ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে ইসলামী ছাত্রশিবির। আর তাদের এই বিজয় ক্যাম্পাসের ছাত্র নেতৃত্বে তৈরি করেছে নতুন সমীকরণ।
দেশের সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের হাত ধরে হওয়া গণঅভ্যুত্থানের পরিপ্রেক্ষিতে অনেকেই মনে করেছিলেন, ডাকসু নির্বাচনে অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে থাকবে এনসিপি সমর্থিত বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের (বাগছাস) প্যানেল। নতুন এই শক্তি পুরোনো রাজনীতির বিকল্প হয়ে দাঁড়াতে পারবে বলেও প্রত্যাশা ছিল।
কিন্তু ফল প্রকাশের পর দেখা গেল ভিন্ন চিত্র। প্রত্যাশার বিপরীতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে বাগছাস সমর্থিত ‘বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী সংসদ’ প্যানেল।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকেই দেশের বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দাবিতে সরব ছিল বাগছাস। ডাকসু নির্বাচনের আগেও তারা ছিল বেশ সোচ্চার।
কিন্তু সেই নির্বাচনের পর তাদের নেতৃত্বে নেমে এসেছে নিস্তব্ধতা। ক্যাম্পাস থেকে অনেকটা যেন উধাও হয়ে পড়েছেন জোটের নেতারা।
অথচ নির্বাচনে জিতলে ঢাবি ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক সেটেলমেন্ট, ছাত্র রাজনীতির ধরন ও শিক্ষক রাজনীতির কাঠামো নিয়ে পরিষ্কার রূপরেখা দেওয়ার কথা ছিল ‘বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী সংসদ’ প্যানেলের।
নির্বাচনের আগে ২ সেপ্টেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে বৈষম্যবিরোধী প্যানেলের ভিপি প্রার্থী ও বাগছাসের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আহ্বায়ক আব্দুল কাদের বলেছিলেন, ‘২৪ এর গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম আকাঙ্ক্ষা ছিল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরপেক্ষ ছাত্র সংসদ নির্বাচন। আজ আমরা দেখতে পাচ্ছি সেই আকাঙ্ক্ষা ভেস্তে দেওয়ার ষড়যন্ত্র চলছে। কিন্তু শিক্ষার্থীরা ব্যালট বিপ্লবের মাধ্যমে এই কারচুপি প্রতিহত করবে।’
‘ব্যালট বিপ্লব’কিংবা ‘অভ্যুত্থানের অর্জন রক্ষা’র মতো শব্দ ব্যবহার করে ভারী বক্তব্য দেওয়া এই ছাত্র নেতা ডাকসু নির্বাচনে ভিপি পদে পেয়েছেন মাত্র এক হাজার ১০৩ ভোট। যেখানে শিবির সমর্থিত প্যানেলের সাদিক কায়েম ১৪ হাজার ৪২ ভোট পেয়ে ভিপি নির্বাচিত হয়েছেন।

নির্বাচনী প্রচার চালানোর সময় বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী সংসদের আরেক নেতা জিএস প্রার্থী এবং বাগছাসের কেন্দ্রীয় কমিটির আহ্বায়ক আবু বাকের মজুমদার অভিযোগ করে বলেছিলেন, নির্বাচন কমিশন ন্যূনতম শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে।
ভোটের দিন সকাল থেকেই বাগছাস সমর্থিত প্রার্থীরা প্রশাসনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতমূলক আচরণের অভিযোগ করতে থাকেন। শামসুন্নাহার হলে শিক্ষার্থীদের প্রবেশ ঠেকানো, আগে থেকেই ব্যালট পূরণ, ভোটকেন্দ্রে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর উপস্থিতি নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে তারা নানা অভিযোগ করেন।
নির্বাচনের দিন ডাকা জরুরি এই সংবাদ সম্মেলনে আবু বাকের মজুমদার অভিযোগ করে বলেন, ‘রেড ফ্ল্যাগ, প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ, প্রচারণার নিয়ম কোনো কিছুই মানা হয়নি। ছাত্রদল শিবিরকে দোষারোপ করছে, শিবির আবার ছাত্রদলকে; অথচ উভয় পক্ষই আসলে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে জড়িত।’

