যশোরে রানা প্রতাপ হত্যা: কারাগার থেকে করা হয় পরিকল্পনা

যশোরে রানা প্রতাপ হত্যা: কারাগার থেকে করা হয় পরিকল্পনা
রানা প্রতাপ বৈরাগী | ফাইল ছবি
Advertisement
Advertisement

যশোরের মণিরামপুরে ‘চরমপন্থী নেতা’ রানা প্রতাপ বৈরাগী হত্যাকাণ্ডে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পেয়েছে পুলিশ। প্রাথমিকভাবে পুলিশের ধারণা, দুটি চরমপন্থী গ্রুপের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জেরে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে।

যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) আবুল বাশার এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

তিনি টাইমস অব বাংলাদেশকে জানান, নিহত রানা প্রতাপ বৈরাগী দীর্ঘদিন ধরে ভারত থেকে নিয়ন্ত্রিত চরমপন্থী গ্রুপ দীপংকের সদস্য ছিলেন। পাশাপাশি তিনি চরমপন্থী সংগঠন বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির (বিসিপি) একজন ‘ক্যাডার’ হিসেবেও পরিচিত ছিলেন।

পুলিশ অনুসন্ধানে জানতে পেরেছে, ২০০৫ সাল থেকে নিষিদ্ধ ঘোষিত চরমপন্থী কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন রানা প্রতাপ। এ সময় তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে আরেক চরমপন্থী নেতা জিয়াউর রহমান জিয়ার। তবে প্রায় ৮ থেকে ১০ বছর আগে ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বের জেরে তাদের সম্পর্কে ফাটল ধরে।

মণিরামপুর উপজেলার কপালিয়া বাজারে বিসমিল্লাহ বরফমিল নামে জিয়াউর রহমান জিয়ার একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সেখান থেকে দীর্ঘদিন ধরে বরফ কিনে ব্যবসা করতেন রানা প্রতাপ।

তবে ২০১৫ সালের শেষের দিকে একই বাজারে নিজে একটি বরফকল স্থাপন করেন তিনি। এরপর জিয়ার কাছ থেকে বরফ নেওয়া বন্ধ করলেও প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা বকেয়া ছিল বলে জানা গেছে।

বিসমিল্লাহ বরফমিলের শ্রমিক নুরুজ্জামান বাবু জানান, ব্যবসায়িক লেনদেনকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে জিয়া ও রানার মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছিল। তবে এর আগে তারা খুবই ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন।

তিনি বলেন, ‘রানা ভাই নিজের বরফকল দেওয়ার আগে জিয়া ভাইয়ের সঙ্গে খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। তিনি স্ত্রীসহ আমাদের বরফকলে নিয়মিত আসতেন, একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া করতেন। কিন্তু টাকা-পয়সার ঝামেলার কারণে তাদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়।’

বাবু আরও জানান, বর্তমানে জিয়া একটি হত্যা মামলায় কারাগারে রয়েছেন। দুই মাস আগে আদালতে হাজিরা দিতে গেলে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

পুলিশের অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, ঝিনাইদহের আলোচিত আনার হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত চরমপন্থী নেতা শিমুল ভূইয়া গ্রুপের সদস্য ছিলেন জিয়া। বর্তমানে শিমুল ভূইয়া ও জিয়া দুজনেই যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে রয়েছেন। কারাগার থেকে রানা প্রতাপ হত্যার পরিকল্পনা হয়ে থাকতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পরিচয় গোপন রাখার শর্তে রানা প্রতাপের এক ঘনিষ্ঠ সহযোগী জানান, শিমুল ভূইয়া গ্রুপ ও ভারতের দীপংকর গ্রুপের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব চলছিল। রানা প্রতাপ বৈরাগী বেশ কিছুদিন ধরেই চরমপন্থি জীবন ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করছিলেন।

আরও পড়ুন

তিনি বলেন, ‘এই লাইন ছেড়ে দিয়ে রানা ভাই বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হন। তিনি কাটাখালি মৎস্য আরৎদার মালিক সমিতির সভাপতি ছিলেন। এ ছাড়া নড়াইল থেকে প্রকাশিত দৈনিক বিডি খবরের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছিলেন।’

