বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তি: সার্বভৌমত্ব সংকোচনের শঙ্কা

বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তি: সার্বভৌমত্ব সংকোচনের শঙ্কা
যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের পতাকা।
Advertisement
Advertisement

২০২৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে একটি পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র। স্বাক্ষরকারীরা এই চুক্তিকে দেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসে এক ‘টার্নিং পয়েন্ট’ বা গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

জাতীয় নির্বাচনের ঠিক আগে, মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে চুক্তিটি চূড়ান্ত করা হয়। এটিকে প্রকাশ্যে ‘বাজারে প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি’ ও ‘বাণিজ্যিক সম্পর্ক গভীরতর করার’ হাতিয়ার হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফাঁস হওয়া চুক্তির নথির গভীর বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই শব্দগুলো আসলে একটি কাঠামোগতভাবে অসম ব্যবস্থাকে আড়াল করার জন্য ব্যবহৃত হতে পারে, যা ওয়াশিংটনের পক্ষে প্রভাব প্রতিষ্ঠাকে আনুষ্ঠানিক রূপ দেয়।

এই নথি এমন একটি কাঠামো তৈরি করেছে, যার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রক ক্ষমতা, ডিজিটাল শাসনব্যবস্থা এবং ভবিষ্যৎ কৌশলগত স্বাধীনতার ওপর গভীর প্রভাব প্রতিষ্ঠা করেছে।

স্বল্পমেয়াদি ও শর্তসাপেক্ষ কিছু সুবিধার বিনিময়ে দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত স্বাধীনতা ছাড় দিয়ে আলোচনাকারীরা কার্যত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বকে এমনভাবে সংকুচিত করেছেন, যা আগামী কয়েক দশক ধরে দেশের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিসরকে প্রভাবিত করতে পারে।

সমন্বয় ও ছাড়ে বৈষম্য

চুক্তির মৌলিক অসাম্যটি স্পষ্ট হয় ঢাকার ওপর চেপে বসা ‘সমন্বয়ের বোঝার’ অসম বণ্টনে। পারস্পরিকতার নামে বাংলাদেশকে অত্যন্ত বিস্তৃত ক্ষেত্রজুড়ে ‘উন্মুক্ত করা, স্বীকৃতি দেওয়া, সামঞ্জস্য করা, নিয়ন্ত্রণ কমানো ও অভিযোজন’ করতে বলা হয়েছে।

এর মধ্যে রয়েছে নিয়ন্ত্রক স্বীকৃতিতে অগ্রাধিকার দেওয়া, জাতীয় লাইসেন্সিং ক্ষমতার ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ মেনে নেওয়া এবং দেশীয় কৃষিখাতে আরও গভীর প্রবেশাধিকার দেওয়া।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া ছাড় তুলনামূলকভাবে সীমিত। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ওয়াশিংটন নিজের দায়িত্বের ব্যাখ্যা নির্ধারণে ব্যাপক স্বাধীনতা রেখেছে এবং বাংলাদেশকে অমান্যকারী মনে করলে একতরফাভাবে আবার শুল্ক চাপানোর ক্ষমতাও ধরে রেখেছে।

এই কাঠামো ইঙ্গিত দেয়, চুক্তিটি পারস্পরিক সুবিধার চেয়ে বরং বাজারে প্রবেশাধিকারকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে বাংলাদেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব প্রাতিষ্ঠানিক করার জন্য তৈরি।

অনেক ক্ষেত্রে নীতিগত স্বাধীনতা হারানোর প্রকৃত মূল্য তখনই বোঝা যায়, যখন তা হারিয়ে যায়। ফলে বিচ্ছিন্ন কিছু বাণিজ্যিক সুবিধার বিনিময়ে সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ হারানোকে দুর্বল বিনিময় হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

প্রয়োগের ফাঁদ: ধারা ৬.৪

চুক্তির প্রয়োগ কাঠামোতে এই অসমতা আরও স্পষ্ট। ধারা ৬.৪ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র যদি মনে করে বাংলাদেশ চুক্তি মানছে না, তাহলে তারা আলোচনা শুরু করতে পারে।

আলোচনা ‘সন্তোষজনক ফল’ না দিলে তারা বাংলাদেশি পণ্যের ওপর আবার শুল্ক আরোপ করতে পারবে। সেই ‘সন্তোষজনকের’ সংজ্ঞাও নির্ধারণ করবে যুক্তরাষ্ট্রই।

ভাষাগতভাবে এটি দ্বিপাক্ষিক মনে হলেও বাস্তবে ক্ষমতার বৈষম্যই এখানে নির্ধারক।

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও বাজার ক্ষমতা অনেক বেশি হওয়ায় ‘অমান্যতার’ সংজ্ঞাও তাদের মতো করে নির্ধারিত হতে পারে, যা বাংলাদেশের মতো ছোট অর্থনীতির জন্য প্রতিরোধ করা কঠিন।

আরও পড়ুন

নথিতে আরও বলা হয়েছে, ‘অর্থনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তার’ স্বার্থে উভয় পক্ষই অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করতে পারবে।

