ইরানি হামলার পর ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা প্রশ্নের মুখে

ইরানি হামলার পর ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা প্রশ্নের মুখে
শনিবার ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর ডিমোনার (দক্ষিণ ইসরায়েল) এক জনপদে মূল্যবান জিনিসপত্র পরিষ্কার করা হচ্ছে। ছবি: দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস
Advertisement
Advertisement

ইসরায়েলের সবচেয়ে সুরক্ষিত স্থানগুলোর একটি হলো তাদের প্রধান পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্র ও চুল্লি, যা দক্ষিণের নেগেভ মরুভূমিতে ডিমোনা শহর থেকে প্রায় আট মাইল দূরে অবস্থিত। কিন্তু শনিবার রাতে যখন ইরানের দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ডিমোনা ও কাছাকাছি আরাদ শহরের আবাসিক এলাকায় আঘাত হানে এবং ইসরায়েলের শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এড়িয়ে যায়, তখন যুদ্ধে সমর্থনকারী ইসরায়েলিরাও আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।

ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি আরও উদ্বেগজনক ছিল সেনাবাহিনীর স্বীকারোক্তি যে তারা ক্ষেপণাস্ত্রগুলো প্রতিহত করার চেষ্টা করেছিল—যেগুলো প্রায় তিন ঘণ্টার ব্যবধানে আঘাত হানে। এই ব্যর্থতা ইসরায়েলের বহুস্তর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

এ ছাড়া আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, সেনাবাহিনী হয়তো তাদের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ও উন্নত প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারে সংযম দেখাচ্ছে, কারণ গত বছর ইরানের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধে মজুত কমে যেতে পারে বলে রিপোর্ট রয়েছে। যদি বর্তমান অভিযান “মধ্য পর্যায়ে” থাকে—যেমন সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আইয়াল জামির বলেছেন—তাহলে এই উদ্বেগ আরও বাড়তে পারে।

ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তারা বলছেন, কী ভুল হয়েছে তা তদন্ত করা হচ্ছে, তবে বিস্তারিত জানানো হচ্ছে না।

রোববার ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু বলেন, কেউ নিহত না হওয়া “একটি অলৌকিক ঘটনা”। তিনি সতর্ক করে বলেন, ক্ষেপণাস্ত্র সতর্কবার্তা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে হবে—“অসতর্ক হবেন না।”

তিনি ব্যর্থতার কারণ ব্যাখ্যা করেননি, কিংবা ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ বিনিয়োগে তৈরি বহুস্তর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করেননি। এখন পর্যন্ত এই যুদ্ধে ইরানি ড্রোনগুলো তেমন বড় হুমকি সৃষ্টি করতে পারেনি।

সেনাবাহিনীর দাবি অনুযায়ী, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ৯০ শতাংশেরও বেশি প্রতিহত করা হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শতভাগ নির্ভুল হতে পারে না।

রিজার্ভ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রন কোচাভ বলেন, “ডিমোনা বহুস্তর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় সুরক্ষিত কিন্তু কিছুই নিখুঁত নয়। এখানে একটি অপারেশনাল ব্যর্থতা হয়েছে।”

সামরিক মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এফি ডেফ্রিন বলেন, আরাদ ও ডিমোনার ঘটনাগুলো একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়।

রোববার ডিমোনায় উদ্ধারকাজ করছেন কর্মীরা। সপ্তাহান্তে ডিমোনা এবং আরাদে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বহু মানুষ আহত হয়েছেন। ছবি: দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস

ইসরায়েলের “আয়রন ডোম” সবচেয়ে পরিচিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হলেও এটি মূলত স্বল্প-পাল্লার রকেট প্রতিহত করার জন্য তৈরি। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলায় তাদের সবচেয়ে উন্নত ব্যবস্থা হলো “অ্যারো ৩”, যা মহাকাশের সীমানায় লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করে। “ডেভিডস স্লিং” মাঝারি-পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ করে। যুক্তরাষ্ট্রের “থাড” ব্যবস্থাও ইসরায়েলে মোতায়েন রয়েছে।

আরও পড়ুন

এখন কম খরচে বেশি ব্যবহারযোগ্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে ইসরায়েল।

জেনারেল কোচাভ বলেন, “আয়রন ডোম” ও “ডেভিডস স্লিং”-এর মতো নিম্নস্তরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়িয়ে বিকল্প তৈরি করা হচ্ছে—যা কখনো কখনো কার্যকর হয়।

“অ্যারো ৩” ব্যবস্থাটি এখন বিশেষ নজরদারিতে রয়েছে, কারণ এর প্রতিটি প্রতিরোধ ক্ষেপণাস্ত্র খুব ব্যয়বহুল এবং তৈরি করতে সময় লাগে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, আরাদ ও ডিমোনায় আঘাত হানা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে এটি ব্যবহার করা হয়নি।

গত বছরের যুদ্ধের শেষদিকে আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল যে ইসরায়েল ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতিতে পড়তে পারে। তখন কর্মকর্তারা বলেছিলেন, গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ও ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলের সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনী অবশ্য সাম্প্রতিক ঘাটতির খবর অস্বীকার করে বলেছে, তারা দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত। তবে যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হবে, চাপ তত বাড়বে।

ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক আমির বারাম এই মাসে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে অতিরিক্ত প্রতিরোধ ক্ষেপণাস্ত্র ও গোলাবারুদ চেয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে আমেরিকা দিতে রাজি হয়েছে কি না তা স্পষ্ট নয়।

বিশেষজ্ঞ কোচাভ বলেন, “এটা অন্তহীন মজুত নয়। আজ আমরা যা ব্যবহার করছি, আগামী দিনের যুদ্ধের কথাও ভাবতে হবে।”

এই হামলায় প্রায় ১৭৫ জন আহত হয়েছেন, যার মধ্যে অন্তত ১০ জনের অবস্থা গুরুতর। অনেকেই আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ায় বড় ধরনের প্রাণহানি এড়ানো গেছে। ডিমোনার বাসিন্দা ইয়িৎসহাক সেলেম জানান, বিস্ফোরণের পর পরিস্থিতি ছিল “ঘূর্ণিঝড় আর ভূমিকম্পের মতো।”

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর একজন মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাদাভ শোশানি বলেন, গত তিন সপ্তাহে ইরান প্রায় ৪০০ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে, যার মধ্যে মাত্র চারটি প্রতিরক্ষা ভেদ করে সরাসরি আঘাত হেনেছে। ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত ১৫ জন বেসামরিক নাগরিক ও বিদেশি শ্রমিক নিহত হয়েছেন।

আরাদ, ডিমোনা, তেল আবিব এবং জেরুজালেমের কাছের বেইত শেমেশ—এই চারটি বড় আঘাতের স্থানের বাইরেও আরও বহু ভবন ও সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্রের ভগ্নাংশ ও ক্লাস্টার ধরনের ছোট রকেটের কারণে এমন ক্ষতি হয়। এসব ক্লাস্টার ক্ষেপণাস্ত্র আকাশে কয়েক মাইল ওপরে ভেঙে গিয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং এগুলোও প্রাণঘাতী প্রমাণিত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, এসব ক্লাস্টার ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে হলে বায়ুমণ্ডলের বাইরে প্রতিহত করতে হয়—নিচু স্তরের প্রতিরক্ষা এতে কার্যকর নয়।

“অ্যারো ২” ক্ষেপণাস্ত্র কাছাকাছি বিস্ফোরণের মাধ্যমে লক্ষ্য ধ্বংস করে, আর “অ্যারো ৩” সরাসরি সংঘর্ষের মাধ্যমে কাজ করে—যা অত্যন্ত কঠিন, যেন “দুটি গুলি একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খায়।”

এ ছাড়া কিছু ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র মাঝপথে দিক পরিবর্তন করতে পারে, যা প্রতিরোধ আরও কঠিন করে তোলে। সামান্য বায়ুচাপের পরিবর্তনও লক্ষ্য নির্ধারণে ভুল হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রে তিনটি প্রধান অংশ থাকে—ইঞ্জিন, ওয়ারহেড এবং জ্বালানি ট্যাংক। ইঞ্জিন আলাদা হয়ে যায়, কিন্তু বড় জ্বালানি ট্যাংকগুলো প্রায়ই ইসরায়েলের ভেতরেই পড়ে, যা সাধারণ মানুষের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ—“এগুলো প্রায় বাসের মতো বড়।”

লেখা: ইসাবেল কার্শনার, দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের জেরুজালেমভিত্তিক সিনিয়র সংবাদদাতা

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad