রাজধানীজুড়ে ১১৭টি পেশাদার ছিনতাইকারী গ্যাং এবং ১ হাজার ৩৮৭ জন অপরাধীর তালিকা তৈরি করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। এসব অপরাধীর অনেকে গ্রেপ্তার এড়িয়ে যাচ্ছে, কেউ কেউ জামিনে বেরিয়েই আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, তালিকার প্রায় ৮০ শতাংশ অপরাধীর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। অনেকেই প্রতিনিয়ত জায়গা বদল করে পুলিশের নজর এড়িয়ে চলে, আর বাকিরা জামিনে মুক্ত হয়েই আগের কাজে ফিরে যায়।
সংগঠিত ছিনতাইয়ের এই তাণ্ডব থামাতে পুলিশ ব্যর্থ হওয়ায় দিনদুপুরে গুলিবর্ষণ আর ছুরি ঠেকিয়ে ডাকাতি এখন ঢাকার নিত্যদিনের আতঙ্কে পরিণত হয়েছে।
কার্যকর কোনো সরকারি পদক্ষেপ না থাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ দিন দিন বাড়ছে। এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর ফুপাতো ভাইয়ের মালিকানাধীন একটি পেট্রল পাম্পে ১ কোটি ২১ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে।
এই অপরাধী গ্যাংগুলোর এমন ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকা পুলিশের অপরাধ দমনের কৌশলকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
মিরপুর, মোহাম্মদপুর, তেজগাঁও, উত্তরা ও গুলশানে গুলি, ছুরিকাঘাত ও অস্ত্র দেখিয়ে একের পর এক ডাকাতির ঘটনায় জনমনে আতঙ্ক আরও বেড়ে গেছে।
ডিএমপির সাবেক কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভেতরের পদ্ধতিগত ত্রুটির কথা তুলে ধরেছেন। টাইমস অব বাংলাদেশ’কে তিনি জানান, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর কৌশল ব্যবহারে পুলিশ ব্যর্থ হচ্ছে। বর্তমানে কোনো যৌথ প্রচেষ্টা বা চেইন অব কমান্ড নেই এবং দক্ষ কর্মকর্তাদের সঠিক জায়গায় বসানো হচ্ছে না। অপরাধীরা এই সুযোগেরই সুবিধা নিচ্ছে। একই সঙ্গে গোয়েন্দা নজরদারি ও অভিযান জোরদার করার তাগিদ দেন তিনি।
এর আগে সাজ্জাত আলী মাঠপর্যায়ের একটি বাস্তব সমস্যার কথা তুলে ধরে বলেছিলেন, বুট জুতা পরা পুলিশ সদস্যদের পক্ষে স্নিকার্স পরা দ্রুতগতির ছিনতাইকারীদের পিছু ধাওয়া করে ধরা বেশ কঠিন হয়ে পড়ে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক তৌহিদুল হক জানান, অপরাধীরা দেশের বিচার ব্যবস্থার সুযোগ নেয়। ছিনতাইকে যখন তুলনামূলক ছোট অপরাধ হিসেবে দেখা হয়, তখন অপরাধীরা এর পুরো ফায়দা তোলে। এ ছাড়া প্রান্তিক পর্যায়ের মাদকাসক্তরা দিন দিন জীবনধারণের জন্য ছিনতাইয়ের পথ বেছে নিচ্ছে।
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মোহাম্মদ ওসমান গনি অর্থনৈতিক সংকট ও সহজ জামিন প্রক্রিয়াকে এর মূল কারণ মনে করেন। তিনি জানান, জামিন পাওয়ার পরপরই অনেকে আবার অপরাধে নেমে পড়ে। পেশাদার ছিনতাইকারীদের প্রকৃত ঝুঁকির কথা আদালতে সঠিকভাবে তুলে ধরা গেলে হয়ত এই অপরাধ কমানো সম্ভব হতো।
চাঞ্চল্যকর ঘটনা
উত্তরায় ১ কোটি ২১ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনাটি ঘটে এক রোববার সকালে, র্যাব-১ কার্যালয়ের ঠিক উল্টো পাশে ক্রাউন প্লাজা হোটেলের সামনে। ছিনতাই হওয়া টাকা ছিল ডিএল ফিলিং স্টেশনের, যার যৌথ মালিক প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ফুপাতো ভাই তাসিন আক্তার হক ও তার ব্যবসায়ী অংশীদার ইয়াসিন।
এ ঘটনায় পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। বিমানবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামরুল হাসান তালুকদার জানান, সিসিটিভি ক্যামেরায় সন্দেহভাজনদের দেখা গেছে। তবে ছিনতাইয়ে ব্যবহার করা মোটরসাইকেলটিতে ভুয়া নম্বর প্লেট থাকায় মূল মালিককে খুঁজে পেতে কষ্ট হচ্ছে।
একই ধরনের অন্যান্য কয়েকটি ঘটনার এখনো সমাধান হচ্ছে না। গত ১১ জুন শেরেবাংলা নগরে ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে সোহেলী নামের এক নারী মারা যান। পুলিশ জানায়, স্থানীয় থানা মাত্র একজনকে গ্রেপ্তার করার পর মামলাটি গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে হস্তান্তর করা হয়।
এর আগে ১৯ মার্চ উত্তরার মেট্রো স্টেশন এলাকায় ছিনতাইকারী ব্যাগ ধরে টান দিলে রিকশা থেকে ছিটকে পড়ে মারা যান মুক্তা আক্তার নামের এক গৃহবধূ। তুরাগ থানার ওসি মোস্তাফিজুর রহমান জানান, মামলাটি বর্তমানে ডিবি তদন্ত করছে। তবে আগে স্থানীয় পুলিশ এক সন্দেহভাজনকে শনাক্ত করেছিল।
আরেকটি দুঃসাহসিক ঘটনা ঘটে ৭ জুন বিকালে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে। সেখানে লোকমান নামের এক মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসায়ীকে গুলি করে ১৭ হাজার মার্কিন ডলার ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা। ডিএমপির মতিঝিল বিভাগের উপ-কমিশনার হারুন-অর-রশীদ জানান, এই তদন্তটিও ডিবিতে পাঠানো হয়েছে। তবে কাউকে আটক করা হয়েছে কি না, তা তিনি জানাতে পারেননি।
পুলিশের তথ্যে আংশিক চিত্র
পুলিশ সদর দপ্তর ও ডিএমপি খুন-ডাকাতির হিসাব প্রকাশ করলেও ছিনতাইয়ের জন্য আলাদা কোনো হিসাব রাখে না। কর্মকর্তারা সাধারণত ছিনতাইকেও ডাকাতির হিসাবে মিলিয়ে দেন।
পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাব মতে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই মাসের মধ্যে সারাদেশে ১ হাজার ৬৭টি ডাকাতির মামলা হয়েছে, যার মধ্যে ১৭৮টি ঘটেছে ডিএমপি এলাকায়। মাসে গড়ে এই সংখ্যা ২২ থেকে ৩৩টির মধ্যে ছিল। তবে পুলিশ স্বীকার করে, এই পরিসংখ্যানে আসল চিত্র পাওয়া যায় না। কারণ অনেক ভুক্তভোগীই পুলিশে অভিযোগ করতে যান না।
পুলিশের তালিকায় ১ হাজার ৩৮৭ জন অপরাধী
ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীজুড়ে বর্তমানে ১ হাজার ৩৮৭ জন সক্রিয় ছিনতাইকারী রয়েছে, যারা ১১৭টি গ্যাংয়ে বিভক্ত। প্রতিটি গ্যাংয়ে ১০ থেকে ২০ জন করে সদস্য থাকে। সবচেয়ে বেশি অপরাধী রয়েছে ওয়ারী বিভাগে, ৩০৮ জন। এরপর তেজগাঁও ও উত্তরায় রয়েছে ২৪০ জন করে। অন্যদিকে সবচেয়ে কম অপরাধী মিরপুরে, ৫৩ জন।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. ওমর ফারুক জানান, এই চক্রগুলো কখনো একা কাজ করে না। টাইমস’কে তিনি বলেন, একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মাধ্যমে রাজনৈতিক আশ্রয় পাওয়ার কারণেই ছিনতাইকারীরা পার পেয়ে যায়। অনেক সময় আগে থেকেই সুযোগ বুঝে পরিকল্পনা করে ভুক্তভোগীকে টার্গেট করা হয়। পুলিশি দ্বিধাদ্বন্দ্ব আর কাঠামোগত দুর্বলতার সুযোগ নিয়েই অপরাধী চক্রগুলো নির্দ্বিধায় অপরাধ চালিয়ে যাচ্ছে।