বাস্তবে এর অর্থ হলো, বাংলাদেশ যখন নিজেদের ব্যবস্থাপনা যুক্তরাষ্ট্রের মানদণ্ড অনুযায়ী করতে ব্যস্ত থাকবে, তখন যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজন মনে করলেই আবার অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের সুযোগ পাবে।

কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ ও ভূরাজনৈতিক প্রভাব

চুক্তিটি শুধু বাণিজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক অবস্থানকেও প্রভাবিত করতে পারে। ধারা ৪.১ এই ‘কৌশলগত নিয়ন্ত্রণের’ একটি উদাহরণ।

এতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি নিজের অর্থনৈতিক বা জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় বাণিজ্যিক পদক্ষেপ নেয়, তাহলে বাংলাদেশকে সেই পদক্ষেপের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সীমাবদ্ধ ব্যবস্থা নিতে হবে।

এটি শুধু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নয়, বরং তৃতীয় দেশগুলোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অবস্থানকে সমর্থন করার বাধ্যবাধকতাও তৈরি করে-যা বাংলাদেশের নিজস্ব স্বার্থের সঙ্গে নাও মিলতে পারে।

ধারা ৪.২ অনুযায়ী, বাংলাদেশকে তাদের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ কাঠামো যুক্তরাষ্ট্রের মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য করতে হবে।

এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশি কোম্পানিগুলো যেন যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণকে পাশ কাটিয়ে কাজ না করে এবং এমন লেনদেনও সীমিত করতে সহযোগিতা করতে হবে, যা যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করে—এমনকি যদি তা যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে ঘটে।

জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশের জন্য এটি কৌশলগত পরিসর সংকুচিত করার ঝুঁকি তৈরি করে।

এতে বোঝা যায়, ভবিষ্যতে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো নিজেদের স্বার্থের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য অবস্থানের ভিত্তিতে নির্ধারিত হতে পারে।

জ্বালানি খাতে নিয়ন্ত্রণ ও কূটনৈতিক সীমাবদ্ধতা

চুক্তির ধারা ৪.৩(৫) সবচেয়ে স্পষ্ট কৌশলগত হস্তক্ষেপের উদাহরণ।

এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এমন কোনো দেশ থেকে পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর, জ্বালানি বা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কিনতে পারবে না, যা ‘যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।’[

এর ফলে পারমাণবিক জ্বালানি খাতে বাংলাদেশের ওপর কার্যত যুক্তরাষ্ট্রের ভেটো ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

এখন কোনো সরবরাহকারীর মূল্যায়ন হবে বাংলাদেশের প্রয়োজন বা আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিতে নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গির ওপর।

এ ছাড়া, ধারা ৩.২ ও ৪.৩ অনুযায়ী, বাংলাদেশ যদি এমন কোনো দেশের সঙ্গে ডিজিটাল বা বাণিজ্যিক চুক্তি করে যাকে যুক্তরাষ্ট্র ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ মনে করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি বাতিল করে আবার শুল্ক আরোপ করতে পারবে।

ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকা বাংলাদেশের জন্য এই ধরনের ‘বিকল্পের স্বাধীনতা’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু এই চুক্তি সেই স্বাধীনতাকে আগেই সীমিত করে দিয়েছে এবং তৃতীয় দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্ককে প্রভাবিত করার আশঙ্কা তৈরি করেছে।

স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ঘাটতি

চুক্তি স্বাক্ষরের সময়কাল নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। জাতীয় নির্বাচনের ঠিক আগে এটি স্বাক্ষর করা হয়েছে, যা রাজনৈতিকভাবে দুর্বল একটি সময়।

তৎকালীন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও আলোচনার সঙ্গে যুক্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেছেন, এটি গোপনে হয়নি এবং বিএনপি ও জামায়াতের মতো বড় দলগুলোর সম্মতি ছিল।

তবে জনসাধারণের সামনে স্বচ্ছতা না থাকলে এই ধরনের সম্মতি গণতান্ত্রিক বৈধতা দেয় না।

বন্ধ দরজার আড়ালে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা বৈধতার বিকল্প হতে পারে না।

এই চুক্তি কোনো সাধারণ বাণিজ্যিক সমঝোতা নয়, বরং একটি গভীর কৌশলগত পুনর্বিন্যাস, যা জনসমক্ষে পর্যাপ্ত আলোচনার বাইরে রাখা হয়েছে।

শেষ পর্যন্ত ২০২৬ সালের এই চুক্তির প্রকৃত মূল্য বোঝা যাবে তখনই, যখন বাংলাদেশ বুঝতে পারবে তারা দীর্ঘমেয়াদে কী নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে।

এই সীমাবদ্ধতাগুলোর প্রভাব সামনে আসতে শুরু করলে জবাবদিহির দাবি আরও জোরালো হবে।

এই চুক্তি মনে করিয়ে দেয়, ‘পারস্পরিক বাণিজ্য’ অনেক সময় ছোট দেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বাধীনতা ক্ষয়ের আড়াল হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad