পুলিশি অভিযান সম্প্রচারে বিপন্ন ব্যক্তিগত অধিকার

পুলিশি অভিযান সম্প্রচারে বিপন্ন ব্যক্তিগত অধিকার
ছবি: পুলিশের অভিযানের ভিডিও থেকে নেওয়া
Advertisement
Advertisement

রাজধানী ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বসে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী সাইদুর রহমান শফি। সেই সময় মাদকবিরোধী অভিযানের জন্য সেখানে উপস্থিত হয় পুলিশ, তাদের সঙ্গে একদল তথাকথিত ‘মোজো’ বা মোবাইল সাংবাদিক। তাদের ক্যামেরা সচল রেখে শফিকে তল্লাশি করে পুলিশ।

এই তল্লাশির পুরো দৃশ্যটি ফেসবুক লাইভে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। মুহূর্তের মধ্যেই অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ে সেই ভিডিও। পুলিশ শফির কাছে কোনো অবৈধ বস্তু খুঁজে পায়নি। তবে এই ঘটনার কারণে শফি বিশ্ববিদ্যালয় এবং নিজ এলাকায় চরম লোকলজ্জার শিকার হয়েছেন। তিনি জানান,  কিছুই না পাওয়ার পরও তাকে অপরাধীর মতো উপস্থাপন করা হয়েছে।

আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অভিযানের সময় সরাসরি ভিডিও সম্প্রচার করার এই প্রবণতা বর্তমানে ব্যক্তিগত অধিকারের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সংবাদমাধ্যমগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জন্য বিশেষ কন্টেন্ট তৈরিতে বেশি মনোযোগী হয়েছে। তারা সংবাদের দ্রুততা এবং ভিজ্যুয়াল বা দৃশ্যমান আবেদনকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। অনেক সময় সাংবাদিকরা সরাসরি ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে পুলিশি অভিযানের সংবাদ প্রচার করেন। সমালোচকদের মতে, এ ধরনের প্রচারের ফলে অভিযুক্ত ব্যক্তি আইনি প্রক্রিয়া শুরুর আগেই জনসমক্ষে দোষী হিসেবে চিহ্নিত হন।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, আদালতের রায় হওয়ার আগে পর্যন্ত কোনো ব্যক্তিকে অপরাধী বলা যায় না। তারা মনে করেন, তদন্ত চলাকালীন কাউকে অপরাধী হিসেবে তুলে ধরা আইনের শাসনের পরিপন্থী।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক গোলাম রহমান বলেন, সাংবাদিকতার নীতি অনুযায়ী আদালত দোষী সাব্যস্ত না করা পর্যন্ত কাউকে সন্দেহভাজন হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। রায় হওয়ার আগে কাউকে অপরাধী হিসেবে চিত্রিত করা সাংবাদিকতার মৌলিক মানদণ্ডের বিরোধী।

তিনি আরও মনে করেন, সরাসরি সম্প্রচার ও মোবাইল সাংবাদিকতার এই হিড়িক সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। এটি বিচারিক প্রক্রিয়ার বাইরে ব্যক্তিকে সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করছে।

সাবেক সাংবাদিক ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক সাইফুল আলম চৌধুরী বলেন, বর্তমানে সংবাদ সম্পাদনার চিরাচরিত সুরক্ষা ব্যবস্থাগুলো দুর্বল হয়ে পড়েছে। সাংবাদিকতায় নির্দিষ্ট নৈতিক মানদণ্ড থাকে এবং গেটকিপাররা তা রক্ষা করার কথা। কিন্তু সরাসরি সম্প্রচারের ক্ষেত্রে সেই সুরক্ষা বা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অনুপস্থিত বলে তিনি মনে করেন।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মঞ্জিল মোরশেদ বলেন, এ ধরনের ভিডিও প্রচার করা ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও মর্যাদার চরম লঙ্ঘন। এটি একজন নাগরিকের মৌলিক অধিকারকে ক্ষুণ্ণ করে।

শফি সেই দিনের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, ফেব্রুয়ারির এক সন্ধ্যায় তিনি বন্ধুদের সাথে উদ্যানে সময় কাটাচ্ছিলেন। রাত আটটার দিকে পুলিশ সেখানে এসে পৌঁছায়। তাদের সাথে ছিল ক্যামেরা হাতে অনেক লোক। পুলিশ সাথে সাথেই তাকে তল্লাশি শুরু করে এবং ক্যামেরাওয়ালা ব্যক্তিরা তা ফেসবুকে সরাসরি প্রচার করতে থাকেন।

আরও পড়ুন

শফি অভিযোগ করেন, তাকে সেই সময় মারধরও করা হয়েছিল। পরবর্তীতে সেই ভিডিও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন গ্রুপে ছড়িয়ে পড়ে এবং মাদক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে তাকে হল থেকে ছয় মাসের জন্য বহিষ্কার করা হয়।

