সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে সই হওয়া ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ ইসলামাবাদ ও নয়াদিল্লির মধ্যকার নিরাপত্তা সমীকরণ নতুন করে সাজাতে পারে। এটি ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী করবে ও দুই দেশের মধ্যে সম্ভাব্য যেকোনো সামরিক সংঘাতের মাত্রা ও সম্ভাব্য মূল্য বৃদ্ধি করবে।
শুক্রবার মক্কায় স্বাক্ষরিত এই চুক্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে তা অন্য বাকি দেশগুলোর ওপর হামলা হিসেবে গণ্য হবে। ব্যবহারিক অর্থে, পাকিস্তানের ওপর ভারতের হামলা হলে সৌদি আরব ও তুরস্কের কাছ থেকে সহায়তা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। যদিও চুক্তিতে এই ধরনের সহায়তার ধরন ও মাত্রা সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু বলা হয়নি।
এ প্রেক্ষিতে ভারত এই ঘটনাপ্রবাহ ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। শুক্রবার এক নিয়মিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে এই চুক্তির বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল বলেন, ‘আমরা এই ঘটনাপ্রবাহ ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছি ও এ বিষয়ে আপনাদের আপডেট জানানো হবে।’
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সামরিক সংঘাতের সম্ভাব্য ঝুঁকি ও খরচ বাড়িয়ে দিয়ে এই চুক্তি দক্ষিণ এশিয়ায় একটি প্রতিরোধমূলক প্রভাব ফেলতে পারে।
তাদের মতে, একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষা কাঠামো আঞ্চলিক স্থায়িত্ব তৈরিতে এবং বাংলাদেশের মতো ছোট দেশগুলোর জন্য কৌশলগত সুবিধা তৈরি করতে অবদান রাখতে পারে।
সাবেক সচিব (মেরিটাইম অ্যাফেয়ার্স ইউনিট, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়) এবং অবসরপ্রাপ্ত রিয়ার অ্যাডমিরাল মো. খুরশেদ আলম বলেন, এই চুক্তির প্রভাব দক্ষিণ এশিয়া ও তার বাইরেও পড়বে।
তিনি বলেন, ‘মক্কা চুক্তির প্রভাব দক্ষিণ এশিয়া ও তার বাইরে বিদ্যমান।’ ভারতের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সক্ষমতা জোরদার করার সম্ভাবনার কারণে তিনি এটিকে পাকিস্তানের জন্য একটি ‘কৌশলগত জয়’ বলে বর্ণনা করেন।
আড়াই থেকে তিন ফ্রন্টের চিন্তা?
চুক্তিটি ভারতের বিদ্যমান কৌশলগত হিসাব-নিকাশকেও জটিল করে তুলতে পারে। ভারতের সামরিক ভাবনায় ‘আড়াই ফ্রন্টের যুদ্ধ’ একটি নিকৃষ্টতম সামরিক পরিস্থিতি, যেখানে চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে একযোগে প্রচলিত যুদ্ধ পরিচালনার পাশাপাশি ভেতরের নিম্ন-মাত্রার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা হুমকি মোকাবিলার পরিকল্পনা করা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এই নতুন চুক্তি ভারতীয় পরিকল্পনাবিদদের পাকিস্তানের নতুন সহযোগীদের অন্তর্ভুক্ত করে একটি বৃহত্তর নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের সম্ভাবনা বিবেচনা করতে বাধ্য করতে পারে। এটি পরবর্তীতে ভারতের সামরিক প্রস্তুতি ও ব্যয় বাড়াতে উৎসাহিত করতে পারে।
তবে, দেশগুলো যদি এই নতুন নিরাপত্তাব্যবস্থার জবাবে নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে শুরু করে, তাহলে এটি অঞ্চলে অস্ত্রের প্রতিযোগিতা উসকে দিতে পারে।