হত্যাকাণ্ডে চরমপন্থী গ্রুপের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না–এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন,
‘এই লাইনে ভাইয়ের সঙ্গে অনেকের দ্বন্দ্ব ছিল। তবে কারা সরাসরি জড়িত, তা আমি নিশ্চিত করে বলতে পারছি না।’

এর আগে, সোমবার সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে মণিরামপুর উপজেলার কপালিয়া বাজারে গুলি ও জবাই করে হত্যা করা হয় রানা প্রতাপ বৈরাগীকে।

স্থানীয় ঝুম বিউটি পার্লারের সামনে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে। দুর্বৃত্তরা তার মাথায় একাধিক গুলি করে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পার্লারটির সত্ত্বাধিকারী ঝুমুর মণ্ডলের সঙ্গে নিহত রানা প্রতাপের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। কিছুদিন আগে তারা বিয়ে করেছেন বলেও লোকমুখে প্রচার রয়েছে।

ঘটনার দিন বিকাল ৫টার দিকে রানা প্রতাপ ঝুমুরের পার্লারে যান। সেখান থেকে পরিচিত কেউ তাকে বাইরে ডাকলে বের হওয়ার পরপর দুর্বৃত্তরা গুলি চালায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী টাইমসকে জানান, তিনজন দুর্বৃত্ত এই হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেয়। একজন গুলি চালালে রানা প্রতাপ মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।

এরপর আরেকজন তার গলা কেটে মৃত্যু নিশ্চিত করে। তৃতীয় দুর্বৃত্ত রাস্তার মুখে দাঁড়িয়ে ফাঁকা গুলি ছুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে।

এ সময় ১২ বছর বয়সী এক কিশোর এগিয়ে গেলে তাকেও লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়। গুলিটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে পাশের একটি ক্লিনিকের কাচ ভেদ করে ভেতরে ঢুকে পড়ে।

কপালিয়া ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সত্ত্বাধিকারী হাদিয়া সুলতানা বলেন, ‘ঘটনার সময় একটি ছেলে ওই দিকে যাচ্ছিল। তখন দুর্বৃত্তরা গুলি ছোড়ে। গুলিটি আমার ক্লিনিকের থাইগ্লাস ভেদ করে ভেতরে আসে। পরে পুলিশ এসে গুলির খোসা উদ্ধার করে নিয়ে যায়।’

পুলিশ জানিয়েছে, হত্যামিশনের অন্তত দুই ঘণ্টা আগে থেকেই দুর্বৃত্তরা কপালিয়া বাজার এলাকায় অবস্থান করছিল।

পুলিশের এক কর্মকর্তা পরিচয় গোপন রাখার শর্তে জানান, হত্যাকাণ্ডের আগে দুর্বৃত্তরা স্থানীয় রমজানের চায়ের দোকানে বসে চা পান করে। পরে সুযোগ বুঝে পাশের গলিতে রানাকে ডেকে নিয়ে হত্যা করে।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, এই হত্যাকাণ্ডে তিনটি পিস্তল ব্যবহার করা হয়েছে। উদ্ধার করা গুলির খোসা বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত হওয়া গেছে, এর মধ্যে একটি ছিল ৭ দশমিক ৬৫ ক্যালিবার পিস্তল। বাকি দুটি ৮ অথবা ৯ ক্যালিবারের হতে পারে।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবুল বাশার বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে, হত্যাকাণ্ডে সরাসরি তিনজন দুর্বৃত্ত অংশ নিয়েছে এবং প্রত্যেকের কাছে পিস্তল ছিল। হত্যার পেছনে চাঁদাবাজি, ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব, নারীঘটিত বিষয় ও চরমপন্থী গ্রুপের অভ্যন্তরীণ কোন্দল–সবকিছু গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নির্দিষ্ট করে কিছু বলা যাচ্ছে না।’

সন্দেহভাজন আটক প্রসঙ্গে তিনি জানান, জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ঝুম বিউটি পার্লারের মালিক ঝুমুর মণ্ডলসহ কয়েকজনকে পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।

নিহতের পিতা তুশার কান্তি বৈরাগী বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে মণিরামপুর থানায় একটি হত্যা মামলা করেছেন।

পুলিশ আরও জানিয়েছে, নিহত রানা প্রতাপ বৈরাগীর বিরুদ্ধে আগে থেকে একটি হত্যা মামলা, একটি বিস্ফোরক মামলা ও একটি ধর্ষণ মামলা রয়েছে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad