করা হয়েছিল।
শনিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে স্বজনদের মাধ্যমে খবর পেয়ে বাড়ির বিভিন্ন ঘর, চিলেকোঠা ও ছাদ থেকে ভুক্তভোগীদের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
পুলিশ জানায়, গণপতি চক্রবর্তী জিলা স্কুলের হিসাব বিজ্ঞান বিষয়ের শিক্ষক ছিলেন। অবসর নেওয়ার পর তিনি পরিবার নিয়ে নগরীর মাছুয়াপাড়া মন্দির এলাকার দোতলা বাড়িতে থাকতেন। সেখানেই তিনি হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা চেম্বার পরিচালনা করতেন। ওই বাড়ির ছাদে মাদক সেবনে বাধা দেওয়ায় তাদের হত্যা করা হয়েছে।
পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ বলেন, পাশের বাড়ির ছাদ হয়ে অভিযুক্তরা বৃহস্পতিবার রাতে গণপতির বাড়ির ছাদে আসে ও ইয়াবা সেবন করে। তারা সম্পর্কে মামা-ভাগ্নে। এ সময় শব্দ পেয়ে ছাদে এসে তাদের অবস্থানের জানতে চাইলে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় অভিযুক্তরা গণপতির গলায় থাকা গামছা পেঁচিয়ে তাকে হত্যা করেন। তার চিৎকারে স্ত্রী প্রীতিলতা এগিয়ে এলে তাকেও একইভাবে গলায় গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়।
একসময় মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তী চিলেকোঠায় এগিয়ে এলে তাকেও ছাদে থাকা রশি ও গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ। পরে বাড়ির ভেতরে ঢুকে শিশু প্রিয়মকে ঘুমন্ত অবস্থায় মুখে কাপড় পেঁচিয়ে ও বালিশচাপা দিয়ে হত্যা করা হয়।
গ্রেপ্তারকৃতরা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানান, হত্যাকাণ্ডের পর তারা বাসার একটি বাথরুমে গোসল করেন এবং ডাইনিং টেবিলে রাখা খেজুর খান ও ইয়াবা সেবন করেন। ওই রাতে তারা গণপতির বাড়িতেই ছিলেন। পরদিন শুক্রবার জুমার নামাজের সময় রাস্তাঘাট ফাঁকা থাকায় সেই সুযোগে তারা পরিবারটির স্বর্ণালংকার নিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে যান। মূলত তাদের পরিচয় গোপন রাখতে এবং ঘটনাটিকে ডাকাতির দিকে প্রবাহিত করতেই তারা আসবাবপত্র ভাঙচুর করেন। গয়নাগুলো কাছের একটি মন্দিরের পেছনে পরিত্যক্ত জায়গা থেকে জব্দ করা হয়েছে বলেও জানায় পুলিশ।
নিহত গণপতি চক্রবর্তীর শ্যালিকা পূজা রানী বলেন, শনিবার রাত পৌনে ১০টার দিকে প্রথমে তিনি বোনকে ফোন করেন ও ফোন বন্ধ পান। পরে ভাগ্নি, দুলাভাই ও ছোট ভাগ্নেকে ফোন করেও সবার ফোন বন্ধ পান। এতে তার সন্দেহ হয়। এরপর স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে বোনের বাড়িতে যান।
বাইরে থেকে কারও সাড়া না পাওয়ায় স্থানীয়দের সহায়তায় প্রাচীর টপকে তারা ভেতরে প্রবেশ করেন এবং বাইরে থেকে জানালা খুলে ভেতরের সবকিছু এলোমেলো দেখতে পান। একই সঙ্গে ভেতর থেকে তীব্র দুর্গন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল। একপর্যায়ে মরদেহ দেখতে পেয়ে স্থানীয়রা পুলিশে খবর দেন।
পরে কোতোয়ালি থানা-পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিটসহ পুলিশের বিভিন্ন শাখার সদস্যরাও ঘটনাস্থলে যান। এ সময় বাড়ির বিভিন্ন কক্ষের জিনিসপত্র এলোমেলো এবং টাকা-পয়সা ও স্বর্ণালংকার রাখার স্থানগুলো ভাঙাচোরা অবস্থায় পাওয়ায় প্রথম দিকে এটিকে ডাকাতি করতে এসে হত্যা হিসেবে ধারণা করা হয়েছিল। বাড়ির বৈদ্যুতিক সংযোগও বিচ্ছিন্ন ছিল।


