হারিয়ে যাচ্ছে বানিশান্তার পায়ের নিচের শেষ মাটিটুকুও

হারিয়ে যাচ্ছে বানিশান্তার পায়ের নিচের শেষ মাটিটুকুও
নদীতীরে থাকা সরু রাস্তা। ছবি: সায়েদ মাহামুদুর রহমান/ টাইমস
Advertisement
Advertisement

সূর্য যখন অস্ত যায়, বঙ্গোপসাগরের উপকূল ঘেঁষে বয়ে চলা পশুর নদীর ওপর হালকা কুয়াশা নেমে আসে। বাতাসে ভেসে আসে লবণের গন্ধ, আর পায়ের নিচের স্যাঁতসেঁতে, ভারী কাদা যেন বলে যায় অন্য এক গল্প। এই সময়ই বানিশান্তায় জীবন জেগে উঠতে শুরু করে–যেখানে একমাত্র সড়কটি ধীরে ধীরে নদীতে হারিয়ে যাচ্ছে।

১৯৫৪ সালে মোংলার কাছে কুমারখালী খালের উত্তরে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম পতিতাপল্লি হিসেবে পরিচিত বানিশান্তা। সময়ের সঙ্গে সেখানে আরও কিছু মানুষ বসতি গড়ে তুলতে থাকায় এলাকাটির পরিসর বড় হয়ে ওঠে। পরে তা পশুর নদীর পশ্চিম তীরে স্থানান্তরিত হয়। কিন্তু নতুন এই আবাসও খুব বেশি নিরাপত্তা এনে দিতে পারেনি। কয়েক দশক ধরে এখানকার জীবন দারিদ্র্য, সামাজিক বঞ্চনা এবং অবিরাম নদীভাঙনের চাপে এক সংগ্রাম হয়ে টিকে আছে।

আজও নদীর তীর ধরে চলা একটি সরু, কাদাময় পথই বাজার, স্কুল কিংবা বাড়িতে যাওয়ার একমাত্র রাস্তা। এর কোনো বিকল্প নেই।

ছবি: সায়েদ মাহামুদুর রহমান/ টাইমস

স্বাভাবিক দিনেই যেই পথ পার হওয়া কঠিন; যা বর্ষাকালে হয়ে ওঠে আরও বিপজ্জনক। কাদা আরও গভীর হয়, মাটি পিচ্ছিল হয়ে যায়, যেখানে ম্লান আলোয় প্রতিটি পদক্ষেপেই পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। প্রতি বছর নতুন কিছু জমি নদীতে হারিয়ে যায়, রেখে যায় খাড়া, ভাঙাচোরা পাড় এবং হাঁটু পর্যন্ত ডুবে যাওয়ার মতো গভীর কাদা। এখন এই হুমকি শুধু পতিতাপল্লির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; পশ্চিম তীরের বানিশান্তা ইউনিয়নের অন্যান্য বাসিন্দারাও আশঙ্কা করছেন, নদী তাদের ঘরবাড়িও গ্রাস করতে পারে।

একসময় এলাকাটি রক্ষার একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ২০১৩ সালে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) নদীর তীর বরাবর একটি বাঁধ নির্মাণ করে, যার নির্মাণকাজ একটি চীনা কোম্পানি পরিচালনা করেছিল।

আরও পড়ুন

ছবি: সায়েদ মাহামুদুর রহমান/ টাইমস

২০১৭ সালের মধ্যেই বাঁধটির কিছু অংশ ভেঙে পড়তে শুরু করে। এরপর নতুন করে কোনো সংস্কার হয়নি, আর নদীভাঙনও অনেকটা বাধাহীনভাবে চলতে থাকে–মানুষের বসবাস ও জীবিকার জমি ক্রমেই গ্রাস করতে থাকে। নদীর পাড় যত ভাঙতে থাকে, নদীও ঘরবাড়ির আরও কাছে চলে আসে। কোথাও কোথাও নদীভাঙন বাড়ির ভিত পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। চোখে পড়ার মতো কোনো সুরক্ষা না থাকায় বাসিন্দারা বাঁশের খুঁটি, পুরোনো প্লাস্টিকের চাদর এবং ছেঁড়া মাছ ধরার জাল দিয়ে নিজেদের রক্ষার চেষ্টা শুরু করেছেন। এসব প্রতিরোধক হয়তো একটি বর্ষাকালও টিকবে না, কিন্তু কিছু না করে বসে থাকাও তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।

পশুর নদীর প্রবল শক্তির সামনে তাদের এই প্রতিরোধ অত্যন্ত দুর্বল মনে হয়, তবু তা অবশিষ্ট প্রতি কণা মাটির টুকরো রক্ষায় লড়াই করে যাওয়া মানুষের দৃঢ় সংকল্পেরই প্রতিফলন।

পশুরা নদীতে হারিয়ে যেতে থাকা সরু পথ। ছবি: সায়েদ মাহামুদুর রহমান/ টাইমস

তবুও প্রতিদিন বানিশান্তার মানুষ একই ভাঙাচোরা পথ ধরে হাঁটেন। বাজারে যেতে, সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে এবং বাড়ি ফিরতে তারা কাদা পেরিয়ে চলেন–পাশে বয়ে চলে এমন এক নদী, যেটি ক্রমেই আরও কাছে এগিয়ে আসছে। তাই তাদের সামনে এগিয়ে চলা ছাড়া আর তেমন কোনো উপায় নেই।

এই প্রতিদিনের পথচলার মধ্যেই লুকিয়ে আছে বানিশান্তার মানুষের নীরব দৃঢ়তা। যারা শুধু নিজেদের জমি রক্ষার জন্য নয়, এমন এক জায়গায় তাদের জীবনযাত্রার ধারাও টিকিয়ে রাখার জন্য লড়াই করে চলেছেন। অথচ এমন জায়গায় তারা দাঁড়িয়ে আছেন, যেখানে তাদের পায়ের নিচের মাটিই ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad