দুই বছরে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করবে সরকার: অর্থমন্ত্রী

দুই বছরে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করবে সরকার: অর্থমন্ত্রী
ছবি: সংগৃহীত
Advertisement
Advertisement

আগামী দুই বছরে প্রায় ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে সরকার। জ্বালানি সংকট মোকাবিলা, আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং শিল্পের উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

একই সঙ্গে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও জ্বালানি অবকাঠামো উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

সোমবার ঢাকায় ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফআইসিসিআই) আয়োজিত ‘সাসটেইনেবল পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি: ড্রাইভিং ইনভেস্টমেন্ট ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে সরকারের এসব পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন তিনি।

অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, আগামী দুই বছরে প্রায় ১০ গিগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে সরকার এগোচ্ছে। এ জন্য সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

শিল্পকারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের মাধ্যমে দিনের বেলায় গ্রিডের বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব। এতে শিল্পের জ্বালানি ব্যয় কমার পাশাপাশি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর চাপও কমতে পারে। সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে নীতিগত সহায়তা ও বিনিয়োগের উপযোগী পরিবেশ তৈরির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ, যোগ করেন তিনি।

দেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানোর গুরুত্ব দিয়ে মন্ত্রী বলেন, নতুন গ্যাসকূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

মন্ত্রী আরও বলেন, এ-সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব ক্রয়সংক্রান্ত কমিটিতে অনুমোদন পেলেও কিছু বিষয় এখনো নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। দেশীয় গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানো গেলে আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং শিল্পের চাহিদা পূরণে সহায়তা পাওয়া সম্ভব। তবে নতুন অনুসন্ধান ও উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি বিদ্যমান জ্বালানি অবকাঠামোর সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তাও রয়েছে।

গ্যাস সংকটের কথা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, ‘গ্যাস সংকট এখনো বাংলাদেশের অন্যতম বড় সমস্যা। বিশেষ করে শিল্প খাত এ সংকটে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা যে সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন, তা আমরা বুঝতে পারছি। কিন্তু রাতারাতি এই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। তবে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি ও সরবরাহ বাড়াতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নের উদ্যোগ চলছে। ভাসমান এলএনজি টার্মিনালসহ সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো গড়ে তুলতে সময় লাগবে। এ কারণে স্বল্পমেয়াদে গ্যাস সংকট পুরোপুরি দূর করা কঠিন হতে পারে।’

আরও পড়ুন

এ সময় তিনি আরও জানান, মাতারবাড়ীকে কেন্দ্র করে জ্বালানি অবকাঠামো ও টার্মিনাল উন্নয়নের পরিকল্পনা রয়েছে। এ ধরনের বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থায়ন নিশ্চিত করা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় জরুরি।

সভায় বক্তারা বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ালেই হবে না; নির্ভরযোগ্য সরবরাহ, প্রতিযোগিতামূলক মূল্য, অবকাঠামো উন্নয়ন ও জ্বালানির উৎস বৈচিত্র্যপূর্ণ করাও জরুরি।

ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফআইসিসিআইয়) সভাপতি রূপালী হক চৌধুরী বলেন, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা বাংলাদেশের আমদানিনির্ভরতার দুর্বলতা সামনে এনেছে। এতে শিল্পের ব্যয় বাড়ছে, উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।

নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, এলএনজি আমদানির উৎস বৈচিত্র্যপূর্ণ করা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের জ্বালানিবিষয়ক প্রধান বিশ্লেষক মো. শফিকুল আলম মূল প্রবন্ধে দেশীয় গ্যাসের মজুত হ্রাস, আমদানিনির্ভরতা ও আন্তর্জাতিক জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকি তুলে ধরেন।

তিনি গ্যাসের অপচয় কমানো, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণ, শিল্পের জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি এবং সবুজ অর্থায়নের মাধ্যমে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন, যোগ করেন তিনি।

প্যানেল ডিসকাশনে শেভরন বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক শু শিয়ং বলেন, বাংলাদেশে জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে স্থিতিশীল নীতিমালা, পূর্বানুমানযোগ্য নিয়ন্ত্রক কাঠামো এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ জরুরি।

তিনি বলেন, জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক সম্ভাবনার পাশাপাশি নীতিগত ধারাবাহিকতা ও বিনিয়োগের ঝুঁকি বিবেচনা করতে হয়। দেশের জ্বালানি চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান কমাতে নতুন বিনিয়োগ ও প্রকল্প বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করার পাশাপাশি সরকার, শিল্প ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশের (আইইউবি) উপাচার্য মোহাম্মদ তামিম দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, জ্বালানি মিশ্রণে ভারসাম্য বজায় রাখা এবং বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে গ্যাস অনুসন্ধানের আর্থিক ও কারিগরি ঝুঁকি ভাগ করে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন। অন্যদিকে, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক নাজনীন আহমেদ সরকারের আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রেখে জ্বালানি খাতে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং শিল্পের জন্য সাশ্রয়ী জ্বালানি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন।

ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই) প্রশাসক ফজলুল হক শিল্পের জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর আহ্বান জানান।

এফআইসিসিআই আয়োজিত এ সভায় সভায় সরকারের নীতিনির্ধারক, ব্যবসায়ী নেতা, সদস্যপ্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী এবং সংশ্লিষ্ট খাতের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

আলোচনায় জ্বালানি সংকটের তাৎক্ষণিক সমাধানের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে নির্ভরযোগ্য, সাশ্রয়ী ও টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকার ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad