তেজগাঁওয়ে ব্যাটারিচালিত রিকশার অবৈধ চার্জিংয়ের বিরুদ্ধে অভিযানের পরও ফুটপাত ও রাস্তার পাশে প্রকাশ্যেই ব্যাটারি চার্জ করার দৃশ্য দেখা যায়। ঢাকা মহানগর ট্রাফিক বিভাগ রাজধানীজুড়ে এমন প্রায় ৫০ হাজার অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট চিহ্নিত করেছে। তবে এটি পুরো শহরের চিত্র নয়, আরও অনেক এলাকা তাদের জরিপের বাইরে রয়েছে।
বাড্ডার এক গলির মোড়ে রাস্তার ধারের টং দোকানে সকালের নাস্তা শেষ করলেন ৪৮ বছর বয়সী রশিদ। ধীর পায়ে এগিয়ে চললেন একটি রিকশার গ্যারেজের দিকে, যেটি কখনো বন্ধ হয় না। পালাক্রমে দিন ও রাতের শিফটের চালকদের সেবা দিতে সদা প্রস্তুত এই আস্তানা।
ভেতরে রশিদের রিকশাটি আরও ছয়টি রিকশার সঙ্গে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে। প্রতিটির মাথায় ঝুলছে লাল তার, যা সরাসরি সিলিংয়ের সকেট থেকে নেমে এসে ব্যাটারির শরীরে গুঁজে দেওয়া। রিকশাগুলো টানা ১২ ঘণ্টা ধরে চার্জ হচ্ছিল।
সেই গ্যারেজের মালিক দাবি করলেন, ১২টি ব্যাটারিচালিত রিকশা চার্জ করতে গিয়ে তার প্রতি মাসে আনুমানিক তিন হাজার টাকা বিদ্যুৎ বিল দিতে হয়। কিন্তু হিসাব বলছে ভিন্ন কথা। ১২টি রিকশার একটি মাঝারি গ্যারেজে প্রতিদিন বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয় ১৭ দশমিক ২৮ কিলোওয়াট ঘণ্টা, এই হিসাবে মাসে দাঁড়ায় প্রায় ৫১৮ কিলোওয়াট ঘণ্টা। বর্তমান হারে আবাসিকে এই পরিমাণ বিদ্যুৎ খরচ করলে বিল আসার কথা ৫ হাজার ৭০০ টাকার মতো, আর বাণিজ্যিক হলে ৮ হাজার ৩০০ থেকে ৮ হাজার ৮০০ টাকা।
চার্জিং বাবদ চালকদের কাছ থেকে প্রতিদিন আদায় করা হচ্ছে ৯০ টাকা। এই হিসাবে মাসে একটি রিকশা থেকে আসে ২ হাজার ৭০০ টাকা এবং ১২টি রিকশা থেকে আসে ৩২ হাজার ৪০০ টাকা। অর্থাৎ রিকশা চার্জ দেওয়ার ব্যবসা আর্থিকভাবে বেশ লাভজনক। আর যদি অবৈধ সংযোগ থেকে চার্জ দেওয়া যায়, তাহলে আয়ের প্রায় পুরোটাই পকেটে ঢোকানো সম্ভব।
এই বিষয়টি কোনো গোপন কিছু নয়। পুলিশও মাঝেমধ্যে বেশ জোরেশোরে অভিযানে নামে, কিন্তু কদিন পর আবার ‘যেই লাউ সেই কদু’ পরিস্থিতি দেখা যায়। জুনের শেষে তেজগাঁওয়ে ঢাকা পলিটেকনিক কলেজের পেছনে রাস্তার পাশে অবৈধ চার্জিং স্টেশনে বিদ্যুতের সংযোগ কেটেছিল পুলিশ। কিন্তু কদিন পরেই সেই কাটা লাইনে ফের রিকশা চার্জ দিতে দেখা গেছে।
বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি ডিপিডিসি জানিয়েছে, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলে সরকার অনুমোদিত চার্জিং স্টেশন কেবল ১২টি। সেখানে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে তারা ১৭টি অভিযান চালিয়েছে।
বাসাবো এলাকায় বেশ কয়েকটি গ্যারেজ আছে। এর একটিতে রিকশা রাখেন মো. শাহেদ।
তিনি বলেন, গ্যারেজগুলো মূল সড়কের পাশে নয় এবং সেখানে এখনো পুলিশ কোনো অভিযান চালায়নি। তার মতে, ‘তেজগাঁওয়ের গ্যারেজগুলোর বেশিরভাগই মূল সড়কের পাশে। সেখানে চার্জিং কার্যক্রম সবার চোখে পড়ে, তাই পুলিশ সেখানে অভিযানে গেছে।’
তেজগাঁওয়ে কেটে দেওয়া সংযোগে নতুন করে চার্জিংয়ের ব্যবস্থা করার বিষয়ে চালক টিটু মিয়া বলেন, তিনি বাড্ডার একটি গ্যারেজে রিকশা রাখেন। চালাতে চালাতে চার্জ শেষ হয়ে গেলে বাড্ডায় ফিরে যেতে সময় ও খরচ দুটোই বেশি লাগে, তাই তিনি পথিমধ্যেই তেজগাঁওয়ে চার্জ দেন। পাশে থাকা এক ব্যক্তি জানান, এখানে প্রতি ঘণ্টার চার্জিংয়ের জন্য ৫০ টাকা নেওয়া হয়।
