সচিবালয়ের করিডোরে পদচারণা আছে, কিন্তু কাজের কোনো টেবিল নেই, তাদের কোনো কাজও নেই। তারা সরকারি প্রশাসনের ‘বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা’ (ওএসডি)। বর্তমানে ‘কাজহীন’ ও এসডি বা সংযুক্ত অবস্থায় আছেন সচিব থেকে উপসচিব পদমর্যাদার প্রায় ৭০০ জন। তাদের পেছনে মাসে রাষ্ট্রের ব্যয় প্রায় ১০ কোটি টাকা।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর প্রশাসনের চেনা ছবিটা বদলে গেছে। বিশেষ করে ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনের সময় সময় যারা রিটার্নিং কর্মকর্তা বা জেলা প্রশাসক ছিলেন, প্রথম ধাক্কাতেই তাদেরকে ওএসডি করে অন্তর্বর্তী সরকার। এরপর থেকে ধাপে ধাপে চলে আগের সরকারে গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে থাকা কর্মকর্তাদের কর্মহীন করার প্রক্রিয়া।
২০২৫ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি মাত্র একদিনেই ছয়টি পৃথক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ৩৩ জন যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তাকে ওএসডি করা হয়। এর পর থেকে এই সংখ্যা কেবল বেড়েছেই। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের সময়ও সাতজন সচিবসহ অনেক কর্মকর্তাকে এভাবেই ওএসডি বা সংযুক্তিতে রাখা হয়েছিল।
ওএসডি বা সংযুক্তিতে থাকা কর্মকর্তাদের নিয়ম অনুযায়ী জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে রিপোর্ট করতে হয় এবং সেখানে লাইব্রেরিতে রাখা একটি হাজিরা খাতায় সই করতে হয়। এর বাইরে তাদের নির্দিষ্ট কোনো দায়-দায়িত্ব দেওয়া হয় না।
এসব কর্মকর্তাদের পেছনে বেতনের হিসাবটি অত্যন্ত চমকে দেওয়ার মতো। সাতজন সচিবের পেছনে মাসে ব্যয় হচ্ছে সাড়ে ১৭ লাখ টাকা। এ ছাড়া ১২৭ জন অতিরিক্ত সচিবের জন্য প্রায় দুই কোটি, ২৪৬ জন যুগ্ম সচিবের জন্য প্রায় সাড়ে তিন কোটি এবং ৩১৩ জন উপসচিবের পেছনে প্রায় সোয়া চার কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। সব মিলিয়ে এই খরচের অঙ্ক প্রতি মাসে ১০ কোটি টাকার পাহাড় ছুঁয়ে ফেলছে।
অবসরপ্রাপ্ত সচিব এ কে এম আব্দুল আউয়াল টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, সরকার এসব কর্মকর্তাদের না পারছে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে, না পারছে চাকরি থেকে সরাতে। এটি কোনো দ্রুত সমাধানযোগ্য সমস্যা নয় বরং এটি সিভিল প্রশাসনের ভেতরকার এক গভীর বিশৃঙ্খলার প্রতিফলন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক সাদিক হাসান বলেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় কর্মকর্তাদের এভাবে বসিয়ে রেখে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় করা হচ্ছে। কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন হওয়া উচিত তাদের কাজের দক্ষতা দেখে, রাজনৈতিক পরিচয় দেখে নয়।
তিনি আরও যোগ করেন, উত্তরাধিকার সূত্রে আসা নতুন সরকারগুলো পূর্ববর্তী সরকারের সময়ে কাজ করা কর্মকর্তাদের ওপর আস্থা রাখতে পারে না।
জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারী অবশ্য ৭০০ কর্মকর্তা ওএসডি থাকার তথ্যটি সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন। তিনি টাইমস’কে বলেন, এত বিপুল সংখ্যক কর্মকর্তা ওএসডি থাকা অসম্ভব এবং সম্ভবত মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটটি সময়মতো আপডেট করা হয়নি।
প্রতিমন্ত্রী ওএসডি বা সংযুক্তিতে রাখাকে একটি নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া হিসেবে বর্ণনা করে দাবি করেন এর পেছনে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নেই।
অথচ প্রশাসনের এক দিকে যখন কর্মকর্তারা কাজহীন হয়ে আছেন, অন্যদিকে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় কর্মকর্তারা হিমশিম খাচ্ছেন।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে অনেক কর্মকর্তাকে বর্তমানে এক সঙ্গে দুই বা তার বেশি শাখার দায়িত্ব একাই সামলাতে হচ্ছে। এমনও দেখা গেছে যে, একজন সিনিয়র সহকারী সচিবকে একাই প্রশাসন, অভিযোগ ব্যবস্থাপনা ও চিকিৎসা সহায়তা সমন্বয়ের মতো তিনটি পদের গুরুভার বইতে হচ্ছে।
২০২০ সালের হাইকোর্টের একটি রায় অনুযায়ী কোনো সরকারি কর্মকর্তাকে ১৫০ দিনের বেশি ওএসডি রাখা যাবে না। আদালত দীর্ঘ সময় এভাবে বসিয়ে রাখাকে অবৈধ ঘোষণা করলেও বাস্তব চিত্র বলছে, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ওএসডি হওয়া অনেক কর্মকর্তা এখন এক বছরেরও বেশি সময় ধরে সেই অবস্থাতেই দিন কাটাচ্ছেন।
দেয়ালের ওপাশে থাকা এই কর্মকর্তাদের মনের খবর কেউ রাখে না। সারাদিন কেবল পত্রিকা পড়ে আর টেলিভিশন দেখে কাটানো এই মেধাবীদের মধ্যে বাড়ছে চরম হতাশা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন যুগ্ম সচিব বলেন যে, তারা নিরবে হাজিরা দিয়ে চলে আসেন এবং সারাক্ষণ ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তায় ভোগেন। তীব্র প্রতিযোগিতার মাধ্যমে চাকরিতে আসা এই মেধাবীদের জন্য এমন নিষ্ক্রিয়তা চরম অপমানজনক বলে মন্তব্য করেন তিনি।
২০২৫ সালের ৫ জানুয়ারি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ মোস্তাইন কবিরের আত্মহত্যার ঘটনা যেন এই নীরব যন্ত্রণারই এক করুণ আর্তনাদ। মেধা আর লড়াই করে আসা এই কর্মকর্তাদের নিষ্ক্রিয় করে রাখা এখন এক নীরব মানবিক ও প্রশাসনিক সংকটে রূপ নিয়েছে।


