চট্টগ্রামের কাতালগঞ্জের একটা অ্যাপার্টমেন্ট ব্লকের সকালটা ছিল অন্য যেকোনো দিনের মতোই সাধারণ। সিকিউরিটি গার্ডরা গেট খুলছিলেন, অভিভাবকরা সন্তানদের স্কুলে নিয়ে যাচ্ছিলেন এবং দৈনন্দিন জীবন স্বাভাবিক গতিতেই চলছিল। কিন্তু এই স্বাভাবিকতার আড়ালে লুকিয়ে আছে মালিকানা গোপনের এক গল্প। সেখানে ১১ কোটি টাকা মূল্যের আটটি ফ্ল্যাট এমন ব্যক্তিদের নামে কেনা হয়েছে, যাদের ওই এলাকার কোনো বাসিন্দাই চেনেন না।
আইএফআইসি ব্যাংকের নথিপত্রে ফ্ল্যাটগুলোর মালিক হিসেবে ওঠে এসেছে দুটি নাম: মো. সহিদুর রহমান এবং মো. জুলফিকার হায়দার। কাগজে–কলমে তারা বড় উদ্যোক্তা। কিন্তু বাস্তবে তারা মাসিক মাত্র ২৩,০০০ টাকা বেতনের কর্মচারী। অথচ তাদের নামে মোট ৭ কোটি ৩৬ লক্ষ টাকার ঋণ অনুমোদন করা হয়েছে।
কাগজ–কলমে একে ব্যাংক ঋণে সম্পত্তি কেনা বলা হলেও, টাকার গতিপথ বলছে ভিন্ন কথা। ঋণের টাকা আমল কাজে ব্যবহার হয়নি। বরং সেই টাকা চলে গেছে আইএফআইসি ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ লুৎফর রহমান বাদলের নিয়ন্ত্রণে। বাদল একজন পরিচিত ব্যবসায়ী এবং ক্রীড়া সংগঠক।
২০২৪ সালের ২৫ আগস্ট আইএফআইসি ব্যাংকের কারওয়ান বাজার শাখায় ঋণের আবেদন করা হয়। মাত্র তিন দিনের মাথায় ২৮ আগস্ট প্রধান কার্যালয় থেকে এই ঋণ অনুমোদন পায়। “আমার বাড়ি” প্রকল্পের আওতায় প্রত্যেক আবেদনকারী ২ কোটি টাকা করে এবং আরও ১ কোটি ৬৮ লক্ষ টাকা ওভারড্রাফট সুবিধা পান। সব মিলিয়ে মোট ৭ কোটি ৩৬ লক্ষ টাকা। নথিপত্রে বলা হয়, এই টাকা দিয়ে চট্টগ্রামের ‘এয়ারবেল স্বপ্নছায়া’ প্রকল্পে ১৩,২০০ বর্গফুটের আটটি ফ্ল্যাট কেনা হবে।
কিন্তু ঋণের টাকা ছাড়ের পুরো প্রক্রিয়াটি ঘটে মাত্র এক দিনে—১ সেপ্টেম্বর। পে–অর্ডার ইস্যু করা, তা ফেরত আসা এবং টাকা অন্য অ্যাকাউন্টে পাঠানো সব কিছুই ঐ এক দিনেই হয়ে যায়। পে–অর্ডারগুলো ‘এয়ারবেল ডেভেলপমেন্ট টেকনোলজিস’–এর নামে হলেও তারা জানায়, অন্য মাধ্যমে পেমেন্ট পেয়ে গেছে। ফলে টাকাগুলো আবার ঋণগ্রহীতাদের অ্যাকাউন্টে ফিরে আসে।
লেনদেনের রেকর্ড অনুযায়ী, সেই দিনই সহিদুর রহমানের অ্যাকাউন্ট থেকে ২ কোটি টাকা সরাসরি বাদলের অ্যাকাউন্টে চলে যায়। আরও ১ কোটি ৬৮ লক্ষ টাকা যায় ‘অ্যাডভেন্ট ইক্যুইটি ম্যানেজমেন্ট’–এর কাছে। জুলফিকার হায়দারের অ্যাকাউন্ট থেকেও ৩ কোটি ৬৮ লক্ষ টাকা একই প্রতিষ্ঠানে যায়। শেষ পর্যন্ত সব টাকাই বাদলের অ্যাকাউন্টে জমা হয়।
ঋণ অনুমোদনের প্রক্রিয়াটি নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। নথিতে সহিদুরের মাসিক আয় ৬ লক্ষ ২০ হাজার এবং জুলফিকারের ৫ লক্ষ ৯০ হাজার টাকা দেখানো হয়েছে। কিন্তু অডিট দল বা ‘টাইমস অব বাংলাদেশ’ তাদের ব্যবসা বা আয়ের কোনো প্রমাণ পায়নি। তাদের দেওয়া গুলশানের ঠিকানায় গিয়ে শুধু একটি ডে–কেয়ার সেন্টার পাওয়া গেছে, ঋণগ্রহীতাদের কোনো হদিস মেলেনি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, তারা দুজনই বাদলের মালিকানাধীন ‘এলআর গ্রুপ’–এর সাধারণ কর্মচারী। কম বেতনের কর্মচারীদের নামে বিপুল সম্পদ দেখিয়ে এই ঋণ নেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রামের ওই আটটি ফ্ল্যাটে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে ভাড়াটিয়ারা থাকছেন। তারা মাসে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা ভাড়া দেন। তারা সহিদুর বা জুলফিকার কাউকে চেনেন না। তারা ভাড়া দেন মো. হেলাল আহমেদ নামে এক ব্যক্তিকে।
হেলাল আইএফআইসি ব্যাংকের সাবেক শাখা ব্যবস্থাপক এবং বর্তমানে এলআর গ্রুপের সাথে যুক্ত। তিনি স্বীকার করেন, তিনি ভাড়া তোলেন এবং সরাসরি বাদলের সাথে যোগাযোগ রাখেন।
ঋণের শর্ত অনুযায়ী ৯০ দিনের মধ্যে ফ্ল্যাটগুলো ব্যাংকের কাছে বন্ধক রাখার কথা ছিল। কিন্তু ফ্ল্যাটগুলো ঋণগ্রহীতাদের নামে রেজিস্ট্রি করা হলেও ব্যাংকে বন্ধক দেওয়া হয়নি। ফলে ব্যাংক এখন আইনিভাবে এই সম্পত্তি দখল বা ঋণ আদায় করতে পারছে না।
বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের একজন কর্মকর্তা একে একটি ‘ক্ল্যাসিক রাউটিং স্ট্রাকচার’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এখানে সম্পদ এবং দায় শুধু কাগজে–কলমে থাকে, কিন্তু আসল নিয়ন্ত্রণ থাকে অন্য কারও হাতে।
তবে বাদল ‘টাইমস’কে বলেন, সহিদুর রহমান ২০২২ সালে তার কাছ থেকে ৭ কোটি ৫০ লক্ষ টাকা ধার নিয়েছিলেন। সেই ধার শোধ করার জন্যই ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া হয়েছে। তিনি আরও জানান, ব্যাংক একজনকে ৩ কোটি টাকার বেশি গৃহঋণ দেয় না, তাই দুইজনের নামে ঋণ নেওয়া হয়েছে।
তবে আইএফআইসি ব্যাংকের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বাদলের এই দাবিই প্রমাণ করে যে ফ্ল্যাটগুলোর আসল মালিক তিনি নিজেই।
সূত্রমতে, এই সম্পদগুলো আসলে অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদ যা বিভিন্ন লেনদেনের আড়ালে লুকানো হয়েছে।
ব্যাংক সূত্র জানায়, ২০০৬ সালে প্রভাবশালী বিএনপি নেতা মোহাম্মদ মোসাদ্দেক আলী ফালুর মাধ্যমে বাদল আইএফআইসি ব্যাংকের পরিচালক হন এবং পরে কয়েক মেয়াদে চেয়ারম্যান ছিলেন। মালিকানা পরিবর্তন হয়ে সালমান এফ রহমানের হাতে গেলেও বাদল বিভিন্ন কমিটির মাধ্যমে প্রভাব বজায় রাখেন।
এমনকি তিনি কোনো অনুমোদন ছাড়াই ব্যাংকের দুটি বিলাসবহুল গাড়ি ব্যবহার করতেন। ২০২৫ সাল পর্যন্ত এই গাড়ি কেনা ও রক্ষণাবেক্ষণে ব্যাংকের খরচ হয়েছে প্রায় ৬ কোটি টাকা। ২০১৪ সালে দেশ ছাড়ার পর ২০১৫ সালে তাকে ব্যাংক থেকে সরিয়ে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০১৭ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন তার ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে ১৫২ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের মামলা করে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ৩০ আগস্ট বাদল জামিন পান। এর এক দিন পরেই ঋণের টাকা স্থানান্তর হয়। ৫ সেপ্টেম্বর তিনি দেশে ফেরেন এবং ২০২৫ সালের অক্টোবরে দুর্নীতির মামলা থেকে খালাস পান। ব্যাংকের কর্মকর্তারা ‘টাইমস’কে জানান, বাদলের প্রভাবে তারা আতঙ্কে থাকেন। তারা অনেক কিছু জানলেও বলতে পারেন না।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, বাদল আবারও ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে ফেরার চেষ্টা করছেন। এজন্য তিনি রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছেন।
ধারণা করা হচ্ছে, এই ঋণের টাকা দিয়ে তিনি আইএফআইসি ব্যাংকের শেয়ার কিনেছেন যাতে আবার মালিকানায় ফিরতে পারেন। বর্তমানে শেয়ারের দাম অনুযায়ী পর্ষদে ফিরতে অন্তত ২ শতাংশ শেয়ার থাকা প্রয়োজন, যা তিনি সম্ভবত পূর্ণ করেছেন।
২০২৫ সালের ডিসেম্বর নাগাদ এই ঋণকে ‘মন্দ ঋণ’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। বর্তমানে পাওনা টাকার পরিমাণ প্রায় ৭ কোটি ৪০ লক্ষ টাকা। ব্যাংক যোগাযোগ করলে ঋণগ্রহীতারা জানান, এলআর গ্রুপ এই টাকা শোধ করবে। ঋণ আদায়ে ব্যাংক আইনি ব্যবস্থা নিলেও কর্মীরা হুমকির শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
সম্প্রতি ব্যাংক কর্মকর্তাদের সাথে বাদলের একটি বৈঠক হয়েছে, যেখানে তিনি ঋণ শোধের আশ্বাস দিয়েছেন। তবে এত অনিয়ম সত্ত্বেও ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ঋণ অনুমোদনকারী কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম এখনো বহাল তবিয়তে আছেন। ব্যাংকের শীর্ষ ব্যবস্থাপনা এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
তদন্তকারীরা বাদলের সাথে ‘এয়ারবেল ডেভেলপমেন্ট’–এর যোগসূত্র খুঁজছেন। জানা গেছে, ওই গ্রুপের মালিকানাধীন পাঁচ তারকা হোটেল ‘কক্স টুডে’–তে বাদলের প্রায় ২ কোটি টাকার শেয়ার রয়েছে। ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, রাজনৈতিক চাপের কারণে অতীতের মতো এই তদন্তও মাঝপথে থমকে যেতে পারে।


