ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের মার্কিন প্রেসিডেন্সি তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির ঠিক বিপরীত এক রূপ নিয়ে বিশ্বমঞ্চে আবির্ভূত হয়েছে। ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ বা আমেরিকাকে সবার আগে রাখার স্লোগান দিয়ে নতুন কোনো যুদ্ধে না জড়ানোর যে অঙ্গীকার তিনি করেছিলেন, বাস্তবে প্রবল সামরিক অভিযান ও কঠোর শুল্কনীতির এক মারমুখী সংমিশ্রণে এর প্রতিফলন ঘটেছে।
ট্রাম্পের এই রণকৌশল কেবল বিশ্ববাজারকে অস্থির করেনি, বরং দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক সমীকরণ এবং মিত্র দেশগুলোর মধ্যকার আস্থাকেও বড় ধরনের সংকটে ফেলেছে।
এই মেয়াদে মার্কিন সামরিক শক্তির সবচেয়ে বিধ্বংসী রূপ দেখা গেছে গত শনিবার ইরান ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার মধ্য দিয়ে। ২০২৫ সালের জুনে ইরানি সামরিক ও পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার পর এবারের অভিযানটি ছিল অনেক বেশি সুদূরপ্রসারী। তেহরানসহ কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে পরিচালিত এই সমন্বিত বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং দেশটির শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃবৃন্দ নিহত হয়েছেন।
ওয়াশিংটন এই অভিযানকে কৌশলগতভাবে প্রয়োজনীয় দাবি করলেও মাঠপর্যায়ের চিত্র ছিল ভিন্ন। প্রথম দফার এই হামলায় বহু বেসামরিক প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে, যার মধ্যে কয়েক ডজন শিশুও রয়েছে। আবাসিক এলাকায় ধ্বংসস্তূপের সামনে স্বজনহারা মানুষের আহাজারির ছবি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়লে মার্কিন অভিযানের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ইরানও এর প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েল এবং পারস্য উপসাগরে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়, যা পুরো অঞ্চলকে এক ভয়াবহ যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিয়েছে।
ট্রাম্পের এই সামরিক অভিযান কেবল ইরানেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। তার নির্দেশে সিরিয়ায় মার্কিন অভিযান আরও জোরদার করা হয়েছে, নাইজেরিয়ায় সন্ত্রাসবাদ বিরোধী অভিযানের নামে নতুন ফ্রন্ট খোলা হয়েছে।
অন্যদিকে, পশ্চিম গোলার্ধের দেশ ভেনেজুয়েলায় সামরিক হস্তক্ষেপ করে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে বন্দি করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসা হয়েছে। এই নাটকীয় পদক্ষেপটি লাতিন আমেরিকার দেশগুলোকে স্তম্ভিত করেছে, সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
পাশাপাশি ক্যারিবীয় অঞ্চলে মাদকবিরোধী অভিযানের নামে সন্দেহভাজন নৌযানে সশস্ত্র হামলা চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, যা আইন প্রয়োগ ও যুদ্ধের মধ্যকার সীমারেখাকে অস্পষ্ট করে তুলেছে।
সামরিক শক্তির পাশাপাশি অর্থনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যাপক হারে শুল্ক আরোপকে বেছে নিয়েছেন ট্রাম্প। শত্রু ও মিত্র—উভয় পক্ষের ওপরই তিনি অনেকটা হুটহাট এবং অনিশ্চিতভাবে উচ্চহারে শুল্ক চাপিয়ে দিচ্ছেন। দেশীয় শিল্প রক্ষার দোহাই দিয়ে এই শুল্ক আরোপ করা হলেও এর ফলে বিশ্বজুড়ে সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনায় জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে, পরিবহন ও বিমা খাতে যার প্রভাব পড়েছে। আমদানিকৃত যন্ত্রাংশের ওপর নির্ভরশীল উৎপাদনকারীরা বিপাকে পড়েছেন, রপ্তানিকারকরা বিদেশের বাজারে নতুন নতুন বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন। দীর্ঘমেয়াদে এই অর্থনৈতিক চাপ এড়াতে অনেক দেশ এখন মার্কিন বাজারের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে বিকল্প বাজার তৈরির চেষ্টা ত্বরান্বিত করছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের এই একতরফা নীতি আন্তর্জাতিক মহলে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তিকে খাটো করছে। যেসব মিত্র দেশ আগে মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে পরামর্শের ভিত্তিতে কাজ করত, তারা এখন ওয়াশিংটনের আকস্মিক সিদ্ধান্তে রীতিমতো অস্বস্তিতে রয়েছে। অন্যদিকে বিরোধীরা অভিযোগ তুলছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র নিজের সুবিধা অনুযায়ী আন্তর্জাতিক আইনের অপব্যবহার করছে। যুদ্ধ বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসে একের পর এক নতুন রণাঙ্গন উন্মোচন করার এই প্রবণতা ট্রাম্পের বক্তব্যের বিশ্বাসযোগ্যতাকে চরম সংকটে ফেলেছে।
একটি পরাশক্তির প্রভাব কেবল তার সামরিক বা অর্থনৈতিক শক্তির ওপর নির্ভর করে না, বরং তার নৈতিক অবস্থান ও নির্ভরযোগ্যতার ওপরও দাঁড়িয়ে থাকে। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে সেই বিশ্বাসের জায়গাটি ক্রমাগত ক্ষয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন দেশ এখন নিজেদের প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়াতে বাধ্য হচ্ছে; ওয়াশিংটনকে ছাড়াই নতুন বাণিজ্যিক জোট গড়ার দিকে ঝুঁকছে। বহুপাক্ষিক সমঝোতার বদলে শক্তির জোরে আধিপত্য বিস্তারের এই নীতি বিশ্বকে আরও খণ্ডিত, সতর্ক এবং অনিশ্চিত এক ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। ট্রাম্পের দ্বিতীয় দফার এই শাসনকাল শেষ পর্যন্ত বিশ্ব রাজনীতির কাঠামোকেই আমূল বদলে দিচ্ছে, যেখানে মার্কিন শক্তির গন্তব্য নিয়ে খোদ তার মিত্ররাই আজ শঙ্কিত।