কেবল বিদ্যুৎ চুরি নয়, রয়েছে অন্য ঝুঁকিও। বুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক এবং ডেসকোর বোর্ড মেম্বার মো. জিয়াউর রহমান খান টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘ই-রিকশার ক্রমবর্ধমান সংখ্যা অবশ্যই জাতীয় গ্রিডে প্রভাব ফেলছে। আগে বিদ্যুতের ‘পিক আওয়ার’ ছিল সন্ধ্যা ৬টা থেকে ৭টা, কিন্তু চার্জিংয়ের কারণে তা এখন রাত ৯-১০টা পর্যন্ত দীর্ঘায়িত হচ্ছে। অবৈধ ও অনুমোদনহীন সংযোগের কারণে ট্রান্সফরমার ওভারলোড হয়ে অনেক সময় পুড়ে যাচ্ছে।’
গ্যারেজগুলোতে ব্যবহৃত বাণিজ্যিক চার্জিং সিস্টেম অত্যন্ত অদক্ষ এবং এটি গ্রিডে মারাত্মক ‘হারমোনিক্স’ তৈরি করে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, এর ফলে বিদ্যুতের অপচয় হয় এবং ডিস্ট্রিবিউশন ট্রান্সফরমার বিকল হয়ে পড়ে।
সড়ক পরিবহন নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিআরটিএ’র তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত ঢাকা শহরে নিবন্ধিত থ্রি-হুইলার বা নির্দিষ্ট যানবাহনের সংখ্যা ২০ হাজার ৯৮৭টি। প্রতিটি রিকশা দৈনিক ১ দশমিক ৪৪ কিলোওয়াট ঘণ্টা (মাসে ৪৩.২ কিলোওয়াট ঘণ্টা) বিদ্যুৎ ব্যবহার করে। সেই হিসেবে ২১ হাজার অটোরিকশার বহরটি ঢাকায় প্রতিদিন প্রায় ৩০ মেগাওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ ব্যবহার করে।
তবে ঢাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা তিন লাখের বেশি বলেই ধারণা করা হয়। সেই হিসাবে এগুলো ঢাকায় অন্তত ৪৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহার করে, যা রাজধানীতে ব্যবহৃত বিদ্যুতের প্রায় এক-দশমাংশ। এর মধ্যে অবৈধভাবে কতগুলো রিকশা চার্জ করা হয়, সেই হিসাব কষা সম্ভব নয়।
বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে দেশজুড়ে কেবল ৩ হাজার ৩০০টি চার্জিং স্টেশনের অনুমোদন দিয়েছে। এর মধ্যে ডিপিডিসির অধীনেই রয়েছে ২ হাজার ১৪৯টি স্টেশন। কিন্তু ডিএমপি ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে রাজধানীর আটটি বিভাগে ৯৯২টি গ্যারেজ ও ৪৮ হাজার ১৩৬টি অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট শনাক্ত করেছে।
ডিএমপি আরও জানতে পেরেছে, কেবল মতিঝিল বিভাগে ১ হাজার ৩৯০টি চার্জিং পয়েন্ট ও ৬০টি গ্যারেজ রয়েছে। লালবাগে রয়েছে ১৯৯টি চার্জিং পয়েন্ট ও ৭৭টি গ্যারেজ। তেজগাঁও বিভাগে ২৩৪টি এবং রমনা বিভাগে ২৬টি অবৈধ গ্যারেজ শনাক্ত করা হয়েছে।
অবশ্য ডেসকোর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ সায়েদুর রহমান টাইমসকে বলেন, সব গ্যারেজ অবৈধ বা নিবন্ধনহীন নয়। অনেক গ্যারেজ মালিক তাদের কাছ থেকে মিটার নিয়ে নির্ধারিত বিল পরিশোধ করেন। আর সাধারণত রাত ১০টা বা ১১টার পর, যখন বিদ্যুতের চাহিদা কম থাকে, তখনই চার্জিং করা হয়। ফলে এর কারণে লোডশেডিং হওয়ার আশঙ্কা খুবই কম।
আবাসিক সংযোগ থেকে অবৈধভাবে বিদ্যুৎ নিয়ে গ্যারেজ পরিচালনার অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘এ ধরনের কিছু অভিযোগ রয়েছে। তবে বড় পরিসরে অবৈধ সংযোগ রয়েছে বলে আমরা মনে করি না। তারপরও কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে আমরা তাৎক্ষণিক অভিযান পরিচালনা করি।’