একইসঙ্গে ভোটার তালিকা তৈরির পদ্ধতি, বয়সসীমা শিথিল করা এবং পরিবারের কাছে গিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগও তুলে ধরেন তিনি।
যদিও এসব অভিযোগ কোনো কাজে আসেনি, পরিবর্তন হয় ভোটের ফলেও।
১০ সেপ্টেম্বর সকালে ঘোষণা আসে, কেন্দ্রীয় ২৮টি পদের মধ্যে ২৩ আসনেই জয় পেয়েছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’। বিপরীতে কোনো পদেই জয়ী হতে পারেনি বাগছাস সমর্থিত প্যানেলটি।
দেখা যায়, ভিপি প্রার্থী আব্দুল কাদের ভোট পেয়েছেন মাত্র ১ হাজার ১০৩ টি, আর জিএস প্রার্থী আবু বাকের মজুমদার ২ হাজার ১৩১ টি। সম্পাদকীয় কয়েকটি পদে দ্বিতীয় স্থান পেলেও সামগ্রিকভাবে ভরাডুবি ঠেকানো যায়নি।
এই ফলাফল নিয়ে প্রশাসনের ভূমিকা ও নির্বাচনী অনিয়মকে দোষ দেওয়া হলেও এতে স্পষ্ট হয় বাগছাসের অভ্যন্তরীণ বিভাজনও।
পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ডাকসু নির্বাচনে একই পদে বাগছাসের একাধিক ছাত্র নেতা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় ভোট ভাগ হয়ে গিয়েছিল। আবার প্রচারণায় সমন্বয়ের অভাব ছিল স্পষ্ট, পারস্পরিক অবিশ্বাস ও নানা দলে ভাগ হয়ে পড়ার কারণে শিক্ষার্থীদের কাছে বাগছাস একক বার্তা পৌঁছে দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
যার প্রমাণ মিলেছে ভোটের হিসেবে।
যে ছাত্রনেতাদের ডাকে এক বছর আগেই সাধারণ মানুষ নেমে এসেছিল সরকার পতনের আন্দোলনে, সেই নেতাদের সমর্থিত দলটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের নেতৃত্ব থেকে যোজন যোজন মাইল দূরে সরে যাওয়া অবাক করেছে অনেককেই।
এ বিষয়ে কথা হয় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপির) সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীবের সঙ্গে।
টাইমস অব বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০ হাজার শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছানো মোটেই সহজ না। যেহেতু এখানে শিবির একটা শক্তিশালী সংগঠন, তাই তারা কাঠামোগত প্রস্তুতি দিয়ে সহজে শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছতে পেরেছে। এছাড়াও, প্রার্থীর নিজস্ব সক্ষমতার ওপর ও অনেক কিছু নির্ভর করে।’

‘আমরা অন্য প্যানেলগুলোর মধ্যে সমন্বয় দেখেছি। কিন্তু, আমাদের ক্ষেত্রে একই সংগঠন হওয়া সত্ত্বেও প্রার্থীরা আলাদা আলাদা ভাবে অংশগ্রহণ করেছে এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে একে অন্যের বিরুদ্ধেই।’
এই ভরাডুবির জন্য নেতিবাচক ইমেজ ও সাংগঠনিক দুর্বলতাকেও দায়ী করছেন এনসিপির অনেক নেতা।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সদস্য সচিব ও বর্তমানে এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব আরিফ সোহেল বলেন, ‘যদি বাগছাস ডাকসুতে ভালো ফল করত তবে তার ইতিবাচক প্রভাব এনসিপির রাজনীতিতেও পড়ত।’
গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন সম্পৃক্ত শিক্ষার্থীদের কিছু কর্মকাণ্ড নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে বলেও মনে করেন তিনি।
আর এসবের সম্মিলিত ফলাফলেই নির্বাচনের পর ক্যাম্পাস জুড়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বাগছাসের হতাশাজনক অবস্থান।
নির্বাচনের আগে প্রতিদিন সংবাদ সম্মেলন করে নানা হুঁশিয়ারি দেওয়া নেতারা হঠাৎ করেই যেন অদৃশ্য হয়ে গেছেন। ক্যাম্পাসে নেই তাদের উপস্থিতি কিংবা প্রকাশ্য কোনো কর্মসূচি। সংগঠনের পক্ষ থেকেও আসেনি কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া।
বরং সংগঠনের ভেতরে ছড়িয়ে পড়েছে তীব্র হতাশা। এমনকি এনসিপির ভেতরেও আলোচনা উঠেছে যে, বিশ্ববিদ্যালয়ে বাগছাসের এই কাঠামো ধরে রাখা হবে নাকি সংগঠন বিলুপ্ত করে নতুন পথে হাঁটবে বাগছাস।
সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত কী হবে তা সময়ই বলে দেবে। তবে আপাতদৃষ্টিতে, ক্যাম্পাসের রাজনীতিতে নেই সেই দলের কোনো ছায়া, যাদের হাত এসেছিল দেশের রাজনীতিতে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন। বরং, স্বাধীনতার পর প্রথমবারের মতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিপুল সমর্থন ও ক্ষমতা উপভোগ করছে ইসলামী ছাত্রশিবির। গতবছরও যেই দলটির রাজনীতি ছিল নিষিদ্ধ, ক্যাম্পাসে প্রকাশ্য হওয়ারও যাদের কোনো সুযোগ ছিল না।