মক্কা চুক্তির ভাষা উত্তর আটলান্টিক চুক্তি সংস্থার (ন্যাটো) ৫ নম্বর অনুচ্ছেদের সঙ্গে অনেকটা মিলে যায়, যেখানে ন্যাটোর কোনো সদস্য রাষ্ট্রের ওপর সশস্ত্র আক্রমণকে সব সদস্যের ওপর আক্রমণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
চুক্তির পরিধি এখনো অস্পষ্ট
রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী বার্তা থাকলেও, বাস্তবে এই চুক্তি কীভাবে কার্যকর হবে তা নিয়ে কিছু প্রশ্ন থেকে গেছে।
স্বাক্ষরের পর জারি করা যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই চুক্তির লক্ষ্য হলো ‘যেকোনো আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যৌথ প্রতিরোধ জোরদার করা’। এতে উল্লেখ করা হয়েছে, তিন দেশের মধ্যে যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র আক্রমণ অন্য দেশগুলোর ওপর আক্রমণ হিসেবে বিবেচিত হবে।
তবে এই বিবৃতিতে প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্রের সুনির্দিষ্ট সামরিক বাধ্যবাধকতা কী হবে তা উল্লেখ করা হয়নি বা কোনো আক্রমণের ক্ষেত্রে এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রত্যক্ষ সামরিক হস্তক্ষেপ ঘটাবে কি না তাও স্পষ্ট করা হয়নি।
সাবেক রাষ্ট্রদূত আব্দুল হাই বলেন, প্রতিরক্ষা চুক্তিতে এই ধরনের বিধান থাকা স্বাভাবিক। বলেন, ‘সব প্রতিরক্ষা চুক্তিতেই সাধারণত এই ধরনের সাধারণ বিধান থাকে।’
তবুও তিনি মনে করেন, চুক্তিটি তাৎক্ষণিক প্রতিরোধ তৈরি করতে পারে এবং শান্তিকালীন গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ, প্রযুক্তিগত সহায়তা ও পরামর্শ প্রদানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে, যদি কোনো সদস্য দেশ আক্রান্ত হয়।
‘পূর্ণমাত্রার সামরিক অংশগ্রহণ সাধারণত একটি দূরবর্তী বিকল্প,’ যোগ করেন তিনি।
নতুন কৌশলগত বাস্তবতা
চুক্তিটিকে প্রধানত একটি কূটনৈতিক ও কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে এবং এর কার্যকারিতা বা বিশ্বাসযোগ্যতা ভবিষ্যৎ আঞ্চলিক সংকটের সময় পরীক্ষিত হবে।
যদি সৌদি আরব হুথি বা ইরানের মতো আঞ্চলিক শক্তির কাছ থেকে কোনো বড় সামরিক হুমকির সম্মুখীন হয়, তবে এর ব্যবহারিক তাৎপর্য আরও স্পষ্ট হতে পারে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মেহেদী হাসান এই চুক্তিকে পাকিস্তানের জন্য একটি বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘এটি পাকিস্তানের জন্য এক বিশাল কূটনৈতিক জয়। শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই নয়, তার বাইরেও পাকিস্তানের কূটনৈতিক প্রভাব বিস্তার ও গভীর হবে।’
পাকিস্তান ও সৌদি আরব আগেই ঘনিষ্ঠ প্রতিরক্ষা সহযোগিতার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছিল। অন্যদিকে, ২০২৫ সালের মে মাসে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বিদ্যমান উত্তেজনা উন্মুক্ত সংঘাতে রূপ নেয়। তুরস্কের সঙ্গে এই ত্রিপক্ষীয় চুক্তি এখন পাকিস্তানের কৌশলগত অংশীদারিত্বে নতুন এক মাত্রা যোগ করেছে।
দক্ষিণ এশিয়ার জন্য বিশ্লেষকরা বলছেন, মক্কা চুক্তির তাৎক্ষণিক গুরুত্ব প্রত্যক্ষ সামরিক হস্তক্ষেপের চেয়ে প্রতিরোধমূলক মানের মধ্যেই বেশি নিহিত।
যদি এটি ভবিষ্যতের সংঘাতের রাজনৈতিক ও সামরিক ঝুঁকি বাড়াতে সফল হয়, তবে এই অঞ্চলের ছোট দেশগুলো একটি আরও স্থিতিশীল আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিবেশ থেকে উপকৃত হতে পারে।