শফির ভাষ্যমতে সেখানে পাঁচজন পুলিশ সদস্যের সাথে সাংবাদিক ছিল ২০ থেকে ৪০ জন। তিনি সেই ভিডিওগুলো ইন্টারনেট থেকে সরানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন।

একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী। তিনি গোপনীয়তার স্বার্থে নিজের নাম প্রকাশ করতে চাননি। মার্চ মাসে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বন্ধুর সাথে থাকার সময় তিনিও একই পরিস্থিতির শিকার হন। তার বন্ধুকে তল্লাশি করার সময় মোবাইল ক্যামেরাগুলো তার দিকে তাক করা ছিল। সেই ভিডিওগুলো পরবর্তীতে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। অনেক ছোট ভিডিওতে তাকে অপরাধীর সহযোগী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এই ঘটনার পর গ্রামের আত্মীয়রা তার পরিবারের সাথে অসম্মানজনক আচরণ শুরু করেছেন।

আইনজীবীদের মতে, অনলাইন দর্শক ও রিচ বাড়ানোর নেশা থেকেই এই লাইভ সম্প্রচারের উন্মাদনা তৈরি হয়েছে। আইনজীবী মঞ্জিল মোরশেদ বলেন, এটি মূলত ভিউ বাড়ানোর একটি প্রতিযোগিতা। এই চর্চা সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদের সুরক্ষাকে হুমকির মুখে ফেলছে। এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কাউকে নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করা যাবে না।

তিনি আরও বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অনেক সময় নিজেদের প্রচারের জন্য গণমাধ্যমকে ব্যবহার করে।

২০১২ সালের ২৪ মে হাইকোর্ট এক পর্যবেক্ষণে অভিযুক্তদের সংবাদমাধ্যমের সামনে হাজির করার তীব্র সমালোচনা করেছিল। সেই সময় পুলিশ ও অন্যান্য সংস্থা লিখিত প্রতিশ্রুতি দেয় যে, তারা আর এমন কাজ করবে না।

কিন্তু বাস্তবে এই চর্চা বন্ধ হয়নি। ২০১৫ সালেও আদালত পুনরায় নির্দেশ দেয় যে আদালতে হাজির করার আগে কাউকে গণমাধ্যমের সামনে আনা যাবে না। ২০১৯ সালে হাইকোর্ট চলমান তদন্ত নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করাকে ন্যায়বিচারের পরিপন্থী হিসেবে অভিহিত করে। আদালত এ বিষয়ে একটি সমন্বিত নীতিমালা তৈরির আহ্বান জানায়।

পুলিশি অভিযানে মোবাইল সাংবাদিকদের উপস্থিতির বিষয়টি বর্তমানে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ছোটখাটো অভিযানেও অনেক সাংবাদিকের উপস্থিতি দেখে ধারণা করা হয় যে এটি আগে থেকে সমন্বিত থাকে।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের অনেক মাদকবিরোধী অভিযানে নেতৃত্ব দিয়েছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের রমনা বিভাগের উপকমিশনার মাসুদ আলম। তার সাথে প্রায়ই একদল মোবাইল সাংবাদিক থাকেন। সাংবাদিকরা সেখানে থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, স্বচ্ছতার স্বার্থে পুলিশ সাংবাদিকদের বাধা দেয় না। তবে তারা সাধারণ মানুষের গোপনীয়তা রক্ষার চেষ্টা করেন। তিনি দাবি করেন, সাংবাদিকদের উপস্থিতি বা লাইভ সম্প্রচার পুলিশের নির্দেশে হয় না।

তবে ভিন্ন তথ্য দিয়েছেন কয়েকজন মোবাইল সাংবাদিক। তারা জানান, পুলিশই অনেক সময় পছন্দের সাংবাদিকদের অভিযানের তথ্য আগে থেকে জানিয়ে দেয়। ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট কিছু সাংবাদিককে অভিযানের সময় ও স্থান জানানো হয়।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই সমস্যা সমাধানের জন্য আইন ও নৈতিকতার কঠোর প্রয়োগ প্রয়োজন। মঞ্জিল মোরশেদ এই প্রবণতাকে ‘সোশ্যাল মিডিয়া ট্রায়াল’ বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিচার বলে অভিহিত করেন।

অধ্যাপক গোলাম রহমান বলেন, উন্নত বিশ্বে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের স্পষ্ট নৈতিক নীতিমালা থাকলেও বাংলাদেশে তা নেই। এই সুযোগে কিছু স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী নিজেদের উদ্দেশ্য হাসিল করছে।

তিনি মনে করেন, এই ধরনের পরিস্থিতির শিকার ব্যক্তিদের আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। মানহানির শিকার ব্যক্তিরা আইনের আশ্রয় না নিলে এই সংস্কৃতি বন্ধ হবে না।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad